ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি হাউজিং সোসাইটির মাছের ঘেরের ওপর দিয়ে উড়ন্ত কালি বগলা
ছবি: লেখক

অতি পরিচিত জলজ পাখি বকের রয়েছে তিনটি ধরন—বক (হিরন), বগা (ইগরেট) ও বগলা (বিটার্ন)। মাঝারি আকার এবং লম্বা চঞ্চু-গলা-পায়ের পাখিগুলোর লেজ ছোট। দিবাচর বক ও বগাগুলো লম্বা গলাসহ ছিপছিপে। নিশিবক ও বগলাগুলো বেঁটে, পা ও গলা খাটো। বিশ্বে ৬৯ প্রজাতির বক থাকলেও বাংলাদেশে আছে ১৮টি। আর বগলার প্রজাতি মাত্র চারটি। তবে অত্যন্ত লাজুক ও সাবধানী হওয়ায় সহজে চোখে পড়ে না। চার প্রজাতির মধ্যে একটি অতি বিরল। বাকি তিনটিকে নিয়েই আজকের গপ্প।

এক. নতুন ছাত্রদের ওরিয়েন্টেশন লেকচার শেষে অনুষদের বাইরে হাঁটছি। আচমকা মাথার ওপর দিয়ে ধীরগতিতে এক জোড়া কালো পাখি উড়ে গেল। ‘আরে, এ তো সেই পাখি, যাকে এক যুগ ধরে খুঁজছি!’ ওর খোঁজে কোথায় না গেছি? কিন্তু দেখা পাইনি। ক্যাম্পাসে হাঁটতে বের হলে সচরাচর ক্যামেরা থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেদিন ক্যামেরা নিইনি।

কাজেই বহুপ্রতী‌ক্ষিত পাখিটির দেখা পেয়েও ছবি তুলতে পারলাম না। দৃষ্টিসীমার অগোচর হওয়া পর্যন্ত অপলক চেয়ে রইলাম। মার্চ ২০১৯-এর ঘটনা এটি। বছরখানেক পর ভারতের রাজস্থানের ভরতপুর পাখি অভয়ারণ্যের ঝোপের ভেতর একটিকে দেখলাম। কিন্তু ডালপালার জন্য ছবি ভালো হলো না।

চুয়াডাঙ্গা সদরের বেলগাছি গ্রামের বকচর বিলে দাঁড়ানো অবস্থায় হলদে বগলা
ছবি: লেখক

সম্প্রতি বেশ কজন আলোকচিত্রী ওর ছবি তুলেছে জানতে পেরে ১ সেপ্টেম্বর ভোরে পাখিবিষয়ক আলোকচিত্রী ইমরুল হাসানকে সঙ্গে নিয়ে স্পটে গেলাম। আমার বাসা থেকে মাত্র ৮ থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে এক গ্রামীণ পরিবেশে ওর বাস। তবে নিরাপত্তার কারণে জায়গার নাম লিখলাম না।

স্পটে নেমে হাউজিংয়ের সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। তবে নামেই হাউজিং, বাস্তবে এক মাছের ঘেরে ঢুকলাম যেন! ক্যামেরার সেটিং ঠিক করছি, এমন সময় হঠাৎ পাখিটি উড়ে এসে ধানখেতের ভেতর হারিয়ে গেল। প্রথম সুযোগ নষ্ট হলো। এবার খানিকটা ঘুরে পেছন দিক দিয়ে গেলাম। জায়গামতো পৌঁছানোর আগেই পাখিটি আবারও উড়ল। এবারও ফসকে গেল। খানিক পর আবারও আকাশে দেখা গেল। এবার যায় কোথায়? কিন্তু গাছের আড়ালে চলে যাওয়ায় মাত্র চারটি ছবি তুলতে পারলাম। দুটি ভালো হলো। দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটল। দুর্লভ কালো পাখিটি এ দেশের প্রায় শঙ্কাগ্রস্ত আবাসিক পাখি কালি বগলা, কালো বা ওয়া বক (ব্ল্যাক বিটার্ন)। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ওর বসবাস।

দুই. পাখিবিষয়ক আলোকচিত্রী প্রয়াত তানিয়া খানসহ শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের দিকে যাচ্ছি। পথের দুই পাশের ধানখেতের দিকে তীক্ষ্ণ নজর। না, দেখা পেলাম না। ফিরতি পথেও দেখলাম না। দ্রুত ছুটলাম বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়ারণ্যের দিকে। রাস্তা পুরোপুরি শুকায়নি, জায়গায় জায়গায় কাদা। অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটেই গেলাম।

অভয়ারণ্যের কাছাকাছি আসতেই পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঢোলকলমি ও কচুরিপানায় পূর্ণ খালটির দিকে চোখ গেল। কচুরিপানার ভেতর থেকে হলদে বর্ণের কিছু একটা উড়ে গিয়ে পাশের ঢোলকলমির ঝোপে নামল। সঙ্গে সঙ্গে ক্লিক করলাম। মনটা ভরে গেল দুর্লভ পাখিটিকে দেখে। ২২ সেপ্টেম্বর ২০১২-এর ঘটনা। এরপর পাখিটিকে বহু জায়গায় বহুবার দেখেছি। সর্বশেষ ৩১ সেপ্টেম্বর বেশ কবার দেখলাম কালি বগলার ছবি তোলার পর। এটি এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি হলদে বগলা, হলুদ বা কাঠবক (ইয়েলো বিটার্ন)। বাংলাদেশ ছাড়াও সাইবেরিয়াসহ এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত।

তিন. ফকিরহাটের মূলঘর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সাইকেল আরোহী এক কিশোরের কাছে লালচে বকটিকে দেখি। সে একজন পাখি বিক্রেতা। সাইকেল থামিয়ে পাখিটির দুটি ছবি তুলি। ছেলেটিকে বোঝাই, বুনো পাখি ধরা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভবিষ্যতে এ কাজ করবে না বলে দ্রুত সাইকেলে প্যাডেল মেরে ছেলেটি চলে গেল।

ডিসেম্বর ১৯৯৬-এর ঘটনা এটি। এরপর বহু বছর কেটে গেলেও পাখিটির দেখা পাইনি। মে ২০১৮-এর সকালে রাজশাহীর সিমলা পার্কের ধানখেতের ওপর দিয়ে এটিকে উড়ে যেতে দেখলাম। ক্লিক করলাম, ছবি ঝাপসা হলো। ১৪ নভেম্বর ২০২০–এর রাতে আচমকা কোত্থেকে একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি এসে আমার বাসার বারান্দায় ঢুকল।

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের জয়মণ্টপ গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে লালচে বগলা
ছবি: ইমরুল হাসান

পাখিটি কিছুটা আহত ছিল। দ্রুত কটি ছবি তুলে ওর চিকিৎসার জোগাড়যন্তর করতে গেলাম। কিন্তু ফিরে এসে পাখিটিকে আর পেলাম না। হয়তো গ্রিলের ফাঁক গলে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই চলে গেছে। কালি ও হলুদ বগলা দুটোকে ৩১ সেপ্টেম্বর যেখানে দেখলাম, লালচেটিকেও সেখানে ইমরুল একদিন দেখেছিল।

কিন্তু সেদিন ওর দেখা পেলাম না। এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখিটি নলঘোঙ্গা বা নলচোঙ্গা (সিনামন বা চেস্টনাট বিটার্ন)। রাঙ্গি, লাল, নল, আগুনি বা খয়েরি (পশ্চিমবঙ্গ) বক নামেও পরিচিত। বাংলাদেশসহ এশিয়াজুড়ে দেখা যায়।

আমার দেখা তিনটি ছাড়াও অদেখা যে অতি বিরল বগলাটি রয়েছে, সেটি এ দেশের পরিযায়ী বাঘা বগলা, বড় নলঘোঙ্গা, লাল বাচকো বা লাল শরৎ (ইউরেশিয়ান বা গ্রেট বিটার্ন)। সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলে কালেভদ্রে দেখা যায়।

  • আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