প্রাক্–বাজেট সংবাদ সম্মেলন: ওয়াশ খাতে ৩ বছরে ৪০ ভাগ বরাদ্দ কমেছে, সংকটে গ্রামের মানুষ
বাংলাদেশে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে সরকারি অর্থায়ন দিন দিন কমছে। গত ৩ বছরে এ বরাদ্দ ৪০ ভাগ কমেছে। এতে ভুক্তভোগী হচ্ছেন গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ। ধারাবাহিক এ কম বরাদ্দ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস। এটি মূলত ওয়াশ খাতে কাজ করা এনজিওদের জোট।
আজ বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ জোটের প্রতিনিধিরা এই খাতের সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। আগামী অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে কিছু প্রস্তাবও দেওয়া হয় আজকের সংবাদ সম্মেলনে। এটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে।
সংবাদ সম্মেলনে ওয়াটারএইড ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) যৌথ উদ্যোগে তৈরি বাজেট বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ওয়াশ খাতের বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমেছে। এর ফলে বিগত কয়েক দশকের কষ্টার্জিত অগ্রগতিকে ধূলিসাৎ করার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৬ অর্জনে বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পিপিআরসির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৭২৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। তবে এর পর থেকেই এই খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে তীব্র ও ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৯৮১ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ১১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা হয় এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর চক্রে তা সর্বনিম্ন ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। মাত্র ৩ বছরে এই বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, যা দেশের ক্রমবর্ধমান জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার অবকাঠামো ও পানিব্যবস্থার মতো মৌলিক খাতে বরাদ্দ সংকোচনের এক চরম বৈপরীত্যকে প্রকাশ করে।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান ফাইয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রাথমিক বহুগুচ্ছ নির্দেশক নমুনা জরিপের সূত্র ধরে (মিকস) অনুযায়ী, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করলেও প্রকৃত অর্থে ‘নিরাপদ ব্যবস্থাপনার’ আওতাধীন সুপেয় পানি পাচ্ছে দেশজুড়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ মানুষ। নিরাপদ ব্যবস্থাপনা বলতে যে পানি বাড়ির আঙিনায়, প্রয়োজন অনুযায়ী এবং রাসায়নিক ও অণুজীব দূষণমুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। গ্রামীণ এলাকার টিউবওয়েলে আর্সেনিক ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ এবং কাঠামোগত অর্থায়নের বৈষম্যের কারণে শহরের সুপেয় পানির সুবিধা (৭১ শতাংশ) ও গ্রামের সুবিধার (৪৮ শতাংশ) মধ্যে ২৩ শতাংশের এক বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে।
শহরকেন্দ্রিক বৈষম্য
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মোট ওয়াশ উন্নয়ন বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই বরাদ্দ দেওয়া হয় শহর অঞ্চল, পৌরসভা এবং পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষকে (ওয়াসা)। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো মোট শহরের বরাদ্দের ৪২ দশমিক ৬ শতাংশই (৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ লাখ টাকা) পাচ্ছে পুরোনো শহরগুলোর মাত্র ৪টি ওয়াসা। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ওয়াসাই পুরো দেশের মোট ওয়াশ বরাদ্দের প্রায় ২৯ শতাংশ (৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকার বেশি) একাই পেয়েছে।
আন্তনগর বৈষম্য
সিটি করপোরেশনগুলোর ভেতরের বাজেট বণ্টনও অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। সিটি করপোরেশনের তহবিলের ৬২ শতাংশের বেশি টাকা পেয়েছে মাত্র ২টি প্রতিষ্ঠান—ঢাকা উত্তর (৩৫ শতাংশ) ও গাজীপুর (২৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ)। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজশাহী, রংপুর, কুমিল্লা, সিলেট ও ঢাকা দক্ষিণের মতো পাঁচটি প্রধান শহর কোনো বরাদ্দই পায়নি।
দুর্গম অঞ্চলের চরম অবহেলা
চর, হাওর, উপকূলীয় অঞ্চল ও পাহাড়ি জেলার মতো দেশের প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো জাতীয় ওয়াশ এডিপি তহবিলের মাত্র ১০ দশমিক ২২ শতাংশ পায়। ফলে জাতীয় পর্যায়ে খোলা স্থানে মলত্যাগের হার ২ শতাংশ হলেও এই প্রান্তিক এলাকাগুলোতে তা এখনো ২ থেকে ৩ শতাংশে রয়ে গেছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট
মানববর্জ্যের নিরাপদ অপসারণের হার শহর অঞ্চলে মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, আর গ্রামীণ বাংলাদেশে তা একেবারেই শূন্য (০ শতাংশ)। কারণ, এই মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা এফএসএম খাতে অর্থায়নকে চরমভাবে অবহেলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আইডব্লিউএর মোহাম্মদ জোবায়ের হাসান বলেন, বর্তমানের এই ব্যয় কাঠামো জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাকে (ন্যাপ ২০২৩-২০৫০) সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপর্যুপরি বন্যার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ল্যাট্রিনগুলো উপচে পড়ে পানির উৎস দূষিত হচ্ছে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে হাজার হাজার সাবমারসিবল পাম্পের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অতিরিক্ত সেচকাজ এবং ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জের উদ্যোগ না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।
এই সামগ্রিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে আজকের সংবাদ সম্মেলনে ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস’ আগামী বাজেটের জন্য জরুরি বিনিয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করেছে। সেগুলোর মধ্যে আছে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রবণতা বন্ধ করা, আঞ্চলিক সমতা অনুযায়ী পুনর্বণ্টন। সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি ওয়াশ ভাতা চালুরও প্রস্তাব আসে। জাতীয় ফ্যামিলি কার্ড বা হেলথ কার্ডের মাধ্যমে অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা সরাসরি ওয়াশ ভাতা দেওয়ার এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই সরাসরি আর্থিক সহায়তা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে (বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে) বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য পানির ট্যাংক কিনতে, মৌলিক হাইজিন বজায় রাখতে এবং পানিবাহিত রোগ, যেমন ডায়রিয়া ও ডেঙ্গুর চিকিৎসার পেছনে পকেট থেকে হওয়া অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ কমাতে সাহায্য করবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এফএসএম নেটওয়ার্কের ইশরাত শবনম, বিডব্লিউডব্লিউএর মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সিইউপির রেবেকা সান ইয়াত, বাউইনের মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ফানসার জোসেফ হালদার ও ইডব্লিউপির মো. ফজলুল হক।