দুষ্প্রাপ্য হলুদ ব্রুনফেলসিয়া
শ্রাবণশেষের সকালবেলা। বৃষ্টি নেই। আকাশে শরৎমেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। নীল আকাশে ভাসতে শুরু করেছে সাদা সাদা তুলো তুলো মেঘ, কিছু মেঘের রং ধূসর। গাছপালার ফাঁক দিয়ে ভেজা মাটিতে নেমে এসেছে সোনালি রোদ্দুর। হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম পুরান ঢাকার বলধা গার্ডেনের সিবিলি অংশে। কতবারই যে এখানে এসেছি। কিন্তু এ গাছটা কখনো চোখে পড়েনি। চোখে পড়লেও গাছটায় ফুল না দেখে চিনতে পারিনি। একটি সমাধিসৌধের পাশে সেই গাছটা দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অল্প কয়েকটা ফুল রয়েছে গাছটাতে। ফুলকে দেখে কিছুটা হলুদ গন্ধরাজের মতো লাগছিল। কিন্তু খুব কাছে গিয়ে যখন দেখলাম, তখন সে ভুল ভাঙল। হলুদ গন্ধরাজের সঙ্গে এ ফুলের মিল নেই। বরং গড়নে–ধরনে ব্রুনফেলসিয়া ফুলের মতো।
এ দেশে এখন ব্রুনফেলসিয়া ফুলগাছের অভাব নেই। এ গাছে একই সঙ্গে ত্রিবর্ণা ফুলের দেখা মেলে। ফুলের রং সাদা, হালকা বেগুনি ও বেগুনি। এ জন্য এ ব্রুনফেলসিয়াগাছের ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ইয়েস্টারডে-টুডে-টুমরো, বাংলা নামকরণ করা হয়েছে বিচিত্রা। ফুলগুলোর বিচিত্র রং বদলানোর খেলা ও সুগন্ধ এবং প্রস্ফুটনের প্রাচুর্য বাগানিদের কাছে বাহারি ফুলের গাছ হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
উদ্ভিদ–জগতে ব্রুনফেলসিয়া সোলানেসি গোত্র তথা বেগুন পরিবারের একটি গণের নাম। জার্মান উদ্ভিদবিদ ওটো ব্রুনফেলসের (১৪৮৮-১৫৩৪) নামানুসারে কার্ল লিনিয়াস ১৭৫৩ সালে এ গণের নামকরণ করেন ব্রুনফেলসিয়া। এ গণে সারা বিশ্বে ২২টি প্রজাতির গাছ আছে। আমাদের দেশে আছে এ গণের তিনটি প্রজাতির গাছ। ব্রুনফেলসিয়া গণের গাছে ফুলের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো পাপড়ি পাঁচটির গভীর খাঁজ ও সরু পুষ্পনল। সচরাচর ব্রুনফেলসিয়া ল্যাটিফোলিয়া (Brunfelsia latifolia) প্রজাতির গাছ এ দেশে দেখা যায়, যেটি বাংলায় বিচিত্রা বা সুগন্ধি ব্রুনফেলসিয়া নামে পরিচিত। এ গাছের ফুলগুলো তিনটি রঙের। এ প্রজাতির ফুল অন্য দুই প্রজাতির ফুলের চেয়ে ছোট ও অধিক সুগন্ধি। ব্রুনফেলসিয়া আমেরিকানা (Brunfelsia americana) প্রজাতির ফুল আগের প্রজাতির চেয়ে বড় ও লম্বা নলাকার পুষ্পনলবিশিষ্ট। ফুল যখন ফোটে, তখন সাদাটে রঙের থাকে। রাতে ফোটে, তাই সে সময় ফুল থেকে মিষ্টি সৌরভ পাওয়া যায়। এ জন্য এ প্রজাতির গাছের ইংরেজি নাম দেওয়া হয়েছে লেডি অব দ্য নাইট। সকাল হলেই সৌরভ ফুরাতে থাকে। পাপড়িগুলো হলদে হতে শুরু করে। এ প্রজাতির গাছ এ দেশে খুব একটা দেখা যায় না। আরও এক প্রজাতির (Brunfelsia polysperma) ব্রুনফেলসিয়া এ দেশে দেখা যায়।
হলুদ ব্রুনফেলসিয়া হলো ব্রুনফেলসিয়া আমেরিকানা, আগে নাম ছিল ব্রুনফেলসিয়া আনডুলাটা। এ প্রজাতির জন্মস্থান দক্ষিণ আমেরিকা, তাই প্রজাতিগত নামের শেষাংশ রাখা হয়েছে আমেরিকানা। হলুদ ব্রুনফেলসিয়ার কোনো বাংলা নাম পাওয়া যায়নি। এ গাছ অন্য প্রজাতির গাছগুলোর তুলনায় খুব কম দেখা যায়। তবে এ প্রজাতির বর্তমান অবস্থার এখনো কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। একে দুর্লভ বা দুষ্পাপ্য গাছ বলা যেতে পারে। বলধা গার্ডেন ছাড়া এ গাছ আর কোথাও দেখিনি।
এ প্রজাতির গাছের উচ্চতা ৫ ফুট পর্যন্ত হয়। এলোমেলো ও ঝোপাল ধরনের গুল্ম প্রকৃতির গাছ। পাতা লম্বাটে ডিম্বাকার, ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা, দুই প্রান্তই সরু বা সুচালো, রং উজ্জ্বল সবুজ বা হলদেটে সবুজ। ডালের মাথার দিকে পাতাগুলো ঘনভাবে থাকে। ফুলের রং মাখন-সাদা, পুষ্পনল সরু ও লম্বা। সন্ধ্যার পর ফোটা শুরু হয়, সারা রাত ধরে ফোটা থাকে ও হালকা মিষ্টি সুগন্ধ ছড়ায়। গন্ধ অনেকটা গন্ধরাজ ফুলের মতো মনে হলেও গন্ধরাজের চেয়ে হালকা ও মৃদু। সন্ধ্যায় ও রাতে বেশি ঘ্রাণ থাকায় এর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে লেডি অব দ্য নাইট। কিন্তু দিনের বেলায় আর সে ঘ্রাণ থাকে না। পুষ্পনল প্রায় ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। পাপড়ি ৫টি তিন রকম, অসম। ফুলের মধ্যবর্তী স্থানে থাকা পাপড়ি অপেক্ষাকৃত বড়, লম্বাটে, কিনারা ঢেউখেলানো বা আঁকাবাঁকা। এরপর থাকে প্রায় সমান দুটো পাপড়ি দুই পাশে, তার নিচে থাকে এগুলোর চেয়ে একটু ছোট দুটি পাপড়ি। পাপড়ি পাঁচটি এক সমতলে থাকে না, কিছুটা অপ্রতিসম ও অসমতল বা ভাঁজ পড়া। ফুলের ব্যাস প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। ফুল শেষে ফল হয়, ফল বেরি প্রকৃতির। বর্ষাকালে ফুল বেশি ফোটে, শরৎকালেও কিছু ফুল ও ফল দেখা যায়। বাগানে ও টবে ফুলগাছ হিসেবে লাগানো যায়। মাঝেমধ্যে ছাঁটলে গাছের গড়ন সুন্দর হয়।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক