উপমহাদেশজুড়ে হাজার কি.মি. বৃষ্টিবলয়, প্রভাব বাংলাদেশেও
মার্চ মাসে দেশে কালবৈশাখী শুরু হয়ে যায়। এবারও হয়েছে। মধ্য মার্চ থেকে বেড়েছে ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির দাপট। এই ঝড়বৃষ্টির এক ভিন্ন বৈশিষ্ট্য আছে। তা হলো, হঠাৎ করেই স্থানীয়ভাবে মেঘ সৃষ্টি হয়। কালো মেঘে ছেয়ে যায় চারপাশ। এ মেঘ ঝরায় বৃষ্টি, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু এবার একটু ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। কীভাবে?
গত বুধবারের বৃষ্টির কথাই ধরুন। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ চারদিক কালো করে রাজধানীর আকাশে মেঘ জমল। ছিল ঠান্ডা হাওয়া। ৬টার পর থেকেই শুরু হলো বৃষ্টি। যাঁরা এ সময়ের মেঘবৃষ্টির আচরণ জানেন, তাঁরা ধারণা করেছিলেন হয়তো কিছুক্ষণ পরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু বৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। রাত ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে।
আজ শুক্রবারের পরিস্থিতিও তা-ই। দুপুর ১২টার দিকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে রাজধানীতে। সন্ধ্যার দিকে এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও আকাশ মেঘলা। কোনো কোনো স্থানে ঝিরঝির বৃষ্টিও হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, ‘যেন শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি।’ ঝড়ের সেই পরিচিত দাপট নেই।
ভারতের এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি একটি অস্বাভাবিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, যেখানে একটি সরলরেখার মতো (একেবারে সোজা) নিম্নচাপজনিত পশ্চিমা ঝঞ্ঝা তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বৃষ্টিপাতের রেখা তৈরি হয়েছে, যা আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারতের ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত। সাধারণত পশ্চিমা ঝঞ্ঝা (পশ্চিমা লঘুচাপ) ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিম্নচাপ থেকে তৈরি হয় এবং উত্তর-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে অগ্রসর হয়। এগুলো শীতকালে বেশি সক্রিয় থাকে এবং তুষারপাত ও শৈত্যপ্রবাহ নিয়ে আসে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এই ঝঞ্ঝা বাঁক না নিয়ে সোজা একটি ট্রফ বা নিম্নচাপের রেখা হিসেবে বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদেরা এ পরিস্থিতি দেখে এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। গত দুই দিন থেকেই আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দেশের অন্তত পাঁচ বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অন্তত আগামীকাল রোববার পর্যন্ত কমবেশি বৃষ্টি হতে পারে। এই যে হাজার কিলোমিটারের উপমহাদেশীয় ‘বৃষ্টিবলয়’, তার প্রভাব আছে বাংলাদেশেও। এ তথ্য জানালেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান।
এ সময় সুদীর্ঘ বৃষ্টিবলয়কে কিছুটা অস্বাভাবিক বলছেন আবহাওয়াবিদেরা। কারণ, মার্চের শেষ দিকে এশিয়ার ওপর সাধারণত যে বড় আকারের বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন ঘটে, এবার তা ঠিকমতো হয়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলছিলেন, এই যে মেঘবলয়ের সৃষ্টি হয়েছে, তা সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এটি হয় মূলত পশ্চিমা লঘুচাপের কারণে। কিন্তু এবার ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ছিল প্রায় বৃষ্টিহীন। পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব প্রায় ছিল না বললেই চলে। পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব প্রাক্-মৌসুমি বায়ুর এ সময়ে অনেকটাই অস্বাভাবিক। মার্চ থেকে এপ্রিল সাধারণত বজ্রঝড়ের মাস। দেশের মোট বজ্রঝড়ের ৩৮ শতাংশ হয় মার্চ থেকে।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এ সময়টায় ঝড়বৃষ্টি সাধারণত হয় পশ্চিমা লঘুচাপের কারণে। সেই লঘুচাপের জ্বালানি হলো আর্দ্রতা। সেই আর্দ্রতার জোগান আসে ভূমধ্যসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং পারস্য উপসাগর থেকে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে।
