মেঘ-বৃষ্টি ও বিরহের বর্ষা এল
‘আসমানের ঠিক নাই। এই ম্যাঘ, আবার অক্ষুনি বৃষ্টি। বৃষ্টি নামলে রিকশা চালাই না। প্যাসেন্দারে কয় পর্দা লাগাও। এইডা করো, হেইডা করো। এত্ত ঝামেলায় কাম নাই। রিকশা থামাইয়া বইয়া থাকি।’ বলছিলেন রিকশাচালক রফিকুল ইসলাম।
রোববার সকাল ১০টা। কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টির পর আবার কাঠফাটা রোদে ভরে গেছে আকাশ। রফিকুল ইসলাম এলিফ্যান্ট রোডের বাটার মোড়ের সামনে থেকে তাঁর ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়েছেন, তখনই কথা হলো। বর্ষা তো শুরু হচ্ছে সোমবার থেকে, কেমন চলছে আয়রোজগার? খানিকটা বিস্ময় নিয়েই রফিকুল বললেন ‘কন কী! বর্ষা তো কব্যেই নামছে। বৃষ্টি হইতাছে পরতিদিন।’ তাঁর কথায় কোনো ভুল নেই। বৃষ্টিবাহী মৌসুমি বায়ু জুনের প্রথম থেকেই দেশে সক্রিয় হয়েছে। তবে খাতা–কলমের হিসাবে বাংলায় বর্ষা শুরু হচ্ছে সোমবার থেকে। আষাঢ়স্য প্রথম দিবস আজ।
আজ কি ঢাকায় বৃষ্টি হবে? আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুসারে সে সম্ভাবনা আছে। বাংলা একাডেমির বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধন করায় সরকারিভাবে ২০১৬ সাল থেকে দেশে ১৫ জুন বাংলা সনের পয়লা আষাঢ় হিসেবে গণনা করা হচ্ছে। এ অনুসারে গত ১০ বছরে প্রতিবারেই পয়লা আষাঢ়ে দেশের কোথাও না কোথাও ভারী থেকে সামান্য পরিমাণ, কিছু না কিছু বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজও রাজধানীসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও বরিশাল বিভাগে বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। ঢাকায় জুনে অন্তত ১৮ দিন আর সিলেটে সবচেয়ে বেশি ২৪ দিন বৃষ্টি হতে পারে। তবে গরম কমবে—এমন আশা না করাই ভালো; বরং দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাতে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৯.৯ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যেতে পারে কোথাও কোথাও।
এ তো গেল আবহাওয়ার তথ্য। বাংলার বর্ষা কেবল আবহাওয়ায় সীমিত নয়, এই সঘন সজল ঋতু বাংলার প্রাণপ্রবাহের মতো। সঞ্জীবিত করে রাখে প্রকৃতি, পরিবেশ, সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, প্রেম, বিরহ, স্মৃতি, আহার, অভ্যাস, মনমেজাজ থেকে শুরু করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে। মোটের ওপর এমন করেও বলা চলে যে বর্ষাকে না জানলে বাংলা ও বাঙালিকে চেনাজানাতেই ঘাটতি থেকে যায়।
এই বর্ষার সঙ্গে কেবল বৃষ্টিই আসে না, ভেজা হাওয়া বয়ে আনে কদমের ঘ্রাণ। দালানকোঠায় ভরা এই ব্যস্ত রাজধানীর ভেজা রাজপথ ধরে রমনার ওদিকটায় রিকশায় যেতে যেতে একঝাপটা কোমল বাতাসের সঙ্গে পেতে পারেন সেই স্নিগ্ধ ঘ্রাণ। মনে আসবে রবিঠাকুরের গান ‘বাদল–দিনের প্রথম কদম ফুল…’ কবিগুরুকে বর্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করার উপায় নেই, আবার আয়োজন করে খোঁজাও অপ্রয়োজনীয়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নানা প্রকারের জীবন–উপকরণের মতো তিনিও কাছেই রয়েছেন। মেঘের দিকে তাকালে মনে পড়বে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’; দমকা হাওয়া বইলে ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’; ঝুম বৃষ্টি নামলে ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদরদিনে’; রাতে বৃষ্টি হলে ‘আমার নিশীথরাতের বাদলধারা’; এমনকি যদি ঘুমিয়ে থাকার সময়েও বৃষ্টি নামে, সেই মুহূর্তটির জন্যও কবিগুরুর নিবেদন, ‘আমি তখন ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে/ যখন বৃষ্টি নামল…’
নাগরিক জীবনের বৃষ্টি নিয়ে ব্যতিক্রমী ভাবনা ছিল শহীদ কাদরীর কবিতায়। ব্যস্ত জনপদে কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলে যেমন মানুষ জান বাঁচাতে ছুটতে থাকে, সেই চিত্রকল্প রচনা করেছিলেন নগরজীবনের বৃষ্টির সঙ্গে। ‘সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর-ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভীড়ে/ যারা ছিলো তন্দ্রালস দিগ্বিদিক ছুটলো, চৌদিকে/ ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মতো...’
