পারুল যে এ অঞ্চলের প্রাকৃত তরু, তার প্রমাণ মেলে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকের সংস্কৃত সাহিত্যের মহাকবি কালিদাসের সাহিত্যে। তবে কালিদাসের পাটল নামটির চেয়ে আমাদের প্রাকৃত ভাষার পারুল নামটি বেশি মধুর। তিনি এ ফুল ফোটার সময়কে গ্রীষ্ম তথা নিদাঘ কাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
কালিদাসের ঋতুসংহার কাব্যের প্রথম সর্গের শেষ শ্লোকটিতে নিদাঘে যা যা সুখদায়ক তার মধ্যে পাটল স্থান পেয়েছে—ভালো লাগে হিম-সলিলে সিনান, মধুর জোছনা যে কালে,/ ফোটে শতদল, পাটল ফুলের গন্ধ লুটায় কাননে,/ জ্যোৎস্নাপ্লাবিতা নিদাঘ-যামিনী সুললিত গীতগানে/ নারীদের সাথে মহা-আনন্দে কাটুক কুসুমশয়ানে’। তাঁর অভিজ্ঞান-শকুন্তলম্ নাটকের প্রথম অঙ্কে পারুলের একটি অসাধারণ বর্ণনা রয়েছে— ‘সুখকর এবে সলিলে গাহন পাটল ফুলের গন্ধ-মাখানো বায়ু,/ তরুতলে ঘুম আসে সহজেই, মধু হয় দিন যতো শেষ হয় আয়ু।’
বাংলা ভাষার পারুল, সংস্কৃত ভাষার পাটল বা পুলিলা, সিংহলি ভাষার পলল—সবই একই গাছের নাম। সেই সুদর্শন পারুল ফুল দেখতে বের হলাম এ বছরের ৫ বৈশাখে। সকালবেলা ঢাকা থেকে আট প্রকৃতিবন্ধু মিলে রওনা দিলাম পারুল দর্শনের উদ্দেশে। প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগল পারুলের কাছে পৌঁছাতে। গাজীপুরের জয়দেবপুরে টাঁকশাল সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস করপোরেশন স্কুলের বিজ্ঞান ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে চারটি পারুলগাছ। ছিল পাঁচটা গাছ। স্কুলের সীমানাপ্রাচীর ও নর্দমা নির্মাণ করতে গিয়ে কয়েক দিন আগে কেটে ফেলা হয়েছে একটি গাছ। কথাটা জানার পর শঙ্কা আর কষ্ট এসে চেপে বসল বুকের ভেতর—বাকি চারটি গাছ ভবিষ্যতে টিকবে তো? জানামতে, বাংলাদেশে গাজীপুরের এ স্থানেই শুধু পারুলগাছ পাওয়া গেছে। অন্য স্থানে নিশ্চয়ই আরও আছে, খুঁজে দেখা হয়নি। প্রকৃতিবন্ধু আজহার ভাই (আজহারুল ইসলাম খান) বললেন, মধুপুরেও পারুলগাছ আছে। সেগুলো দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমার মতো ক্যাপ্টেন কাওসার মোস্তফা ও আরিফুল হক ভাইয়েরও এটাই প্রথম পারুল–দর্শন, বাকি বন্ধুদেরও।
পারুল ফুলের দেখা না পেলেও পারুলের নামের সঙ্গে পরিচিত সেই ছোটবেলা থেকে। সাত ভাই চম্পা সিনেমা কে না দেখেছে? কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানেও রয়েছে পারুলের নাম। সাহিত্যে পারুলের ছড়াছড়ি থাকলেও দেশের প্রকৃতিতে অনেক দিন ধরে পারুল ছিল অদেখা। পারুলের খোঁজ শুরু করেছিলেন প্রয়াত ওয়াহিদুল হক। সংবাদে তাঁর লেখা ‘অথঃ পুষ্পকথা’ লেখাটিই পারুল অনুসন্ধানের সূত্র খুলে দিয়েছিল। সেই সূত্র ধরে পারুলের অনুসন্ধানে নামেন নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা। সিলেটের পাথারিয়া জঙ্গল থেকে তিনটি গাছ সংগ্রহ করে ঢাকায় মহানগর পাঠাগার, শিশু একাডেমির বাগান ও রমনা উদ্যানে লাগান। পরে ফুল ফুটলে দেখা গেল সে গাছগুলো পারুল না, ধারমারা ও কাউয়াতুতি, সিলেটে ওসব গাছ পারুল নামে পরিচিত। পারুলের অনুসন্ধান করেছিলেন নিসর্গবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. নওয়াজেশ আহমদ এবং যশোর শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও প্রকৃতিপ্রেমী আমিরুল আলম খান। কিন্তু কোথাও তখন পারুলের সন্ধান মেলেনি। অবশেষে জয়দেবপুরের এই গাছগুলো থেকে প্রকৃতিপ্রেমী যায়েদ আমিন ও মোকারম হোসেনের তোলা ছবি দেখে ২০১৬ সালে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের তৎকালীন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরদার নাসির উদ্দিন সে ফুলকে পারুল হিসেবে শনাক্ত করেন।
পারুল এ দেশে দুর্লভ কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়ে গেছে। কেননা ২০২৪ সালে আইইউসিএন-বাংলাদেশ ও বন অধিদপ্তরের হাজার বৃক্ষের মূল্যায়নে পারুলকে মূল্যায়িত করা হয়েছে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বা লিস্ট কনসার্ন উদ্ভিদ হিসেবে, যার অর্থ পারুলকে এখনো বিপন্ন ভাবার কারণ নেই। বিভিন্ন স্থানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করে আরও পারুলগাছের খোঁজ পেলে তা নথিবদ্ধ করা উচিত। আশা করি গবেষক, তরু সংগ্রাহক ও নার্সারিকর্মীরা পারুলের চারা তৈরি করে তার বিস্তার ঘটাবেন।