অল ইন্ডিয়া ওয়েদারের উপগ্রহ চিত্র তুলে ধরে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আরব সাগর থেকে এটি আরও বেশি আর্দ্রতা সংগ্রহ করে। বিশেষ করে হিমালয়ের পাহাড়ি বাধার কারণে বায়ু ওপরে উঠে গেলে এই আর্দ্রতা আরও বৃদ্ধি পায়। আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আরব সাগর থেকে পাওয়া বাড়তি আর্দ্রতা এই বলয়কে শক্তিশালী করে তোলে। বলয়ের অগ্রভাগ ভারতের উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, ওডিশা এবং পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই দীর্ঘ বলয়ের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া জলীয় বাষ্প যুক্ত হয়ে এর পরিধি বিস্তৃত করে। আর তাতে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে যায়। বৃষ্টির বলয়ের প্রভাব বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত চলে আসে।
ঢাকা বাংলাদেশের মধ্যভাগে পড়েছে। গতকাল রাজধানীতে যে টানা বৃষ্টি, তাতে বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্টি হওয়া জলীয় বাষ্পের ভূমিকা আছে। আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখন যে ঝড়বৃষ্টি, তা পশ্চিমা লঘুচাপের ফল। কালবৈশাখী হয় উত্তর-পশ্চিম বায়ুর কারণে। গতকালের বৃষ্টিপাতে বাতাসের গতি বড়জোর ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার ছিল। পশ্চিমা লঘুচাপে সাধারণত বাতাস কম থাকে। কিন্তু এ সময়ের উত্তর-পশ্চিমা বায়ু বা কালবৈশাখীর সময় বাতাসের গতিবেগ মারাত্মক হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বার্তা বলছে, রোববার পর্যন্ত রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। সঙ্গে থাকতে পারে বজ্রঝড়। এটা যে দেশের সব এলাকায় একটানা হবে তা নয়, বিক্ষিপ্তভাবে হতে পারে।
কেন এটা অস্বাভাবিক
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে সক্রিয় এই পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে উত্তর পাকিস্তানের ওপরের বায়ুমণ্ডলে একটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারতে বজ্রঝড় সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাবে ইতিমধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা ও তামিলনাড়ুতেও ভারী বৃষ্টি হয়েছে এবং বিভিন্ন রাজ্যে শিলাবৃষ্টির ঘটনাও দেখা গেছে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলছিলেন, এখন প্রায় এপ্রিল এসে গেছে। তারপরও এই সময় এ মাত্রায় দীর্ঘ বৃষ্টিবলয় কিছুটা অস্বাভাবিক। সাধারণত এই মধ্য মার্চের মধ্যে সাবট্রপিক্যাল জেট স্ট্রিম (পশ্চিমা ঝঞ্ঝা) উত্তর দিকে সরে যেতে থাকে। কিন্তু এবার সেটি এখনো তুলনামূলকভাবে দক্ষিণে অবস্থান করছে এবং বেশ শক্তিশালী রয়েছে। ফলে একটি ঝঞ্ঝা দুর্বল হয়ে যাওয়ার আগেই ভারতীয় উপমহাদেশের গভীর ভেতরে ঢুকে পড়তে পারছে।
একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে একটি ট্রফ (নিম্নচাপ) প্রায় পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সোজা রেখার মতো বিস্তৃত হয়েছে, যেখানে সাধারণত এটি বাঁকানো থাকে। এর ফলে একটি দীর্ঘ ও অবিচ্ছিন্ন অস্থিতিশীলতার অঞ্চল তৈরি হয়েছে।
ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আবার উত্তর ও মধ্য ভারতের ওপর কয়েকটি ছোট ছোট ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে। এগুলো আরব সাগর থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস টেনে আনছে, অন্যদিকে পশ্চিম দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করছে। নিচের স্তরে উষ্ণ আর্দ্র বাতাস এবং ওপরের স্তরে ঠান্ডা বাতাস—এই তীব্র পার্থক্য বায়ুমণ্ডলকে খুব অস্থিতিশীল করে তুলছে।
আবুল কালাম মল্লিক মন্তব্য করেন, যে সময়টায় পশ্চিমা লঘুচাপ আসার কথা অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে মার্চ—সে সময় তা ছিল কম। এখন উত্তর-পশ্চিম ঝঞ্ঝার সময় কিন্তু পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুপ্রবাহে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।