আলাভোলা এক পাখির গল্প

কক্সবাজারের সোনাদিয়ার বেলেকেরদিয়া চরে দাঁড়ানো এক জোড়া ছোট নডিছবি: লেখক

গ্যারি অলপোর্ট ও জ্যান-এরিক নিলসন দুজন বিদেশি পক্ষীবিদ ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় প্রথমবারের মতো এক প্রজাতির সামুদ্রিক পাখির সন্ধান পান। পাখিটিকে দেখার জন্য ‘বার্ডিংবিডি ট্যুরস’-এর সঙ্গে ওই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার রওনা হলাম। ভোরে ডলফিন মোড়ে পৌঁছে নাশতা সেরেই ঘাটের দিকে ছুটলাম। ঘাটে এসেই নূরুল আফসারের স্পিডবোট ছোটালাম মহেশখালী চ্যানেলের দিকে। ওখানেই জেলেদের ট্রলারগুলোর কাছে বয়ার ওপর পাখিগুলোকে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু অনেকক্ষণ খুঁজেও ওদের না পেয়ে হতাশ হলাম। এ ছাড়া পাখিগুলোকে সোনাদিয়ার বেলেকেরদিয়া চরেও দেখা গিয়েছিল। কাজেই আশায় বুক বেঁধে এবার সেদিকে ছুটলাম।

উপকূলীয় বাদাবন পেরিয়ে সকাল ১০টায় কালাদিয়া চরে পৌঁছলাম। ভাটা শুরু হয়ে গেছে। জোয়ারের পানি নামছে ধীরে ধীরে; লোনাজলের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে টুকরা টুকরা বালুচর। চরের কাছাকাছি এসেই চার-পাঁচ শ সৈকত পাখিকে সদ্য জেগে ওঠা পলিমাটিতে খাদ্য খেতে দেখলাম। স্পিডবোট থেকে হাঁটুপানিতে নেমে ঘণ্টাখানেক ওদের পেছনে ঘুরে ১০ প্রজাতির পাখির ছবি তুললাম। এরপর বেলেকেরদিয়ার দিকে রওনা হলাম। বেলেকেরদিয়ার কাছাকাছি এসে খানিকটা দূরের একচিলতে চরে একঝাঁক পাখি দেখলাম। অধ্যাপক মনিরুল খান চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে সেই ঝাঁকে কালচে একটি পাখি দেখলেন। যা বোঝার তা বুঝে ফেললাম।

দ্রুত নূরুল আফসারকে সেদিকে স্পিডবোট ছোটাতে বললাম। কিন্তু বড় বড় ঢেউ ও ডুবোচরের ভয়ে সে যেতে চাইল না। অবশেষে তাকে বললাম যে পাখির খোঁজে সুদূর ঢাকা থেকে এসেছি, মনে হচ্ছে সেই পাখি এখানেই। এ কথায় কাজ হলো। সে স্পিডবোট চরের কাছাকাছি নিয়ে গেল। বোট থেকে হাঁটুপানিতে নেমে ধীরে ধীরে সামনে এগোলাম। সত্যিই আমরা যার খোঁজে এসেছি, সেই অতি আরাধ্য পাখিটির তিনটিকে দেখা গেল। সবাই বেজায় খুশি। দেড় ঘণ্টায় নানা ভঙ্গিমায় আলাভোলা পাখিগুলোর ছবি তুললাম, ভিডিও করলাম। পাশেই জেলেরা মাছ ধরছিল। তাই মাছের জন্য পাখিগুলো জেলেদের সঙ্গ ছাড়ছিল না। আসলে গভীর সমুদ্রের পাখিগুলোর তো মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার তেমন অভিজ্ঞতা নেই, তাই হয়তো ভয়ডর কম।

সোনাদিয়ার বেলেকেরদিয়া চরে দেখা আলাভোলা পাখিটি এ দেশের পক্ষীতালিকায় নতুন যোগ হওয়া ভবঘুরে প্রজাতির বিরল পাখি। এর কোনো বাংলা নাম নেই। ইংরেজি নাম লেসার নডির অনুবাদে ছোট নডি বলা যায়। ল্যারিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Anous tenuirostris, যার অর্থ বোকা সরুঠোঁটি পাখি। এটি ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় জল, প্রবালপ্রাচীর, পাথুরে দ্বীপ ও উন্মুক্ত সমুদ্রে বাস করে। প্রজননকালে শিকারি প্রাণীমুক্ত সিসিলি, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ, মালদ্বীপ, মরিশাস ও পশ্চিম ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে চলে যায়।

সোনাদিয়ায় বেলেকেরদিয়া চরের ওপর উড়ন্ত একটি ছোট নডি
ছবি: লেখক

প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য ৩০-৩৪ সেন্টিমিটার। ওজন ৯৭-১২০ গ্রাম। মাথা ছাড়া পুরো দেহ কালচে-বাদামি। কপাল ও মাথা সাদাটে ধূসর। চোখের পেছনের অর্ধেকটায় সাদা অর্ধবলয় রয়েছে। ডানা লম্বা, সরু ও চোখা। লেজ কীলকাকৃতির। কালো লম্বা ও চোখা ঠোঁটটি অত্যন্ত সরু। চোখের মণি কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কুচকুচে কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পালক ফ্যাকাশে বাদামি, মাথা বড়দের মতোই সাদাটে-ধূসর।

এরা অত্যন্ত সামাজিক ও দলবদ্ধ পাখি। বড় বড় দলে খাবারের খোঁজে সমুদ্রে উড়ে বেড়ায়। প্রায়ই মাছের ঝাঁকের সঙ্গে ওড়ে। শিকারি মাছ যখন ছোট মাছদের পানির ওপরের দিকে তাড়া করে, তখন ওরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছোট মাছগুলোকে তুলে খায়। প্রধান খাদ্য সামুদ্রিক মাছ ও স্কুইড। সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণীও খেতে পারে। ‘আরররক-আরররক...’ বা ‘উগুগুগ...’ শব্দে ডাকে।

এরা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময় প্রজনন করে; সিসিলিতে এপ্রিল-অক্টোবরে ও অ্যারাইড দ্বীপে মে-জুনে। সচরাচর বড় উপনিবেশ গড়ে প্রজনন করে, যেখানে ১০ হাজার জোড়া পর্যন্ত পাখি থাকতে পারে। গাছের ডালে শুকনা পাতা ও সামুদ্রিক উদ্ভিদ দিয়ে বিশাল বাসা বানায়। তবে মরিশাসে মাটিতে বাসা বানায়। লালচে-বাদামি ও গাঢ় ছিটছোপসহ হালকা হলুদ বা ঘিয়ে রঙের একটিমাত্র ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ৩৪-৩৫ দিন তা দিয়ে ছানা তোলে। ছানারা ৫৫-৭০ দিনে উড়তে শেখে এবং তিন-চার বছরে প্রজননক্ষম হয়। আয়ুষ্কাল প্রায় ১৭ বছর।

  • আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর