জ্বালানিসংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র-গ্রামীণ জনগোষ্ঠী: আইপিডি

আইপিডি আয়োজিত ‘জ্বালানিসংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ণ ও উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খানছবি: প্রথম আলো

বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট ও আমদানিনির্ভরতার চাপ বাংলাদেশের নগরায়ণ ও উন্নয়ন ভাবনায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহঘাটতি ও বিদ্যুৎ–সংকটে সৃষ্ট বৈষম্যের ভার সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর। নগরকেন্দ্রিক নীতির ফলে গ্রামবাসী ও প্রান্তিক মানুষ মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সমন্বিত নগর-গ্রামীণ পরিকল্পনা ও বিকল্প জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর জরুরি।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত ‘জ্বালানিসংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ণ ও উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলনকক্ষে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক করে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থার কারণে দেশ সংকটে পড়ছে। গ্যাস ও তেলের সীমিত সরবরাহ, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং নগরকেন্দ্রিক উন্নয়ন নীতিতে বৈষম্য বাড়ছে। ভবন ও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত জ্বালানিনির্ভরতা, এসিনির্ভর স্থাপনা ও প্রাইভেট কারের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যার প্রভাব গ্রাম ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি পড়ছে।

বিকল্প জ্বালানি ও দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনায় দ্রুত রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নগর, জ্বালানি, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোর মধ্যে সমন্বিত নীতি কাঠামো না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রম প্রায়ই খণ্ডিত ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। যেকোনো অবকাঠামো ও ভবনের ক্ষেত্রে এনার্জি ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, গ্রিন বিল্ডিং কোড (পরিবেশবান্ধব নীতিমালা) বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে রেল ও নৌপথভিত্তিক পণ্য পরিবহন শক্তিশালী করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সমাধান হিসেবে সমন্বিত নগর-গ্রামীণ পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, গণপরিবহন সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি-দক্ষ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার অভিঘাত আরও গভীরভাবে বাংলাদেশে প্রভাব ফেলবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সংলাপে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট ও আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের নগর ও গ্রামীণ জীবনব্যবস্থা গভীর বৈষম্যের মুখে পড়েছে। জ্বালানি ও নগর-পরিকল্পনাকে একীভূতভাবে বিবেচনা না করায় শহরে চাপ বেড়েছে। এর ফলে গ্রাম থেকে শহরমুখী জনস্রোত জ্বালানিনির্ভরতা ও অবকাঠামোগত সংকট আরও তীব্র করেছে। মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নগর, গ্রাম ও সমুদ্র—সবকিছুকে একীভূত কাঠামোয় আনতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

যোগাযোগ গবেষক সাজেদুল হক বলেন, গণপরিবহনব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ায় ব্যক্তিগত যানবাহন ও বৈদ্যুতিক রিকশার চাপ বাড়ছে। সরকারি সংস্থা বিআরটিসি ও বাস রেশনালাইজেশনের প্রকল্পও কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। শহর পরিকল্পনা, পরিবহন ও জ্বালানির নীতিকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। ফলে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। সামাজিক আচরণ ও নীতিগত প্রস্তুতির পরিবর্তন ছাড়া কোনো প্রযুক্তি বা প্রকল্প টেকসই হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আইপিডির রিসার্চ ফেলো ফরহাদুর রেজা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভবন খাতই সবচেয়ে বড় এনার্জি ব্যবহারকারী ক্ষেত্রগুলোর একটি। পৃথিবীতে মোট জ্বালানির প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ এবং বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে ৪০ শতাংশের বেশি এনার্জি কেবল বিল্ডিং খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায় এনার্জি এফিশিয়েন্ট ও গ্রিন বিল্ডিং ধারণা এখন সময়ের দাবি। তার মতে, গ্রিন বিল্ডিং শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয় নয়, বরং আলো-বাতাস, পানি ব্যবহার, অপারেশনাল খরচ ও সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব কমানোর একটি সমন্বিত কাঠামো।

সংলাপে নগরায়ণ, আঞ্চলিক ও গ্রামীণ উন্নয়ন এবং জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে আছে গণপরিবহনের উন্নয়ন, মিশ্র ভূমি ব্যবহার, ব্লু-গ্রিন অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং প্যাসিভ ডিজাইন ও গ্রিন বিল্ডিং বাধ্যতামূলক করা। যাতে যাতায়াতের চাহিদা ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমে আসে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও গ্রামীণ পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকৃত সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা, কৃষিতে সোলার সেচ ও জ্বালানি রূপান্তর, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এনার্জি-এফিশিয়েন্ট প্রযুক্তি, রেলভিত্তিক পরিবহন ও কোল্ড চেইন সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে জ্বালানি প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সংলাপে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাম্মী আক্তার, আইপিডির রিসার্চ ফেলো আসিফ ইকবাল, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের (ডব্লিউবিবি) নির্বাহী পরিচালক গাউস পিয়ারী প্রমুখ।