তারপর শহরের রাস্তায় রিকশা, স্কুটারের চাকা ডুবে যাওয়া ঘোলা পানির স্রোত। নর্দমা উপচে ওঠা যত রকমের পচা আবর্জনা। এই নোংরা পানি পেরিয়ে চলাফেরা। এসব খুব সুখের নয়। রিকশাচালকসহ শহরের শ্রমজীবী মানুষের আয়রোজগার কমে যায়। প্রাত্যহিক জীবনে বাড়ে দুর্ভোগ; কিন্তু জীবন থেমে যায় না। বাসে, মেট্রোতে গাদাগদি করে চাকুরেরা অফিসে ছোটেন। স্কুল–কলেজ থেকে ফেরার পথে মনের আনন্দে নতুন বৃষ্টির পানিতে ভিজতে দেখা যায় পড়ুয়াদের।
বর্ষায় বেদনা আছে, আছে বিরহ। নগর থেকে নিস্তরঙ্গ গ্রাম—সর্বব্যাপী তার প্রবাহ। ভরা নদীর প্লাবন ব্যাকুল করে গ্রামের বধূর হিয়া। উকিল মুন্সীর বয়ানে এসেছে সেই কলিজাকাটা বিচ্ছেদের বেদনা ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে/ পূবালী বাতাসে…’ গ্রামে অবশ্য বৃষ্টি অন্য রকম। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ এক অন্য রকম আবেশ নিয়ে আসে মনে। নালা-নর্দমা দিয়ে ছুটতে থাকে নতুন পানি। মিলে যায় আশপাশের বিলঝিলে। এক কালে সেই পানিতে ঝাঁক ধরে চলে আসত পুঁটি–মৌরালার মতো হরেক রকম ছোট মাছ। ‘নতুন পানির পুঁটি মাছ’ বলে একটা প্রবচনেরই উৎপত্তি হয়েছে সেখান থেকে। আজও তেমন হয়? বাদলা দিনে হলুদ সোনাব্যাঙের ডাকে মুখর হয়ে ওঠে পাড়াগাঁ?
পরিবেশ–প্রকৃতি অনেক কিছুই বদলে গেছে। বর্ষায় ইলিশ নেই বাজারে। বর্ষায় ইলিশ-খিচুড়ি আর ঝাঁজালো শর্ষের তেলে বেগুনভাজার স্বাদ বাঙালির রসনায় অমৃতসমান। কারওয়ান বাজারের পাইকারি মাছের বাজারে সোনার বাংলা মৎস্য আড়তে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আষাঢ়ে ইলিশ পাওয়া এখন দুর্লভ। ইলিশের মৌসুম শুরু হবে ভাদ্র-আশ্বিনে। এখানে প্রায় ২৫ বছর ধরে পাইকারি ব্যবসা করেন ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ আড়তের শরীয়তপুরের মো. শাকিল মাঝি। তাঁর দেওয়া তথ্য হলো এখন এক কেজি ওজনের ইলিশের পাইকারি দাম তিন হাজার টাকা। ঠিক পড়েছেন, তিনের পরে তিনটি শূন্য। কিনতে গেলে ক্রেতাদের হবে পকেটশূন্য। কাজেই নিম্নবিত্তের তো প্রশ্নই ওঠে না, উচ্চমধ্যবিত্তের পক্ষেও এখন ইলিশের স্বাদ আস্বাদনের সুযোগও হুমকিকবলিত।
এমন অবস্থায় বর্ষায় রসনাবিলাস কেমন করে হবে? বাঙালির কাছে বিকল্প আছে বিস্তর। বৃষ্টির দিনে ভাজাপোড়া আর গরম চায়ের স্বাদও অতুলনীয়। পথের মোড়ের দোকানে মেঘ-বৃষ্টির বেলা শেষে ভাজাপোড়ার বিক্রি বেশ বেড়ে যায় বলেই জানালেন পান্থপথ মোড়ের ‘আর সি ফাস্টফুড’ নামের পথখাবারের ব্যবসায়ী রুবেল হোসেন। রোজই বিকেল থেকে মুড়ি–পাকুড়ার পসরা সাজান তিনি। মেঘলা দিনে বিক্রি বাড়ে বলেই জানান; আর আকাশ কালো করে মেঘ ঘনিয়ে এলে কাজকর্ম ছেড়ে মুড়ির সঙ্গে সবজিবড়া, বেগুনি আর গরম চায়ের কাপ নিয়ে জানালার ধারে বসার যে আমেজ, আকাশ থেকে ঝরে পড়া অঝোরধারার দিকে তাকিয়ে স্মৃতির ভেতর দিয়ে এক অন্য ভুবনে চলে যাওয়ার যে অলীক ভ্রমণ, বেদনা–বিষণ্নতার মধ্য দিয়ে নিজেকে নিজের মতো করে খুঁজে পাওয়ার আকুলতা—বর্ষা ছাড়া আর কোন ঋতু এমন করে তা দিতে পারে! তাহলে আকাশে জমে উঠুক ধুমল মেঘ। প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে নামুক আষাঢ়ের অমিয়ধারা। ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠুক জীবন ও প্রকৃতি।