পৌষের শেষ। হিমের পরশ নিয়ে চলেছি গাছপালার কাছে, যদি একটু উষ্ণতা পাই! মনের মধ্যে বাজছে গানের কলি—‘পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন, ফিরে আর আসবে কি কখনো?’ পৌষের শেষাশেষি, সকালে রোদ নেই, চারদিকে কেমন যেন ধোঁয়াশা ভাব। তবে রোদের ওম না পেলেও সেদিন ফুলের ওম পেয়ে মনটা তেতে উঠল। ফুলগুলোর পাপড়ি যেন লেলিহান আগুনের শিখা! এ রকম চেহারার আরও একটি ফুলও আছে এ দেশে, তার নাম অগ্নিশিখা বা উলটচাল। কিন্তু এই ফুলের কোনো বাংলা নাম নেই। ঢাকার অদূরে সাভারের বরিশাল নার্সারিতে ঢুকে একটা ঝোপালো গাছের ডালে ডালে এ ফুলগুলো ফুটতে দেখে স্মৃতি হাতড়াতে শুরু করি, আর কোথায় তাকে দেখেছি?
বাস্তবে দেখেছি মানিকগঞ্জে হরিরামপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে, তরু সংগ্রাহক তানভীর আহমেদের বাড়িতে। আর ছবি দেখেছি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আশরাফুজ্জামানের ফেসবুক পোস্টে। তিনি লিখেছেন, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে ফুটেছে এই ফুল।
বরিশাল নার্সারির ব্যবস্থাপক আলাউদ্দিন সাহেব বললেন, প্রায় পাঁচ বছর আগে থাইল্যান্ড থেকে এ গাছের চারা এনে রোপণ করা হয়েছিল। এরপর গাছটি বড় হয়েছে, ঝোপালো হয়েছে ডালপালা মেলে। পাতাগুলো অবিকল অন্য কাঞ্চনের মতো, উটের খুরের মতো দোভাঁজ করা পত্রফলক। কিন্তু এর আগে কখনো এ গাছে ফুল ফোটেনি।
আলাউদ্দিন সাহেব বললেন, ফুলের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন এবার গাছটি কেটে ফেলবেন। গাছেরা কি মানুষের মনের কথা বুঝতে পারে? না হলে কেটে ফেলার কথা ভাবতেই এ বছর শীতে গাছে ফুলগুলো ফুটল কেন? ফুলগুলো দেখেন, কেমন সুন্দর আর অন্য রকম। এ রকম কাঞ্চন ফুল কখনো দেখেননি বলে জানালেন।
আমি তখন বললাম, আমি একবারই দেখেছি, এবার দ্বিতীয়বারের মতো দেখলাম। ফুল না থাকলে এ গাছকে অন্য যেকোনো কাঞ্চনগাছের মতো মনে হবে। একটু তফাত আছে, তা হলো এর ডালপালা কাষ্ঠল হলেও সরু ও লতানো বা ঝোলানো। পাতার কোল থেকে ফুল ফুটেছে।
বাসায় ফিরে এসে ফুলটি জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ও প্রজাতির নাম জানার জন্য ঘাঁটাঘাঁটি করতে বসলাম। প্রচুর তথ্য পেলাম অধ্যাপক মো. আশরাফুজ্জামান ও প্রবাসী উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা মোশতাক কাদরীর ফেসবুক পোস্ট থেকে। অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান একে শনাক্ত করেছেন Bauhinia pottsii প্রজাতি হিসেবে, গোত্র ফ্যাবেসি। একে এ দেশের কাঞ্চনজগতে নতুন বলেই মনে হচ্ছে। বিদেশ থেকে কয়েক বছর হলো গাছটি এসেছে। সংগত কারণে এর বাংলা নামকরণ করা হয়নি। অর্কিডের মতো ফুল, তাই এর ইংরেজি নাম Orchid Tree। মোশতাক ভাই এর বাংলা নাম প্রস্তাব করেছেন অনলকাঞ্চন, নামটি গ্রহণ করা যেতে পারে। আবার এ ফুলের সঙ্গে উলটচাল বা অগ্নিশিখা ফুলের যেহেতু অনেকটা মিল আছে, সে জন্য এর নাম রাখা যেতে পারে অগ্নিকাঞ্চন। উদ্ভিদবিদেরাই তা সাব্যস্ত করবেন।
অগ্নিকাঞ্চনগাছ পুরোপুরি লতানো নয়। কাষ্ঠল লতানো বীরুৎ, ছোট আকারের গাছ। বহুবর্ষজীবী ও প্রচুর শাখায়িত, ঝোপালো। পাতা অন্য কাঞ্চনের মতোই, দ্বিফলকবিশিষ্ট, ফলক ডিম্বাকার। প্রসারিত অবস্থায় প্রজাপতির মতো দেখায়। উটের খুরের ছাপের মতো আকৃতি বলে কাঞ্চনদের আরেক ইংরেজি নাম ক্যামেল’স ফুট ট্রি। কচি পাতা লালচে তাম্রবর্ণ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ হয়ে যায়। পাতা সূক্ষ্ম রোমাবৃত। ফুলের পাপড়ি পাঁচটি, উজ্জ্বল লাল ও হলুদ ছোপবিশিষ্ট, পাপড়ির কিনারা কুঁচকানো। মাঝখানের পাপড়ি বড় ও চওড়া, অন্যগুলো কিছুটা সরু, তিনটি প্রজননে সক্ষম পুরুষ কেশর থাকে, বাকিগুলো বন্ধ্যা। ফল শিমের মতো, ফলের ভেতরে ৪-৬টি বীজ থাকে। ফল পাকলে ফেটে ভেতর থেকে বীজ ছড়িয়ে পড়ে। আর্দ্রবনের উদ্ভিদ। নিম্নভূমির বনাঞ্চলে, জলাভূমির ধারে, বনের প্রান্তে, নদীর তীরবর্তী স্থান এ গাছের প্রাকৃতিক আবাসভূমি। থাইল্যান্ড, ইন্দো-চীন, মালয় পেনিনসুলা ও দক্ষিণ মিয়ানমারে এ গাছ প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। টি বুনকার্ড ও সাথি গবেষকদের গবেষণায় থাইল্যান্ডে অগ্নিকাঞ্চনের চারটি জাতের খোঁজ পাওয়া গেছে। ফুলের ব্যতিক্রমী চেহারা ও উজ্জ্বল রঙের কারণে একে বাগানের শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে এখন লাগানো হচ্ছে।
অগ্নিকাঞ্চন একটি রোদবিলাসী গাছ, আংশিক ছায়ায় হয়, ছায়া জায়গায় ভালো হয় না। নিয়মিত সেচ ও জৈব সার দিলে গাছে বেশি ফুল ফোটে। বেশি ইউরিয়া না দেওয়া ভালো, এতে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি বেশি হয়, ফুল ফোটে কম। ছাদে বড় ড্রামে, বাগানে বা পার্কে এ গাছ রোপণ করা যায়। শীতের পর ফুল ফোটা শেষে গাছ ছেঁটে দিতে হয়। পরিপক্ব বীজ দুদিন পানিতে ভিজিয়ে মাটিতে বুনলে হয় চারা। তবে তাতে মা গাছের বৈশিষ্ট্য ঠিক থাকে না।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক