বহুরূপী এক বুনো বিড়াল

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়া সোনালি বিড়াল। ২০২১ সালের ২৩ জুলাইছবি: লেখক

একটি ছবি নাকি হাজার শব্দের সমান। তবে আমাদের দেশে এমন কিছু বিরল বন্য প্রাণী আছে, যাদের পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া রীতিমতো দুরূহ কাজ। যেমন ধরুন এশীয় সোনালি বিড়াল। নাম শুনে কমলা-সোনালি রঙের কোনো বিড়ালের কথা মনে আসাটাই স্বাভাবিক। ঘরে থাকা কমলা-সোনালি বিড়ালদের মতোই গায়ের রং। কোনো ভুল নেই। বিষয় হচ্ছে, মাঝারি আকারের এই বিড়াল আরও অনেক অনেক রঙের হয়ে থাকে। একে তো দুষ্প্রাপ্য প্রাণী। নাম সোনালি বিড়াল হলেও আছে বহুরূপী বৈচিত্র্য।

সোনালি বিড়ালের কথা বেশি লোকে জানে না। এ প্রাণী আমাদের দেশে আর নেই, আমি কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছি এ কথা শুনে শুনেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খানের ২০০৮ সালে লেখা একটি গবেষণাপত্র চোখে আসে।

ক্যাট নিউজ জার্নালের সেই প্রকাশনা বলছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সে সময় ভালো সংখ্যায় ছিল সোনালি বিড়াল। লেখাটির সঙ্গে ছিল শিকারির হাতে মারা পড়া বেশ কিছু সোনালি বিড়ালের জ্বলজ্বলে ছবি। সব কটিই সোনালি রঙের।

এর মধ্যে ২০০৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয় এক চাঞ্চল্যকর খবর। সিলেটের কানাইঘাটে বেদম পিটুনির পর ধরা পড়ে এক কালো রঙের বিড়াল। কালো চিতাবাঘ বলে উদ্ধার হওয়া বিড়ালটি পরে মারা যায়। রেখে দেওয়া পেপার কাটিংটি দরকার হলো ২০১৮ সালে। যখন নিজেই পাহাড়ি বনে ক্যামেরা ট্র্যাপিং করছি। পুরোনো হয়ে যাওয়া খবরের পাতা উল্টাতে গিয়ে কেমন যেন খটকা লাগল। রং কালো হলেও আকার তো বাঘ-চিতাবাঘের মতো নয়। ঝাপসা হয়ে আসা ছবিতে ঠোঁটের পাশ দিয়ে বেশ লম্বা সাদা দাগ। এমন তো বাঘ-চিতাবাঘের থাকে না। তবে কি সোনালি বিড়ালেরই কোনো রূপ? অধ্যাপক মনিরুল এইচ খানের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হলাম। বাংলাদেশের সীমানায় সোনালি বিড়ালের কালো রঙের এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র নমুনা।

বাংলাদেশের আট রকমের বিড়ালজাতীয় প্রাণীর মধ্যে নিঃসন্দেহে সোনালি বিড়াল সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক প্রজাতি। এক প্রজাতির মধ্যে এত রং এশিয়ার বনে আর কোনো বিড়ালের নেই। দক্ষিণ আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে সোনালি বিড়ালের বিস্তৃতি। মূল ভূখণ্ডের বাইরে সুমাত্রায়ও পাওয়া যায়। ছোট বিড়াল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সুনির্দিষ্ট গবেষণা কম। রেকর্ডগুলো তাই ছড়ানো-ছিটানো। বেশির ভাগই ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়া।

পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন কী কী রঙের হয়ে থাকে এই বিড়াল? বুনো বিড়াল নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা প্যান্থেরা মূলত ছয়টি মর্ফ বা রূপের কথা বলেছে। মূল সোনালি রূপ, দারুচিনি রূপ, ধূসর রূপ, কালো রূপ, চিতাবাঘের মতো ফুল ফুল ছোপযুক্ত রূপ, চিতাবিড়ালের মতো ছোপ আর দাগের নকশাযুক্ত রূপ।

শেষের ধরনটি সবচেয়ে রহস্যময়। বুনো বিড়াল গবেষক ড. লুক হান্টারের মতে, শেষ রূপটি একটি ভিন্ন প্রজাতিও হতে পারে। এই মূল ছয় রূপের আবার অঞ্চলভেদে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। কোনোটির হয়তো একটু গাঢ়, কোনোটির লোম বেশ বড়। কালোর মধ্যে ফুল ফুল ছোপযুক্ত সোনালি বিড়াল কোথাও কোথাও পাওয়া গেছে। ভারতের অরুণাচলের দিহিং পাটকাই উপত্যকার এক বনেই ছয়-ছয়টি রূপের সোনালি বিড়াল পাওয়া গেছে। তিব্বতের ইয়ুরলাং-সাংপো নেচার রিজার্ভে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন রঙের সোনালি বিড়াল, বলছে ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র। সেখানে ক্যামেরা ট্র্যাপিং গবেষণাটি চলেছিল ৯ বছর ধরে।

সীতাকুণ্ডের হাজারিখিল বন। এ ধরনের বনে পাওয়া যায় সোনালি বিড়াল
ছবি: লেখক

সর্বোচ্চ ১৬ কেজি ওজনের সোনালি বিড়ালদের সব রূপেই বেশ লোমশ একটি লেজ থাকে, মুখের পাশ দিয়ে সাদা দাগ একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। চোখের পাশ দিয়ে সাদা লম্বা কাজল টানা আছে প্রায় সব রূপেই। চিরসবুজ-মিশ্র চিরসবুজ বন এদের মূল আবাস। আবার ব্যতিক্রমও আছে। আসামের ঘাসবনে এদের উপস্থিতির কথা বলেছেন আসামের বন্য প্রাণী গবেষক ড. আনোয়ারুদ্দীন চৌধুরী। সাব-আলপাইন পরিবেশেও এদের পাওয়া যায়।

সোনালি বিড়ালদের কেন এত রূপ—বিজ্ঞানীরা তার এখনো সঠিক উত্তর বের করতে পারেননি। জনসংখ্যা কম হলে ইনব্রিডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক রঙের ভিন্নতা দেখা যেতে পারে। যেমন ওডিশার কালো বাঘ। ইন্দোনেশিয়ার বৃষ্টিবনে কালো চিতাবাঘ বেশি। কালো রং শিকার ধরতে সহায়তা করে। কিন্তু সুস্থ-সবল সোনালি বিড়ালদের রংবৈচিত্র্য এখনো রহস্য।

মৌলভীবাজারে সব কটি খণ্ড বন আর পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো এরা টিকে আছে। ক্যামেরা ট্র্যাপভিত্তিক গবেষণার প্রসারে বাংলাদেশের নানা বন থেকে এদের উপস্থিতির কথা আমরা জানতে পারছি। কালো আর সোনালি রূপ ছাড়াও আমাদের আছে দারুচিনি আর ধূসর রূপের সোনালি বিড়াল।

বিশ্বব্যাপী সোনালি বিড়ালরা বিপদাপন্ন। আমাদের দেশেও তা-ই। ভালোভাবে জানার আর কোনো সংরক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় আনার আগেই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশের রহস্যময় সোনালি বিড়াল।

  • মুনতাসীর আকাশ, সহকারী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়