অবশেষে পাতিসারসের দেখা

কানাইঘাটের বড় হাওরের শুকিয়ে যাওয়া বিলে তিনটি পাতিসারসছবি: লেখক

বছরখানেক আগের কথা। বিরল এক পাখির খোঁজে ‘বার্ডিং বিডি টিম’-এর সঙ্গে সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে গিয়েছিলাম। স্থানীয় পাখি সংরক্ষক বর্ষীয়ান শামীম খান আমাদের হাওরে নিয়ে গেলেন। অসংখ্য বিলের সমন্বয়ে চমৎকার হাওর। বিলগুলোতে হাঁসসহ নানা প্রজাতির জলচর পাখি। মহিষ ও গরুর পাল বিলে চরছে। চমৎকার সে দৃশ্য!

কিন্তু দুর্ভাগ্য—সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। একসময় আকাশেজুড়ে অন্ধকার নেমে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। আমরা কোনোরকমে জেলেদের ডেরায় ঢুকে বৃষ্টি থেকে ক্যামেরা রক্ষা করলাম। বৃষ্টি থামলে বিদায় নিলাম। কিন্তু জেলেরা চা-বিস্কুট না খাইয়ে ছাড়লেন না। তাঁদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে আমরা পাখিটির খোঁজে সামনে এগোলাম।

কিন্তু মেঘলা আকাশে সারা দিনেও পাখি দুটির দেখা মিলল না। অথচ আগের দিনই চমৎকার আবহাওয়ায় পাখি দুটি ঘুরে বেড়িয়েছে। যাক, আমাদের কপাল মন্দ। সারা দিন হাওর-বিলে প্রায় ১৪ কিলোমিটার হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রাতের বাসে ঢাকায় ফিরলাম। এরপর পাখিগুলোকে আর হাওরে ফিরে আসতে দেখা যায়নি।

এ বছরের ৭ জানুয়ারি ফেসবুকে শামীম ভাইয়ের পোস্টে তিনটি সারসের ছবি দেখলাম। দেখে মনে হলো, গত বছরের জোড়াটি একটি ছানাসহ এসেছে। শামীম ভাই আমাকে আসতে বললেন। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য সঙ্গে সঙ্গে যেতে পারলাম না। এর মধ্যে আরও দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেল।

অবশেষে ২২ জানুয়ারি রাতে ছয়জনের টিম নিয়ে রওনা হলাম। কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট থাকায় সিলেটে পৌঁছাতে চার–পাঁচ ঘণ্টা দেরি হলো। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাওরের এক গরু-মহিষের বাথানে শামীম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি প্রথমেই বাইনোকুলারে দূর থেকে তাদের অবস্থান দেখালেন। এরপর প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে পাখিগুলোর নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে থামলাম। সেখানে বেশ বড় বড় ঘাসঝোপ ছিল। ঘাসঝোপের আড়ালে বসে পাখিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। প্রায় ৩৩ মিনিট ধরে থেমে থেমে ছবি তুললাম। একসময় পাখিগুলো উড়ল। আমরাও পেলাম কিছু উড়ন্ত ছবি।

বিরল এই পাখিগুলো এ দেশের অনিয়মিত ও তথ্য অপ্রতুল পরিযায়ী পাখি—পাতিসারস। পশ্চিমবঙ্গে বলে কালো কাক। ইংরেজি নাম কমন/ইউরেশিয়ান ক্রেন। গ্রুইডি গোত্রের সারসটির বৈজ্ঞানিক নাম Grus grus। উত্তর ইউরোপ ও সাইবেরিয়ার আবাসিক পাখিটি শীতে উত্তর পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীনসহ বেশ কিছু দেশে পরিযায়ন করে।

উনিশ শতকে ঢাকা বিভাগের নদীতীরে দেখা যেত। এরপর প্রায় শতবর্ষ পাখিগুলোকে দেখার তথ্য নেই। কিন্তু ২০১৫ সালে আবার দেখা মেলে ভোলার উপকূলে। এরপর রাজশাহী, মানিকগঞ্জ এবং দুই বছর ধরে সিলেটে দেখা যাচ্ছে।

সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরের ওপর ছানাসহ উড়ন্ত পাতিসারস
ছবি: লেখক

প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য ১০০–১৩০ সেন্টিমিটার, ওজন ৩–৬ কেজি। দেহ লম্বা, গলাও লম্বা। একনজরে পালক ধূসর। কপাল, মুখমণ্ডল ও গলা কালো। মাথার চাঁদির চামড়া লাল। চোখের পেছন থেকে দুটি লম্বা সাদা দাগ ঘাড় হয়ে পিঠ পর্যন্ত গেছে। চোখ কমলা-লাল থেকে গাঢ় লাল। চঞ্চু, পা ও পায়ের পাতা ধূসরাভ। স্ত্রী ও পুরুষে তেমন পার্থক্য নেই, তবে পুরুষ আকারে বড়।

দিবাচর ও লাজুক পাখিগুলো সচরাচর ছোট থেকে বড় ঝাঁকে বিচরণ করে। ভোর ও গোধূলিতে খাবারের খোঁজে বের হয়, অন্য সময় বিশ্রাম নেয়। জলাভূমিতে হেঁটে হেঁটে ও নরম কাদায় চঞ্চু ঢুকিয়ে জলজ উদ্ভিদের গোড়া ও কন্দ, জলজ পোকামাকড় ইত্যাদি খায়। শস্য, বীজ, লতাপাতা ও মেরুদণ্ডী প্রাণীতেও অনীহা নেই। ওড়ার আগে কিছুটা দৌড়ায়, তারপর ওড়ে।

মে থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় তারা সম্মিলিতভাবে দৌড়ায় এবং মাথা উঁচু করে দৃষ্টিনন্দন নৃত্যে মেতে ওঠে। নিজের আবাস এলাকায় জলাশয়ের কাছে ডালপালা, কাঠিকুটি ও ঘাস দিয়ে বিশালাকৃতির মাচান বাসা বানায়। একই বাসা মেরামত করে বছর বছর ব্যবহার করে। স্ত্রী দু–চারটি হালকা বাদামি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলে ডিমে তা দেয় এবং ছানা লালন–পালন করে। প্রায় ৩০ দিনে ডিম ফোটে। ছানারা প্রায় ৯ সপ্তাহে উড়তে শেখে, তবে প্রজননক্ষম হয় ৩–৬ বছরে। আয়ুষ্কাল ১৩ বছরের বেশি।

  • আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়