কৃষ্ণ যুবরাজ-যুবরাজ্ঞীর গল্প

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড়ছড়ায় কৃষ্ণ যুবরাজ্ঞী প্রজাপতিছবি: লেখক

বিরল দুটি ঝরনার পাখি (ঝরনাগির্দি) দেখার আশা নিয়ে ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর রাতে মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড-ইকোপার্কের উদ্দেশে রওনা হলাম। ভোরে বড়লেখায় পৌঁছে নাশতা সেরে মাধবকুণ্ডের দিকে অটোরিকশা ছোটালাম। ইকোপার্কে পৌঁছেই দ্রুত ঝরনার দিকে গেলাম। তবে পাখি দুটিকে খুঁজে পেতে মাত্র আধা ঘণ্টা লাগল—একটিকে ঝরনার পাশে, অন্যটিকে পাশের ছড়ায়।

এত সহজে ওদের পেয়ে যাব ভাবতেই পারিনি। তাই বাকি সময়টা ইকোপার্কের আনাচকানাচে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি-প্রাণী খোঁজার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দুটি বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণী ও একটি নতুন পাখির সন্ধান পেলাম। কিছুক্ষণ পরে রোদ উঠতেই পার্কময় নানা প্রজাতির বর্ণিল প্রজাপতি উড়ে বেড়াতে লাগল। দুপুরের মধ্যেই ১০ প্রজাতির নতুন প্রজাপতির ছবি তুলে ফেললাম।

বেলা পৌনে দুইটার সময় ঝরনার পাশে পাথুরে মাটিতে ডানাভাঙা মলিন বাদামি এক প্রজাপতিকে বসে থাকতে দেখলাম। প্রজাপতিটিকে আগে দেখেছি বলে মনে হলো না। ঠিক ১৫ মিনিট পর মাত্র ৩ সেকেন্ডের জন্য একই ধরনের কিন্তু তরতাজা, উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত আরেকটি প্রজাপতিকে সিঁড়ির পাশে মাটিতে বসে থাকতে দেখা গেল। তাৎক্ষণিকভাবে প্রজাপতিটিকে চিনতে না পারলেও বাসায় ফিরে বইপুস্তক ঘেঁটে শনাক্ত করতে পারলাম। এটি ছিল একটি স্ত্রী প্রজাপতি। মনে পড়ে গেল এই প্রজাতির পুরুষ প্রজাপতিটিকে প্রথম দেখার ঘটনা।

এক যুগ আগের কথা। বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে রাঙামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। এই ছড়ার বড় সমস্যা হলো বুনো হাতির পাল। অবশ্য বনজীবী কিছু মানুষ আমাদের আশ্বস্ত করলেন যে হাতির পাল এখন এখানে নেই। কাজেই নির্বিঘ্নে ও শঙ্কামুক্তভাবে কাজ করতে পারলাম। তিন ঘণ্টায় ১৭ প্রজাতির পাখি ও কিছু প্রজাপতির ছবি তুললাম। হাঁটতে হাঁটতে সর্পিল ছড়াটির প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে গেলাম। সূর্য যখন মাথার ঠিক ওপর, তখন ছড়ার এক বাঁকে মখমলে কালো একটি প্রজাপতিকে দুই ডানা মেলে ভেজা মাটিতে বসে থাকতে দেখা গেল। এ রকম প্রজাপতি এর আগে একটিও দেখিনি। উড়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করে গেলাম।

মাধবকুণ্ড ঝরনার পাশে কৃষ্ণ যুবরাজ প্রজাপতি
ছবি: লেখক

কাপ্তাইয়ের মখমলে কালো প্রজাপতিটি ছিল পুরুষ। সম্ভবত আমিই এ দেশে প্রথম পুরুষটির ছবি তুলি। এর কিছুদিন আগে বিলাইছড়িতে কেউ একজন স্ত্রী প্রজাপতিটির ছবি তুলেছিলেন। যাহোক, এরপর যতবার কাপ্তাই গিয়েছি, ততবারই ওর খোঁজ করেছি। বেশির ভাগ সময়ই দেখা পেয়েছি। দুই বছর আগে মাধবকুণ্ড ঝরনার পাশেই একটি পুরুষের দেখা পেয়েছিলাম। তবে স্ত্রীটির দেখা পেতে প্রায় এক যুগ সময় লাগল।

কাপ্তাই ও মাধবকুণ্ডে দেখা মখমলে কালো পুরুষ ও বাদামি স্ত্রী প্রজাপতি দুটি এ দেশের বিরল ও বিপন্ন প্রজাপতি ব্ল্যাক প্রিন্স। ওর কোনো বাংলা নাম নেই। তবে ইংরেজি নামের অনুবাদে এদের কৃষ্ণ যুবরাজ ও যুবরাজ্ঞী বলা যায়। চারপেয়ে বা নিম্ফালিডি গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Rohana parisatis। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন দেশে এদের দেখা মেলে।

মাঝারি আকারের প্রজাপতিটির ডানার বিস্তার ৪৫ থেকে ৫০ মিলিমিটার। স্ত্রী-পুরুষের দেহ ও ডানার রঙে বেশ পার্থক্য। প্রথম দেখায় পাশাপাশি থাকলেও মনে হবে যেন দুটি আলাদা প্রজাতি। বর্ণ ছাড়াও আকারে স্ত্রী বড়। পুরুষের দেহ ও ডানার ওপরটা গাঢ় মখমলে কালো, ডানার শীর্ষের কিছু সাদা ফুটকি ছাড়া বাকি অংশে দাগছোপ নেই। ভূমিকোণ বরাবর পেছনের ডানার ওপরের পাড় মরচে-বাদামি। পুরুষের বর্ণ কালো ও গাঢ় বাদামির মধ্যে পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে স্ত্রী হলদে বাদামি, মাঝ-আঁচলে ফ্যাকাশে ফিতে রয়েছে, ডানার ওপরের অংশে যা অনিয়মিতভাবে থাকে।

কৃষ্ণ যুবরাজ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের জলপ্রবাহ বা ছড়া বরাবর, যেখানে শূককীটের পোষক গাছ দেখা যায়, সেখানে বাস করে। দ্রুতগতিতে দৃঢ়ভাবে ওড়ে। ফল খেতে পছন্দ করে। পুরুষগুলোকে ভেজা মাটির রস চুষতে দেখা যায়। স্ত্রীকে খোঁজার জন্য বনের উন্মুক্ত এলাকার বৃক্ষপত্রে পুরুষ প্রজাপতি ঘোরাঘুরি করে।

স্ত্রী বন-জিগা বা গোবর-জিগা, স্টিংউড প্রভৃতি গাছের পাতার নিচে এককভাবে বা গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে। গোলাকার ডিমগুলো ফ্যাকাশে হলুদ। কালো মাথা, বিভক্ত লেজসহ শূককীটের দেহ ফ্যাকাশে হলুদ। তবে মূককীট সবুজ হয়। জীবনচক্র ২৮ থেকে ৩৪ দিনে সম্পন্ন হয়।