বায়ুদূষণে আজও শীর্ষে ঢাকা, কী হলো রাজধানীর বাতাসে

বায়ুদূষণফাইল ছবি

বায়ুদূষণে আজও বিশ্বের নগরীগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে রাজধানী ঢাকা। আজ বুধবার সকাল সোয়া আটটার দিকে মিসরের রাজধানী কায়রোর সঙ্গে একই বায়ুর মান নিয়ে শীর্ষে ছিল এই নগর। দুই নগরীর বায়ুর মান ছিল ২৭৪। বায়ুর এ মানকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে গণ্য করা হয়। তবে নগরীর চার স্থানে বায়ুর মান ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। দূষণের সর্বোচ্চ স্তর এটি।

চার দিন ধরে টানা বায়ুদূষণে শীর্ষে থাকছে ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অসহনীয় বায়ুদূষণে নানা শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন নগরবাসী। আগের চেয়ে এসব সমস্যা বেশি অনুভূত হচ্ছে। শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে গৎবাঁধা কিছু কথা আর লোকদেখানো উদ্যোগ ছাড়া এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই করা হয়নি, এমন কথা বিশেষজ্ঞদের।

তিন সপ্তাহ ধরে বায়ুদূষণে বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে প্রথম দিকে থাকছে ঢাকা। আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বায়ুদূষণের এই পরিস্থিতি তুলে ধরেছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ার। প্রতিষ্ঠানটি বায়ুদূষণের অবস্থা নিয়মিত তুলে ধরে। বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা এই লাইভ বা তাৎক্ষণিক সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সে সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয়, সতর্ক করে। আজ ঢাকার বায়ুদূষণের যে অবস্থা, তা থেকে রক্ষা পেতে বেশ কিছু পরামর্শও দিয়েছে আইকিউ এয়ার।

ঢাকার বায়ুদূষণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং তা দিন দিন বাড়ছে। গত ডিসেম্বর পুরোটাই, আর জানুয়ারির প্রায় প্রতিদিন বিশ্বের শীর্ষ দূষিত বায়ুর নগরীগুলোর মধ্যে থাকছে ঢাকা।

বায়ুদূষণের মাত্রা ২০০-এর বেশি হলে তাকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে বিবেচনা করা হয়। আর ৩০০ হয়ে গেলে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বলে গণ্য হয়।

দেশের সর্বত্রই বায়ুদূষণ বাড়ছে; বরং কিছু ক্ষেত্রে আজকাল ঢাকার বাইরের অন্যান্য এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা অনেক বেশি থাকছে।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে যেসব কার্যক্রম আছে, তা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। তবে এসব কার্যক্রমের তেমন কোনো ফল নেই।

স্থানীয় উৎস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ সরকার

বায়ুদূষণের কথা উঠলেই পরিবেশ অধিদপ্তর বা সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, এটা উপমহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের কারণেই হচ্ছে। অর্থাৎ ভারতের দিল্লি বা পাকিস্তানের লাহোর বা করাচি হয়ে আসা এই বায়ুর কারণেই বাংলাদেশে এত দূষণ। বাংলাদেশের বায়ুদূষণে এই বায়ুপ্রবাহের প্রভাবের কথা কেউই অস্বীকার করেন না। কিন্তু এটাকে একমাত্র বা বড় কারণ বলে যেভাবে সরকার দায় এড়ানোর চেষ্টা করে, তা অবান্তর বলেই মনে করেন বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, যদি এই বায়ুপ্রবাহের কারণেই ঢাকায় এত দূষণ হতো, তাহলে তো উৎসে অর্থাৎ যেসব অঞ্চল থেকে এ বায়ু আসে, সেসব অঞ্চল শীর্ষে থাকত। কিন্তু সেই সুদূর মিসরের কায়রো আজ শীর্ষে থাকে কীভাবে? এভাবে অনেক দিনই হয় যেখানে এসব বড় উৎস বাংলাদেশের অনেক পেছনে থাকে।

প্রসঙ্গত, বায়ুদূষণে আজ ঢাকার পর থাকা ভারতের রাজধানী দিল্লির স্কোর ১৮১। ঢাকার চেয়ে প্রায় শত মান কম এ নগরীর।

কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণের স্থানীয় উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। এসব উৎস নিয়ন্ত্রণে আদৌ সেভাবে কোনো চেষ্টা হয়নি। উপমহাদেশীয় দূষিত বায়ুপ্রবাহের চেয়ে সেগুলোই প্রাধান্যশীল।

ঢাকার বায়ুদূষণের উৎসগুলোর মধ্যে আছে যানবাহন ও কলকারখানার দূষিত ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালু, বিভিন্ন দ্রব্য পোড়ানোর কারণে সৃষ্টি ধোঁয়া, ইটভাটা।

স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে

বায়ুর মান যদি ক্রমাগতভাবে খুব অস্বাস্থ্যকর থাকে এবং মানুষ যদি সেই বায়ুতে থাকে অরক্ষিত অবস্থায় তবে মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যা হতে পারে। অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষ আমাকে তাঁদের অস্বাভাবিক মাথাব্যথার কথা বলছেন। তাঁরা এ–ও অনুভব করছেন, হয়তো দূষণের কারণে এটা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে এ বোধ এসে গেছে যে দূষণ তাঁদের মারাত্মক ক্ষতি করছে। পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে যাচ্ছে।

ঢাকার ৮ স্থানে বায়ুর মান খুব খারাপ

আজ সকালে ঢাকার আটটি স্থানের বায়ুর মান খুব খারাপ। স্থানগুলো হলো নিকুঞ্জের এএসএল সিস্টেমস লিমিটেড (৪৫৯), ধানমন্ডি (৩৬৪), দক্ষিণ পল্লবী (৩৩৪), মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং (৩০৪), বে’জ এইজ ওয়াটার (২৮৬),  বেচারাম দেউড়ী (২৭৪), গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (২৫২) ও গোড়ান (২২৬) ।

দেশে বায়ুদূষণ মোকাবিলায় বিভিন্ন সময় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এখনো নানা উদ্যোগ-কথাবার্তা শোনা যায়। কিন্তু বায়ুদূষণ পরিস্থিতি দিন দিন খারাপই হচ্ছে।

সুরক্ষায় নগরবাসী যা করবেন

আইকিউ এয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী, আজ ঢাকায় বায়ুর যে মান, তাতে বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। বাড়ির বাইরে গিয়ে ব্যায়াম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর ঘরের জানালাগুলো যতটা সম্ভব বন্ধ রাখতে হবে।