তিন জেলায় লালটুপি কাস্তেচরার দেখা

লালমনিরহাটের দহগ্রামের সাকুয়া নদীতীরবর্তী এলাকায় লালটুপি কাস্তেচরা পাখি। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বরছবি: লেখক

বাংলাদেশে লালটুপি কাস্তেচরা পাখিটি সহজে দেখা যায় না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পদ্মায় খলিফার চরে শর্ষে চাষের সময় পাখিটি দেখা যায়। প্রায় আট বছর ধরে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। কবে থেকে এ পাখি আসে, তা জানা যায়নি। সারা দেশ থেকে অনেক আলোকচিত্রী সেখানে গিয়ে এ পাখি দেখে এসেছেন।

দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। বছর দশেক আগে বিরল এই আবাসিক পাখি নিয়মিত দেখা গেলেও এখন দেখা যায় না। কয়েকজন পক্ষী আলোকচিত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, পাখিটির প্রথম ছবি তোলার রেকর্ড পঞ্চগড়ে। রেজাউল হাফিজ রাহী ২০১৫ সালে তীরনই নদে এ পাখির ছবি প্রথম তোলেন। যতটুকু জানা যায়, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এ পাখি দেখার রেকর্ড ছিল। এর বাইরে লালমনিরহাটে গত ডিসেম্বর মাসে দেখলাম। অন্যত্র দেখার তথ্য আমার জানা নেই।

লালটুপি কাস্তেচরা পাখিটি কালো দোচরা বা কাঁচিচোরা এবং কালোমাথা কাস্তেচরার মতোই অনেকটা দেখতে। আকৃতিতে লালটুপি কাস্তেচরা সামান্য বড় হবে। বিশেষ করে ঠোঁটের গঠন প্রায় এক। ধূসর রঙের লম্বা ঠোঁটটি নিচের দিকে বাঁকানো। গলা, পিঠ, পেটের দিকটা গাঢ় বাদামি ও পা গোলাপি। অপরাপর কাস্তেচরার চেয়ে এর ভিন্নতা প্রধানত মাথায়। এই কাস্তেচরার মাথায় লালটুপির মতো পালক আছে। এই কারণে পাখিটিকে লালটুপি কাস্তেচরা নামে ডাকা হয়। ইংরেজি নাম ‘গ্লসি আইবিস’।

পাখিটি আমি প্রথম দেখেছি ২০২১ সালে নভেম্বর মাসে পঞ্চগড়ে। পঞ্চগড়ের নদী সম্মেলনে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) তৎকালীন প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও একই অনুষ্ঠানে পঞ্চগড়ে গিয়েছিলেন। সকালে আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। সেদিন কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলেনি। সকালে পঞ্চগড়ে কিছু দুর্লভ পাখি দেখা যায়। তাই মহানন্দা নদীর পাশে তেঁতুলিয়ায় সকালে পাখি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া বাজারের পাশে একটি উঁচু টাওয়ারের দিকে চোখ দিতেই দেখি দুটি লালটুপি কাস্তেচরা। অনেক উঁচুতে তাদের অবস্থান হওয়ায় ভালোভাবে দেখতে পাইনি।

গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে গিয়েছিলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার চরে। চরটি বেশ দুর্গম। যে চরে এই পাখি দেখা যায়, সেই চর পর্যন্ত যেতে অনেকবার পরিবহন বদলাতে হয়। বাস, সিএনজি, রিকশা—সবশেষে একটি নৌকা নিয়ে প্রায় ৪০ মিনিটে সেই কাঙ্ক্ষিত পদ্মার খলিফার চরে পৌঁছাই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাস্তেচরার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। মাঠে যাঁরা কৃষিকাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁকেই জিজ্ঞেস করি, তাঁরই একই উত্তর—‘সব সময় দেখা যায়, আজ দেখছি না।’ আমার সঙ্গে ছিলেন প্রকৌশলী ফজলুল হক। বিশাল চর আমরা খুঁজতে থাকলাম। চরে কোনো খাবারের দোকান নেই। আমাদের সঙ্গে করে আনা রুটি-কলা দুপুরে যখন খাওয়ার জন্য মনস্থির করেছি, তখনই দূর থেকে দেখলাম কয়েকটি লালটুপি কাস্তেচরা পাখি একটি ধানখেতের আলে হেঁটে বেড়াচ্ছে। রুটি-কলা না খেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম পাখিগুলোর দিকে।

সৌভাগ্যক্রমে পাখিগুলোই আমাদের কাছে এসে বসল। ১০টি লালটুপি কাস্তেচরা। আমরা মনের মতো ছবি তুললাম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা নদীর খলিফার চরে লালটুপি কাস্তেচরা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে
ছবি: লেখক

২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গিয়েছিলাম লালমনিরহাটে। সেখানে দহগ্রাম, আঙ্গরপোতা ও তিনবিঘা করিডর দেখতে যাই। তিনবিঘা করিডর, দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা দেখে যখন ফিরছিলাম, তখন সাকোয়া নদীতে সাতটি লালটুপি কাস্তেচরা দেখতে পাই। গাড়ি দাঁড় করিয়ে কিছু ছবি তুললাম। গাড়িতে আমার পরিবারের সদস্য ছাড়া আরও কয়েকজন ছিলেন। তাঁদের বিরক্তির উদ্রেক হতে পারে ভেবে আর কাদাপানিতে নামিনি। নয়তো কাদাপানিতে নেমে ধীরে
ধীরে কাছে যেতে পারলে আরও ভালো ছবি ও ভিডিও পাওয়া যেত। তারপরও যে ছবি পাওয়া গেল, তাতেই মন ভরে উঠেছে। লালমনিরহাটে লালটুপি কাস্তেচরা দেখার আনন্দটাই যেন বেশি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পঞ্চগড়ে যে দুটি স্থানে লালটুপি কাস্তেচরা দেখা যায়, আমি সেই দুটি স্থানেও দেখেছি; বরং নতুন আরেকটি স্থানেও পাখিটি দেখা গেল। দেশের তিন জেলায় লালটুপি দেখতে পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের।

তিনটি স্থানের মধ্যে একটি সাধারণ মিল আছে। সেটি হলো, তিনটি স্থানই ভারতের সীমানাসংলগ্ন। বাংলাদেশে পাখিগুলো সম্ভবত অনুকূল পরিবেশ পায় না। সেই কারণে সীমান্তের কাছাকাছি থাকে। ফলে বাংলাদেশে আসা পাখির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। পাখির জন্য বাংলাদেশে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হোক। দুর্লভ পাখি লালটুপি কাস্তেচরা সর্বত্রই দেখা যাক—এটাই প্রত্যাশা।

  • তুহিন ওয়াদুদ, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর