রক্তলাল রক্তন ফুল
কোনো কিছু প্রথম দেখার মধ্যে থাকে উত্তেজনা, উচ্ছ্বাস, বিস্ময়, আনন্দ ও কৌতূহল। রক্তন ফুলটি প্রথম দেখে আমার তেমনটিই অনুভব হলো। এত ছোট্ট ফুল; অথচ তার এত বড় ফল! আর বিশাল আকারের গাছটির বড় বড় পাতার মধ্যে নিজেদের আড়াল করে ফুলগুলো ফুটে চলেছে, গাছের তলায় ঝরে পড়ছে ফুলগুলো।
এ বছরের ৬ চৈত্র বসন্তের সকালে আমরা আটজন প্রকৃতিবন্ধু মিলে গিয়েছিলাম মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গাছপালা দেখতে। সুদৃশ্য জালিয়াডাঙ্গা লেক পাশ কাটিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম জঙ্গলের মধ্যে। পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে একটি গাছের কাছে দাঁড় করালেন বন্ধু জিয়া উল আলম চৌধুরী। বললেন, এটিই সেই রক্তনগাছ। আগেই তিনি জানিয়েছিলেন, বোটানিক্যালে রক্তন, কইনার আর মোগলমণি ফুল ফুটেছে। দেখতে হলে চলে আসুন। রং বদলানো কইনার ফুল আগেও দেখেছি,Ñফুল–ফল সবই; কিন্তু রক্তন ফুল কখনো দেখা হয়নি। তাই রক্তনের আকর্ষণেই বলতে গেলে সেখানে যাওয়া। তলায় কুড়িয়ে পেলাম রক্তন ফুল, চোখ তুলে ওপরে তাকালাম। মোটা থামের মতো খসখসে গুঁড়ি, বেশ লম্বা হয়ে খানিকটা ওপরে উঠে গেছে ধূসর বাদামিরঙা সেই কাণ্ড, এরপর ডালপালা ও পাতা। পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে খুঁজতে লাগলাম ফুল। বেশ ওপরে শাখায়িত পুষ্পমঞ্জরিতে দেখা মিলল ফুলের; কিন্তু অতটা ওপরে দেখা ফুলের সম্পূর্ণ চেহারা দেখার উপায় নেই, তাই নিচে কুড়িয়ে পাওয়া ফুলগুলো দেখে তার রূপের সবটুকু দেখার চেষ্টা করলাম।
ফুলগুলো দুই রকমের কেন? জিয়া ভাই বললেন, একটি সাজু ফুল; অন্যটি বাসি। সাজু বা সদ্য ফোটা ফুল বাসি হলে অমন গাঢ় রক্তলাল হয়ে যায়। ফুলগুলো বেশ চমৎকার। অনেকটা মেয়েদের নকশাদার কানপাশার মতো। ফুলের সেই আলংকারিক রূপ সদ্য ফোটা ফুলে একরকম, বাসি ফুলে আরেক রকম। সদ্য ফোটা ফুলের পাপড়ি পাঁচটি হলদে সাদা, কুঞ্চিত, মাঝখানে ছোট্ট রক্তিম চাকতিসদৃশ একটি পঞ্চবাহুবিশিষ্ট কাঠামোর কেন্দ্রস্থলে খুদে গম্বুজের মতো রয়েছে গর্ভাশয় ও স্ত্রীকেশর। সেটিকে ঘিরে পাহারা দিচ্ছে গমের দানার মতো হালকা গোলাপি রঙের পাঁচটি পরাগধানী, পুরুষ কেশরের পরাগদণ্ডটি আবার হলদে সবুজ, পরাগধানীর গোড়াটি যেখানে চাকতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, সে জায়গাটি আবার সবুজাভ। বোঁটা সবুজ, বোঁটার পাশেই খাটো বোঁটার মাথায় রয়েছে ছোট্ট ডিমের মতো সবুজ কুঁড়ি। সব মিলিয়ে শিল্প, সৌন্দর্য, নকশা ও বর্ণের এক অপূর্ব কম্পোজিশন। প্রকৃতির এ রূপ কোন শিল্পী এঁকেছেন! বিস্ময়ে মাথা নত হয়ে আসে। বিস্ময়ের ঘোর কাটে না যখন দেখি, পাপড়িগুলো খসে পড়ার পর সে ফুলটির চেহারা হয়ে গেছে মেরুন লাল; বৃতি, কেশর ও কেশরস্তম্ভ সবই লাল। তখন ফুলটি যেন শুকিয়ে আসা রক্তের কণা, অন্য কোনো রং নেই। এ কারণেই হয়তো এ গাছের বাংলা নাম রাখা হয়েছে রক্তন, অন্য নাম ‘সুতরঙ্গা’। বইপত্রে এর ইংরেজি নাম পেলাম ‘Frilly Crest-Petal’, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Lophopetalum wightianum ও গোত্র Celastraceae.
রক্তন একটি বৃহদাকার বৃক্ষ। গাছ ৬০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, কাণ্ডের বেড় হয় ১৯৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। বয়স বাড়লে কখনো কখনো গাছের গোড়ায় কৃষ্ণচূড়াগাছের মতো অধিমূল দেখা যায়। গাছের বাকল পুরু, ধূসর বাদামি ও ফাটা ফাটা দাগযুক্ত। পাতা সরল, সাধারণত বিপরীতমুখীভাবে থাকে, আবার কখনো একান্তরক্রমিকভাবে থাকতেও দেখা যায়। পাতার বোঁটা এক থেকে আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা ও গোলাকার, পাতা প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, চওড়া হয় ৪ থেকে ১০ সেন্টিমিটার, পত্রফলক উপবৃত্তাকার-লম্বাটে, সূক্ষ্মাগ্র থেকে দীর্ঘ সূচ্যগ্র, পত্রফলকের গোড়া গোলাকার, কিনারা খাঁজহীন ও মসৃণ, পাতা কাগজ বা কিছুটা চামড়ার মতো। ৬ থেকে ১৩ জোড়া গৌণ শিরা মধ্যশিরার দুই পাশে থাকে। ফুল আকর্ষণীয়, পুষ্পমঞ্জরি ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুলের পাপড়িগুলো হলুদাভ, চাকতি উজ্জ্বল লাল, প্রতিটি পাপড়িতে একটি চূড়া থাকে। এ জন্যই এর ইংরেজি নামকরণ করা হয়েছে ‘ফ্রিলি ক্রেস্ট পেটাল’।
ফুলের এরূপ সৌন্দর্য দেখে এক আচ্ছন্নতার মধ্যে ডুবে ছিলাম। হঠাৎ ক্যাপ্টেন কাওসার মোস্তফা একটি ফল কুড়িয়ে নিয়ে এলেন। জানতে চাইলেন, ওটাই রক্তনের ফল কি না। আমিও তো কখনো দেখিনি। ভাবলাম, ফুল এত ছোট, তার ফল এত বড় হবে কি? পরে নিশ্চিত হলাম। ফলটা শক্ত, অনেকটা কামরাঙার মতো দেখতে; কিন্তু কামরাঙার চেয়ে বেশি লম্বা ও চিকন, ত্রিকোণযুক্ত। ফল ভাঙলে ভেতরে সাদা কাগজের মতো ডানাবিশিষ্ট বীজ থাকে। রক্তনগাছ নিচু জায়গার আর্দ্র চিরসবুজ বনের কাঠের গাছ। প্রায়ই এ গাছ জলাভূমি ও স্রোতোধারার পাশে দেখা যায়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও ইন্দোচীনে এ গাছ আছে। আইইউসিএন ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রজাতির গাছ বাংলাদেশে বর্তমানে সংকটাপন্ন উদ্ভিদ।
মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক