লাগানো হবে ২৫ কোটি গাছ, অগ্রাধিকার দেশীয় প্রজাতিতে

এই জারুলগাছটি মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার গোবিন্দবাটিতে। সরকারের বৃক্ষরোপণের নতুন কর্মসূচিতে দেশীর প্রজাতির বৃক্ষ হিসেবে জারুলও অগ্রাধিকারে থাকছেফাইল ছবি: প্রথম আলো

দেশে গত এক দশকে কমেছে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি গাছ। একই সময়ে বনভূমিতে দেশীয় প্রজাতির জায়গা দখল করে বিস্তার ঘটে বিদেশি আগ্রাসী গাছের—বিশেষ করে আকাশমণি (অ্যাকাশিয়া) ও ইউক্যালিপটাসের। এই প্রেক্ষাপটে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। আগামী জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই কর্মসূচিতে বিদেশি প্রজাতির বদলে দ্রুতবর্ধনশীল দেশীয় গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

কর্মসূচির ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, দেশীয় প্রজাতির গাছ দ্রুত বাড়ে। এ উদ্যোগের ফলে প্রাকৃতিক বনের ওপর চাপ কমবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো ও পরিবেশের সার্বিক ভারসাম্য ফেরাতে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার করেছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে এক লাখ নিমগাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা আছে সরকারের। উপকূলীয় এলাকায় লাগানো হবে ঝাউ। আর সুন্দরবন এলাকায় রোপণ করা হবে সুন্দরী, গেওয়া, বাইন ও গরানগাছ।

দেশীয় গাছের তালিকায় যা থাকছে

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় দ্রুতবর্ধনশীল মেহগনি, গামার, জারুল, জীবন, কদম, আগর ও বাঁশগাছ রোপণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন অধিদপ্তর। এ ছাড়া অগ্রাধিকার পাচ্ছে শিলকড়ই, জাম, মহুয়া, বহেরা, অর্জুন, নিম, হরীতকী, কাঁঠাল ও চালতা।

আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে এক লাখ নিমগাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা আছে সরকারের। উপকূলীয় এলাকায় লাগানো হবে ঝাউ। আর সুন্দরবন এলাকায় রোপণ করা হবে সুন্দরী, গেওয়া, বাইন ও গরানগাছ।

দ্রুতবর্ধনশীল হিসেবে কদমগাছও থাকছে বৃক্ষরোপণের অগ্রাধিকারের তালিকায়
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (প্রশাসন ও অর্থ) আর এস এম মুনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে উপকূলীয় বনায়ন, বন পুনরুদ্ধারে বনায়ন, নগর বনায়ন, কমিউনিটিভিত্তিক বনায়ন, বসতবাড়ি ও কৃষি বনায়ন এবং উৎপাদনমুখী বনায়ন।

বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় দ্রুতবর্ধনশীল প্রজাতিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উৎপাদনমুখী বনায়নে আমরা দেশীয় প্রজাতির দ্রুতবর্ধনশীল চারা রোপণ করব। এ খাতে রোপণ করা হবে ১ কোটি ২৫ লাখ গাছ। সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভূমিতে এ বনায়ন করা হবে। এ ছাড়া কৃষি বনায়ন হিসেবে ফলদ ও ঔষধি গাছের ২ কোটি ৫০ লাখ চারা রোপণ করা হবে।’

উৎপাদনমুখী বনায়নে আমরা দেশীয় প্রজাতির দ্রুতবর্ধনশীল চারা রোপণ করব। এ খাতে রোপণ করা হবে ১ কোটি ২৫ লাখ গাছ। সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভূমিতে এ বনায়ন করা হবে। এ ছাড়া কৃষি বনায়ন হিসেবে ফলদ ও ঔষধি গাছের ২ কোটি ৫০ লাখ চারা রোপণ করা হবে।
আর এস এম মুনিরুল ইসলাম, বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর

