হিম হিম হেমন্তের হিমঝুরি

দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই শহরের পথপাশে ফুটেছে হিমঝুরিছবি : লেখক

একটি স্মরণীয় দিনের কথা বলি। যে দিনটির সঙ্গে একটি বৃক্ষের পূর্ণতার গল্প জড়িয়ে আছে। ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে উৎসবের আমেজে রোপণ করা হয়েছিল দুষ্প্রাপ্য হিমঝুরির একটি চারা। প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন চারাটি সংগ্রহ করেন মূলধারা একাত্তর গ্রন্থের খ্যাতিমান লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মঈদুল হাসানের কাছ থেকে।

চারাটি রোপণের সময় সেদিন বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, পরিচালক ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম, সহপরিচালক মো. আবুল কালাম, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক ও মাহরুখ মহিউদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এমন একটি দুর্লভ মুহূর্তের সাক্ষী হলাম নিজেও। তখন কি আর ভেবেছি, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ফুল ফুটবে গাছটিতে! এ বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে একাডেমির এনামুল হক ভবন লাগোয়া গাছটিতে প্রথমবারের মতো ফুল ফুটেছে। এই আনন্দ তুলনাহীন। ঊর্ধ্বমুখী ডালের আগায় সুসজ্জিত ফুলগুলো। অনেকটাই নাগালের বাইরে। কিছু ফুল ঝরে পড়েছে গাছতলায়। সকালের চনমনে রোদে সাদা রঙের ফুলগুলো ঝলমল করছিল। কয়েকটি ছবি তুলে বিশেষ এই মুহূর্তকে উদ্‌যাপন করি।

হিমঝুরি Millingtonia hortensis হেমন্তের দুর্লভ ফুল। সরু, নলাকার এই ফুলগুলো দেখতে ততটা নান্দনিক না হলেও মিষ্টি সৌরভের জন্য বেশ আদৃত। হিমঝুরির সবচেয়ে বড় গাছটি প্রথম দেখি ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের প্রবেশপথের ধারে। নগরে নিসর্গ গ্রন্থে নিসর্গী ও লেখক বিপ্রদাশ বড়ুয়া গাছটি সম্পর্কে লিখেছেনÑ‘বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন বসু এ গাছের চারাটি কলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে এনেছিলেন।

তখন এখানে তাঁর বাসা ছিল।’ পরে বিপ্রদাশ বড়ুয়া ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বাগানে হিমঝুরির একটি চারা রোপণ করেন। আট বছর পরই এ গাছে ফুল ফুটতে শুরু করে। তিনি কুয়াকাটার মিছরিপাড়ায় রাখাইনদের বাড়িতে আরও তিনটি গাছের সন্ধান দিয়েছেন। ঢাকায় বলধা গার্ডেনের পাশে খ্রিষ্টান কবরস্থানের ভেতরে বিভিন্ন আকারের কয়েকটি গাছ দেখা যায়। বছর কয়েক আগে রমনা পার্কে লাগানো গাছটিতেও গত বছর থেকে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। ২০১৯ সালে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে এ ফুল অনেক দেখেছি। নিশিপুষ্প হওয়ায় ফুলটি অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।

মিয়ানমারের নিজস্ব এই বৃক্ষ আমাদের দেশে এসেছে প্রায় দুই শ বছর আগে। সুদীর্ঘ সময় ধরে আমাদের জল-হাওয়ায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়ায় এখন দেশি গাছ হিসেবেই এটি পরিচিত। বাংলাদেশে এ গাছের নাম কর্কগাছ; রবীন্দ্রনাথ নামকরণ করেছেন হিমঝুরি। হিন্দি নাম আকাশনিম। একসময় এটির মোটা বাকল থেকে বোতলের জন্য নিম্নমানের ছিপি বানানো হতো বলেই সম্ভবত কর্কগাছ নামকরণ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গ্রন্থাগার লাগোয়া হিমঝুরিগাছে ফুল ফুটেছে
ছবি: লেখক

উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা শ্যামলী নিসর্গ গ্রন্থে এ গাছের স্মৃতিচারণা করেছেন এভাবেÑ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলা থেকে কলকাতায় চলেছি ট্রেনে। নভেম্বর মাস। এক অখ্যাত স্টেশনে ট্রেন থেমে গেল। ক্রসিংয়ের ঝামেলা। সবাই প্ল্যাটফর্মে নেমে দুই পা হেঁটে নিচ্ছে। আমি বসলাম একটি বেঞ্চে। হঠাৎ দেখি, আমার গায়ে পাশের আকাশছোঁয়া একটি গাছ থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি ফুল ঝরছে। মুহূর্তেই হিমঝুরি নাম মনে পড়ল, রবীন্দ্রনাথের দেওয়া...।’

হিমঝুরি সুউচ্চ চিরসবুজ বৃক্ষ। ফুল মধুগন্ধি, ফোটে রাতে, ভোরের আগেই ঝরে পড়ে, শাখান্তের বড়সড় যৌগিক মঞ্জরিতে ছাড়া ছাড়াভাবে। ফুলগুলো সাদা ও নলাকার, নলমুখে বসানো থাকে পাঁচটি খুদে পাপড়ির একটি তারা। ফাঁকে ফাঁকে আছে পাঁচটি পরাগধানী, যেন সযত্নে বসানো রত্নপাথর, সাদা বা হলুদ; গর্ভকেশরযুক্ত। ফলগুলো সরু, লম্বা, আগা ও গোড়া সুচালো, সরু পক্ষল বীজে ভরাট, এক ফুট বা ততোধিক দীর্ঘ।

বীজগুলো ঈষৎ স্বচ্ছ পাখনাঘেরা এবং সে কারণেই উড়ুক্কু ও দূরগামী। এ গাছ ছায়াঘন নয় এবং শিকড় অগভীর হওয়ায় ঝড়ে উপড়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাই পথতরুর অনুপযোগী।

বীজ ছাড়াও গাছের শিকড় থেকে গজানো চারা (বেশ দূরে) থেকেই বংশবিস্তার। কাঠ নরম, হালকা, হলুদ ও মসৃণ। আসবাব ও সজ্জাকাজের উপযোগী। ইন্দোনেশিয়ায় এ গাছের বাকলের তেতো রস থেকে জ্বরের ওষুধ বানানো হয়। হেমন্তে স্বল্পসংখ্যক ফুলের বিপরীতে হিমঝুরির দীর্ঘ বীথি কিছুটা হলেও প্রকৃতির দীনতা ঘোচাবে।

  • মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক