তিস্তার উজানের ভারতীয় অংশে একাধিক বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমেছে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। এতে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে কৃষকের সেচ খরচ বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। অন্যদিকে বর্ষায় উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানির কারণে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতি হয় ফসলের। এসব কারণে তিস্তার দুই পার থেকে ২০২০ সালে ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
‘তিস্তা নদী: পরিবেশগত সংকট ও পুনরুদ্ধার’ শিরোনামে এক গবেষণা প্রবন্ধে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের (বাপা-বেন) জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনে ওই প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের গতকাল ছিল শেষ দিন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন এ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিভারাইন পিপলের ট্রাস্টি ও আরডিআরএসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো. নুরুননবী। গবেষণা পরামর্শক ছিলেন বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইমরুল কায়েস মনিরুজ্জামান।
নুরুন্নবী বলেন, তিস্তার দুই পরে আনুমানিক পাঁচ লাখ লোকের বসবাস। ২০২০ সালে এ নদীর দুই পারসংলগ্ন জনপদ থেকে ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মূলত শুষ্ক মৌসুমে সেচের খরচ বেড়ে যাওয়া ও বর্ষায় উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানিতে সৃষ্ট বন্যায় ফসলের ক্ষতির কারণে এসব মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
তিস্তার উজানে ভারত ৯টি বাঁধ ও ২টি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে উল্লেখ করে নুরুন্নবী বলেন, এসব বাঁধ থেকে ভারত ৩ দশমিক ৫ গিগাবাইট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে মাত্র ১ হাজার ২০০ কিউসেক পানি আসে তিস্তায়, যা চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ। এতে কৃষি উৎপাদন কমে আসছে। পলিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় তিস্তার কৃষিজমিতে মাটির জৈব গুণ কমে এসেছে।
গবেষণায় এসব বাঁধের প্রভাবে ১২ হাজার হেক্টর হাওর, বাঁওড় ও বিল শুকিয়ে যাওয়া, ৬০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ বিলুপ্তির তথ্য পেয়েছেন বলে জানান নুরুন্নবী।
এ সাফল্যের বিপরীতে আরেকটি চিত্র আছে তুলে ধরে এই গবেষক বলেন, ‘আমরা যখন প্রকৃতির গলা টিপে ধরে উন্নয়ন করি, তখন প্রকৃতির সবটা মিলে ভাবি না। আমরা মানুষকে বিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়নের অংশীদার মনে করি।’
তিস্তায় ১৯৭০ দশকে ১৪০ প্রজাতির মাছ থাকলেও ২০২৩ সালে মাছের প্রজাতি ৩৪–এ চলে এসেছে বলে জানান গবেষক নুরুন্নবী।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাবের অধ্যাপক শাহনাজ হুসনে চৌধুরী ‘ম্যানেজমেন্ট অব ওয়াটার রিসোর্স’–এর ওপর একটি প্রেজেন্টেশন দেন। তিনি পঞ্চগড়ে সন্ধান পাওয়া প্রাচীন সভ্যতা ভিতরগড়ের পানির ব্যবস্থাপনার ওপর বিস্তারিত তুলে ধরেন।
এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মিহির বিশ্বাস।
মিহির বিশ্বাস বলেন, নদীগুলো মানবসভ্যতা গড়ে তুলতে ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। আজ সে নদীগুলো শুকিয়ে মরছে। নদী বাঁচাতে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।