যেভাবে এল বিদেশি প্রজাতির গাছ

দেশে ক্রমবর্ধমান কাঠের চাহিদা পূরণ করাকে এত দিন দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতির গাছ রোপণের পেছনের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হতো। মূলত আসবাব, ভিনিয়ার, পার্টিকেল বোর্ড ও কাগজশিল্পে কাঠের বেশি চাহিদা থাকে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক কাঠের চাহিদা ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ থেকে ৩০ লাখ ঘনফুট কাঠ আমদানি করা হয়। তবে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি দিয়ে কাঠের চাহিদা কতটুকু পূরণ করা হয় এবং দেশি-বিদেশি প্রজাতির গাছের অনুপাত কত, সে তথ্য বন বিভাগের কাছে নেই।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট গত শতকের আশির দশকে পরীক্ষামূলকভাবে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি রোপণ শুরু করে। এর আগে ১৯৬৫ সালে প্রথমবারের মতো এসব গাছ বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে কি না, তা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের করা ওই পরীক্ষামূলক পর্যায়ের তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলায় ভোমরিয়াঘোনা সংরক্ষিত বনের ভেতরে লাগানো আকাশমণিগাছের চারা। বিদেশি এই গাছ প্রচুর পানি শোষণ করে মাটিকে রুক্ষ করে তোলে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস পরিচালিত ‘ইউক্যালিপটাস ডিলেমা ইন বাংলাদেশ’ গবেষণায় বলা হয়, ১৯৩০ সালে সিলেটের চা–বাগানে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রথম ইউক্যালিপটাস আনা হয়। সেখান থেকে তা ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীকালে আশির দশকে ৩৪ প্রজাতির ইউক্যালিপটাস ও ১০ প্রজাতির আকাশমণি এনে আবারও পরীক্ষামূলক বনায়ন করা হয়। এর মধ্যে তিন প্রজাতির আকাশমণি ও তিন প্রজাতির ইউক্যালিপটাস বাংলাদেশে রোপণের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

বন অধিদপ্তর জানিয়েছে, গাছ রোপণের তালিকায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে মেহগনি, শিলকড়ই, কদম, জাম, মহুয়া, বহেরা, অর্জুন, নিম, হরীতকী, কাঁঠাল ও চালতা। এর পাশাপাশি দ্রুতবর্ধনশীল গাছ হিসেবে জারুল, গামার, আগর, জীবন, বাঁশও থাকছে।

উদ্ভিদবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি দ্রুত বাড়ে এবং কাঠের চাহিদা মেটায় ঠিকই কিন্তু এগুলো প্রচুর পানি শোষণ করে মাটিকে রুক্ষ করে তোলে। গরু-ছাগল এসব গাছের পাতা খায় না, এমনকি এসব গাছে পাখিরাও বাসা বাঁধে না।

এ প্রেক্ষাপটে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে গত বছরের ১৫ মে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা তৈরি, রোপণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রজ্ঞাপনে আগ্রাসী প্রজাতির পরিবর্তে দেশি প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করে বনায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বাসুদেবপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে এক সারি ইউক্যালিপটাস গাছ। এই গাছগুলো প্রচুর পানি শোষণ করে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো
এক জায়গায় অতিরিক্ত গাছ রোপণ করলে পানির ওপর চাপ পড়তে পারে। গাছের পানির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কৃষিজমির পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোন অঞ্চলে গাছ কমে গেছে, সেই উপাত্ত সংগ্রহ করে গাছ রোপণ করতে হবে। এ জন্য মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও প্রাণিবিদদের সমন্বয়ে সরকারের একটি কমিটি গঠন করে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা উচিত।
রেজা খান, বন্য প্রাণী ও বনবিশেষজ্ঞ

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বন্য প্রাণী ও বনবিশেষজ্ঞ রেজা খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশীয় প্রজাতির গাছ দিয়েই এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা দরকার। একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, কাঠ উৎপাদনের জন্য এই বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে না। এর মূল উদ্দেশ্য পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। দেশীয় প্রজাতির গাছ ছাড়া সেই উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়।’

গত বছরের ১৫ মে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণিগাছের চারা তৈরি, রোপণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রজ্ঞাপনে আগ্রাসী প্রজাতির পরিবর্তে দেশি প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করে বনায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এক জায়গায় অতিরিক্ত গাছ রোপণ করলে পানির ওপর চাপ পড়তে পারে। গাছের পানির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কৃষিজমির পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোন অঞ্চলে গাছ কমে গেছে, সেই উপাত্ত সংগ্রহ করে গাছ রোপণ করতে হবে। এ জন্য মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও প্রাণিবিদদের সমন্বয়ে সরকারের একটি কমিটি গঠন করে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা উচিত।

আরও পড়ুন