বিশ্বদরবারে সাদা বাঘ পরিচিতি লাভ করে ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া অঞ্চলের মহারাজাদের মাধ্যমে। ১৯১৫ সালে রেওয়ার তৎকালীন মহারাজা গুলাব সিং জঙ্গল থেকে দুই বছর বয়সী একটি সাদা বাঘ এনে পাঁচ বছর ধরে গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ গোবিন্দগড়ে পোষেন।

এরপর ব্রিটেনের রাজা পঞ্চম জর্জকে তা উপহার দেন। রেওয়া প্রাসাদের শিকারের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯০০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে রেওয়ার আশপাশের জঙ্গলে আরও আটটি সাদা বাঘ দেখা গিয়েছিল। রেওয়ার মহারাজা মার্তন্ড সিং ১৯৫১ সালে ৪টি স্বাভাবিক বর্ণের বাঘ মারেন ও সেগুলোর সঙ্গী একটি পুরুষ সাদা বাঘশাবককে জীবন্ত ধরে আনেন। সেই সাদা শাবকটির নাম রাখা হয় মোহন। সেটিকে গোবিন্দগড় প্রাসাদে রাখা হয়। মোহনের বংশধরেরাই বর্তমানে ভারত এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চিড়িয়াখানা, সাফারি পার্ক ও অভয়ারণ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।

রেওয়ার তৎকালীন মহারাজা মার্তন্ড সিং সাদা বাঘের বংশবৃদ্ধির জন্য বহু চেষ্টা করেন। ১৯৫৮ সালে মোহন ও এর সঙ্গী স্বাভাবিক বর্ণের বাঘিনী রাধার ঘরে চারটি সাদা শাবকের জন্মের মধ্য দিয়ে তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়। রেওয়ায় বাঘগুলো ৫৮ বারে মোট ১৭০টি শাবক দিয়েছিল, যার মধ্যে ১১৪টিই ছিল সাদা। মোহন ১৯৬৯ সালে ১৯ বছর ৭ মাস বয়সে মারা যায়।

এবার আসল কথায় আসা যাক। বাঘ কেন সাদা হয়? আসলে বাঘের মধ্যে বর্ণহীনতার (অ্যালবিনিজম) রেকর্ড থাকলেও সাদা বাঘ কিন্তু মোটেও বর্ণহীন (অ্যালবিনো) নয়। অবশ্য আগে অনেকের এমনই ধারণা ছিল। ১৯২২ সালে কোচবিহারে দুটি অ্যালবিনো বাঘ শিকারের কথা জানা যায়। অ্যালবিনো ও সাদা বাঘের মধ্যে যে পার্থক্যগুলো রয়েছে, তা ভালোভাবে লক্ষ করলেই ধরা যায়। অ্যালবিনো বাঘের চোখ গোলাপি ও গায়ের ডোরাকাটা দাগগুলো অস্পষ্ট, যা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি কোণ থেকে লক্ষ করলেই ধরা পড়ে।

অর্থাৎ অ্যালবিনো বাঘ দেখতে পুরোপুরি সাদা। অন্যদিকে সাদা বাঘের চোখ তুষার নীল ও গায়ের ডোরাকাটা দাগগুলো গাঢ় বা লালচে বাদামি ও উজ্জ্বল, যা যেকোনো কোণ থেকেই সহজে চোখ পড়ে। এ ছাড়া সাদা বাঘের নাক ও ঠোঁটে ধূসর গোলাপি ফোঁটা থাকে। বাঘের এই বর্ণবৈচিত্র্য মূলত বেঙ্গল উপপ্রজাতিতেই দেখা যায়, অন্যান্য উপপ্রজাতিতে নয়। অবশ্য সাম্প্রতিক কালে বেশ কিছু চিড়িয়াখানায় সাইবেরিয়া উপপ্রজাতির সাদা বাঘ দেখা গেছে। তবে প্রাকৃতিক পরিবেশে কেবল ভারতেই সাদা ও অ্যালবিনো বাঘ দেখার তথ্য রয়েছে।

আশির দশকে বন্য প্রাণী জীববিজ্ঞানীরা সাদা বাঘ গবেষণায় দীর্ঘ পদক্ষেপ নেন। সাদা বাঘের বংশবৃদ্ধিকারী বিভিন্ন চিড়িয়াখানার তথ্য বিশ্লেষণে তাঁরা দেখেন, সাদা বাঘগুলো স্বাভাবিক বর্ণের বাঘ থেকে বড়সড় হলেও মোটেও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় না। কারণ, ওদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা যথেষ্ট দুর্বল থাকে। তাই সাধারণ বাঘের তুলনায় ওরা বেশি রোগাক্রান্ত হয়।

জন্মবৈকল্য ও মৃত বাচ্চা প্রসবের হারও বেশি। তা ছাড়া টিকাও লাগে দ্বিগুণ মাত্রায়। তাই গবেষকেরা সাদা বাঘের বংশবৃদ্ধির কর্মসূচি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। বর্তমানে এই উপমহাদেশ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিড়িয়াখানায় ওদের বংশবৃদ্ধির দিকে তেমন একটা নজর দেওয়া হচ্ছে না।

আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখিবন্য প্রাণী চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন