ফেব্রুয়ারি-মার্চে পদ্মা ব্যারাজের কার্যক্রম শুরু করবে সরকার: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে ‘কল্লোলিনী-২০২৬’ শীর্ষক এই জাতীয় সংলাপের আয়োজন করেছে টিম ইউরোপ ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি। রাজধানীর গুলশানে আলোকি কনভেনশন সেন্টারে, ২২ সেপ্টেম্বরছবি: প্রথম আলো

পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রাণ ফেরাতে আগামী বছরের শুরুর দিকে পদ্মা ব্যারাজের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে নদী নিয়ে আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে এ কথা বলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।

বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর গুলশানে আলোকি কনভেনশন সেন্টারে ‘কল্লোলিনী-২০২৬’ শীর্ষক এই জাতীয় সংলাপের আয়োজন করেছে টিম ইউরোপ ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি।

টিম ইউরোপের মধ্যে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য ডেভেলপমেন্ট (এএফডি), নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, জার্মান সংস্থা জিআইজেড এবং বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাস। জাতীয় সংলাপে দিনব্যাপী মোট ছয়টি সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

তৃতীয় সেশনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটা সময় উত্তরাঞ্চলে পানির স্তর ছিল ২৫ থেকে ৩০ ফুটের মধ্যে। সে উত্তরাঞ্চল শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখন ২০০ ফুট খনন করেও পানি পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে এমন অনেক জেলা, যেমন রাজশাহী, নওঁগা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার ভয়াবহ চিত্র।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে একসময় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি নদী ছিল। সেখানে ৬০০ থেকে ৭০০ নদী আজকে মরে গেছে।

ভাটির দেশ বলে বাংলাদেশ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে জানিয়ে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, নদীগুলোকে সরকার রক্ষা করতে চায়। সে জন্য সরকার গঠনের ৩ মাসের মাথায় দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে থাকা পদ্মা ব্যারাজের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে পদ্মা ব্যারাজের কর্মকাণ্ড শুরু হবে।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, চীনের যেমন দুঃখ হোয়াংহো, তেমনি রংপুর অঞ্চলের মানুষের দুঃখ তিস্তা নদী। পাশের দেশ থেকে গেট খুলে দেওয়া হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছে। প্রয়োজনের সময় আবার গেট বন্ধ করে দিয়ে মরুভূমি করে দিচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার মো. শিবলী সাদিক বলেন, ‘নদীর পাড়গুলোতে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। কিন্তু আমাদের যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনা, সেখানে এই মানুষগুলোর সংকটগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। সেদিকে আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত।’
এ সেশনে কীভাবে রাজধানীর রামচন্দ্রপুর খাল উদ্ধার করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো হয়েছে, সে ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা ফুটস্টেপের সভাপতি শাহ রেফায়েত চৌধুরী। সেশনটি পরিচালনা করেন ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের কান্ট্রি ফোকাল পয়েন্ট শ্রেয়া চক্রবর্তী।

আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশের নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স দিপেক এলমার। তিনি বলেন, প্রতিটি কমিউনিটিকে বুঝতে হবে, নদী তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে নীতিমালা, আইন আছে। নদী রক্ষায় সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

গঙ্গা চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করতে চায় সরকার

জাতীয় সংলাপের প্রথম অধিবেশনের প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থ রক্ষা করে আমরা গঙ্গা চুক্তি করতে চাই। ১৯৭৭ সালে এ চুক্তিতে সর্বপ্রথম ৫ বছর মেয়াদি করা হয়। তখন একটা গ্যারান্টি ক্লজ ছিল।’

সেটি ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে বাদ দেওয়া হয় জানিয়ে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে ৩০ বছরের জন্য আরেকটি চুক্তি হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না। তারপরও আমরা অব্যাহত রেখেছিলাম সে চুক্তি। এ বছরের ১২ ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ হচ্ছে চুক্তির। গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমাদের জোরালো প্রস্তাব আছে। আশা করছি, আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে চুক্তিটি সম্পন্ন হবে।’

সরকারের খাল খনন কর্মসূচি প্রসঙ্গে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, সরকার দেশের দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া নদ-নদী ও খালগুলোতে পানির প্রবাহ ফেরাতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ কর্মসূচি সফল হলে কৃষি, মৎস্য ও পানিনিষ্কাশনে ভূমিকা রাখবে।

জাতীয় সংলাপে উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, নদীনির্ভর জনগোষ্ঠী ও তরুণদের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। সকাল ৯টার দিকে জাতীয় সংলাপের উদ্বোধন হয়।

প্রথম সেশনে এএফডির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সিনথিয়া মেলা বলেন, ‘নদীর হয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। কারণ, নদী নিজে কথা বলতে পারে না। তিনি একটি নদীর আত্মকাহিনী তুলে ধরেন।’

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মিনিস্টার কাউন্সিলর ও উন্নয়ন সহযোগিতা প্রধান মিশেল ক্রেইজা বলেন, জলবায়ু সহনশীলতার জন্য সুস্থ নদীর প্রয়োজন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, নদী শুধু জলপথ নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইউরিস ভ্যান বমেল নদী রক্ষা বৈশ্বিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, নদী রক্ষা কেবল কোনো একক দেশ বা সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।

পানিসম্পদ–বিশেষজ্ঞ মালিক ফিদা এ খান ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর নানামাত্রিক দূষণ ও দখলের বিষয়টি একটি উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরেন।