বড়ইছড়িতে সলিম আলীর সেই চড়ুইয়ের দেখা
২৪ এপ্রিল ২০২৬। ভোর থেকে কাপ্তাই ও রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে পাখির খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পক্ষী আলোকচিত্রী আহসান উদ্দিন চৌধুরীসহ চট্টগ্রাম বার্ড ক্লাবের পাঁচ সদস্য। পাখি খুঁজতে খুঁজতে একসময় তাঁরা বড়ইছড়িতে এসে নামলেন। হঠাৎই একটি গাছের উঁচু ডালে ছোট্ট একটি পাখিকে নামতে দেখে ক্লিক করলেন। এরপর জুম করেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন! এই পাখি তো এ দেশের পক্ষিতালিকায় নেই। পরের দিন সকালে ফেসবুক পোস্টে পাখিটি দেখে সঙ্গে সঙ্গে আহসানকে ফোন করে নিশ্চিত হলাম। মনে পড়ে গেল ছয় বছর আগে রাজস্থানে দেখা হলুদ-গলার চড়ুইটির কথা।
২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পাখি ও বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণের জন্য ছয়জনের টিমে রাজস্থান গেলাম। পরদিন সকালে জয়পুর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরের আলওয়ার জেলার সারিস্কা টাইগার রিজার্ভের উদ্দেশে রওনা হলাম। ৮৮১ বর্গকিলোমিটারের বিশাল বনটিতে পৌঁছালাম বেলা দেড়টায়। কাঁটাওয়ালা শুষ্ক জঙ্গল, শুষ্ক পর্ণমোচী, তৃণভূমি ও পাথুরে পাহাড়ের সমন্বয়ে গঠিত বনটি একসময় আলওয়ার রাজ্যের শিকারের ক্ষেত্র ছিল, যা ১৯৫৮ সালে সংরক্ষিত বনে রূপান্তরিত হয়।
বেলা দুইটায় অভিযান শুরু হলো। বনের বিভিন্ন ট্র্যাকে দুই ঘণ্টা ঘুরে সাত প্রজাতির বন্য প্রাণী ও ২২ প্রজাতির পাখি দেখলাম। বিকেল ৪টা ২২ মিনিটে বনের মাঝামাঝি স্থানে বাবুই আকারের একটি পাখি দেখে চলন্ত জিপ থেকে ক্লিক করলাম। ছবিটি জুম করে গলায় হলুদ দাগ দেখেই পাখিটিকে চিনে ফেললাম। পাখিটি তখনো জিপের কাছাকাছি ছিল। কাজেই ওর আরও কিছু ছবি তুললাম। এই সেই চড়ুই যাকে মারার কারণেই উপমহাদেশ পেয়েছিল জগদ্বিখ্যাত পক্ষিবিদ ড. সলিম ময়জুদ্দিন আব্দুল আলীকে। আজ আহসানরা সলিম আলীর সেই চড়ুইটিকে এ দেশের পক্ষিতালিকার ৭৩৩/৭৩৪ নম্বরে স্থান দিতে পারায় মনটা আনন্দে ভরে উঠল। এর ইংরেজি নাম ইয়েলো-থ্রটেড স্পেরো বা চেস্টনাট-শোল্ডারড পেট্রোনিয়া। গোত্র প্যাসারিডি, বৈজ্ঞানিক নাম Gymnoris xanthocollis। তুরস্ক থেকে ইরান হয়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ পর্যন্ত এরা বিস্তৃত। এটি নিয়ে দেশের চড়ুই প্রজাতি চারটিতে উন্নীত হলো। দেশের তৃতীয় প্রজাতিটি অর্থাৎ দারুচিনি চড়ুই (রাসেট স্পেরো) ২০১৭ সালে পঞ্চগড় থেকে লেখক প্রথম রেকর্ড করেছিলেন।
সলিম আলীর বয়স যখন ১০ বছর, তখন মামা আমিরুদ্দিনের কাছ থেকে একটি এয়ারগান উপহার পান, যা দিয়ে একদিন একটি চড়ুই শিকার করেন। কিন্তু মৃত চড়ুইটি হাতে নিয়ে দেখলেন যে সেটি কোনো সাধারণ চড়ুই নয়। ওর গলায় রয়েছে একটি হলুদ দাগ। তিনি মামাকে মৃত চড়ুইটি দেখালেন। বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সদস্য আমিরুদ্দিন সলিম আলীকে সোসাইটির সচিব ডব্লিউ এস মিলার্ডের কাছে নিয়ে গেলেন। মিলার্ড পাখিটিকে হলুদ-গলা চড়ুই বলে শনাক্ত করলেন ও তাঁকে সোসাইটির জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রচুর পাখির মমি দেখালেন। এতে শিশু সলিম আলীর মনে পাখির প্রতি আগ্রহ জন্মাল। পাখি সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি তাঁকে বেশ কটি বইও ধার দিলেন। সেই থেকেই সলিম আলী সোসাইটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। আর এভাবেই একসময় হয়ে উঠলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত পক্ষিবিদ বার্ডম্যান সলিম আলী।
সলিম আলী তাঁর আত্মজীবনী দ্য ফল অব আ স্প্যারোতে, হলুদ-গলা চড়ুই শিকারের ঘটনাটিকে জীবনের মোড় ঘোরানোর সন্ধিক্ষণ বলে উল্লেখ করেছেন, যা তাঁকে পক্ষিবিদ্যায় অনুরাগী করে তোলে। সে সময় উপমহাদেশের পাখি নিয়ে ব্রিটিশরাই মাথা ঘামাতেন। সলিম আলীই প্রথম ভারতীয়, যিনি ভারতে পদ্ধতিগত পাখি জরিপ করেন। তাঁর মতো ভারতীয়ের জন্য সে সময় এটা মোটেও সহজ ছিল না। ক্ষণজন্মা সলিম আলীই উপমহাদেশের পক্ষিবিদ্যায় ব্রিটিশদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করেন। তিনি বেশ কিছু নামকরা ব্রিটিশ পক্ষিবিদের পর্যবেক্ষণ ও লেখায় ভুল ধরিয়ে দেন।
ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর যখন ১০০ বছরের পুরোনো বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তিনিই জওহরলাল নেহরুর কাছ থেকে অনুদান এনে সোসাইটিকে রক্ষা করেন। তিনি রাজস্থানের ভরতপুর পক্ষী অভয়ারণ্য ও রঙ্গনাথিট্টু পক্ষী অভয়ারণ্য তৈরি এবং সাইলেন্ট ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক রক্ষা করেন।
উপমহাদেশে পেশাদার ও অপেশাদারভিত্তিক পাখি পর্যবেক্ষণ ও পক্ষিবিদ্যা অধ্যয়নকে জনপ্রিয় করতে তাঁর মতো অবদান আর কারও নেই। তিনি অসংখ্য জার্নাল নিবন্ধ, জনপ্রিয় ও শিক্ষণীয় বই এবং ফিল্ডগাইড লিখেছেন। তাঁর লেখা বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস এখনো উদীয়মান পক্ষিবিদদের পাথেয়। ভারতের মতো বাংলাদেশেও তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সে কারণেই পাখি পর্যবেক্ষণে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অনেকেই এ দেশের সলিম আলী বলে অভিহিত করেন। এত খ্যাতিমান ও কীর্তিমান হওয়া সত্ত্বেও পাখির প্রতি অনুরাগ ও কৌতূহল ১০ বছর বয়সে যেমন ছিল, বৃদ্ধ বয়সেও তার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়