কুরচি ফুলের কিস্‌সা

রাজধানী ঢাকার রমনা পার্কে ফুটেছে কুরচি ফুলছবি: লেখক

বৈশাখের শুরুতেই গ্রামে, শহরে, পাহাড়ে ফুটতে শুরু করেছে কুরচি ফুল। আমাদের চেরি ফুল নেই, কিন্তু কুরচি চেরির চেয়ে কম রূপসী নয়। চেরি ফুলের জমজমাট রূপ আছে ঠিকই, কিন্তু কুরচির মতো সুরভিত কি?

বান্দরবান সদরের বাঙালিপাড়ার পাশে পাহাড়চূড়ায় উঠতে গিয়ে সে পাহাড়ের ঢালে বছর তিনেক আগে এক গ্রীষ্মে ওপর থেকে নিচে ঢালে ঢালে যে পুষ্প¯রাতে নামতে দেখেছিলাম, তা ছিল অসাধারণ। সাদা রঙের থোকাধরা সুগন্ধি ফুল বসন্তে গজানো নবপত্রপল্লবে যেন বিছিয়ে দিয়েছে পুষ্পশয্যা।

গিরি মানে পাহাড়—সে জন্যই মনে হয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর নতুন চাঁদ কাব্যের ‘অশ্রু–পুষ্পাঞ্জলি’ কবিতায় এ ফুলের নাম দিয়েছিলেন গিরিমল্লিকা। লিখেছিলেন, ‘আনন্দ-সুন্দর তব মধুর পরশে/ অগ্নি-গিরি গিরিমল্লিকার ফুলে ফুলে/ ছেয়ে গেছে! জুড়ায়েছে সব দাহজ্বালা!’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে এই ফুল কুরচি। তিনি শিলাইদহ থেকে কলকাতা ফেরার পথে কুষ্টিয়া রেলস্টেশন ঘরের পেছনে কুরচি ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, ‘কুরচি, তোমার লাগি পদ্মেরে ভুলেছে অন্যমনা/ যে ভ্রমর, শুনি নাকি তারে কবি করেছে ভর্ৎসনা।’

মহাকবি কালিদাসের কাব্যে আবার এ ফুলের নাম কূটজ। কবি কালিদাস কূটজকে বলেছেন বর্ষার ফুল। তাঁর মেঘদূত কাব্যের ‘পূর্বমেঘ’ খণ্ডে দুটি জায়গায় কুরচি ফুলের উল্লেখ রয়েছে। যক্ষপুরী থেকে যক্ষের সংবাদ নিয়ে মেঘ যাচ্ছে তাঁর প্রিয়ার কাছে। কিন্তু কেন মেঘ সেই সংবাদ পৌঁছে দেবে তার প্রিয়ার কাছে। তাই যক্ষ মেঘকে তুষ্ট করতে সাজিয়েছে কুরচি ফুলের নৈবেদ্য। কালো মেঘের দিকে মুখ তুলে ফুটেছে সাদা কূটজ ফুল। মেঘ তো কুরচি ফুলের নৈবেদ্য তথা উপহার পেয়ে খুশি। সে তখন কুরচি ফুলের রূপ ও সৌরভের সঙ্গে যক্ষপ্রিয়ার জন্য বার্তা নিয়ে যাচ্ছে অলকাপুরীর দিকে।

মেঘ যেন যত দ্রুত সম্ভব তার প্রিয়াকে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে পারে, সে জন্য মেঘকে কবি কালিদাস সাবধান করে দিচ্ছেন, পথে আরও কত কিছু আছে মন টানার, পাহাড়ে পাহাড়ে ফুটে রয়েছে আরও কত যে কূটজ ফুল, মেঘ যেন তা দেখতে গিয়ে দেরি করে না ফেলে, ‘ত্বরা করি সখা চলে যাও আমার প্রিয়ার কারণে/ তবু সময় যাবে গিরিতে গিরিতে কূটজ ফুলের টানে’।

দৃশ্যকলার কি চমৎকার বর্ণনা। কুরচি গ্রীষ্ম-বর্ষার ফুল হলেও তাকে কালিদাস বর্ষার কদমের মতো গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁর ঋতুসংহার কাব্যে।

কুরচির আয়ুর্বেদশাস্ত্রীয় ও সংস্কৃত নাম ইন্দ্রযব বা ইন্দ্রজৌ। এ ছাড়া কুরচি, মহাগন্ধ, কোটিশ্বর, সংগ্রাহী ইত্যাদি নামেও পরিচিত। এ ফুলের ইংরেজি নাম ইস্টার ফ্লাওয়ার, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Holarrhena antidysenterica ও গোত্র অ্যাপোসাইনেসি। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ ‘অ্যান্টিডিসেন্টেরিকা’ প্রমাণ করে যে কুরচি এক মূল্যবান ঔষধি গাছ ও পেটের পীড়া–আমাশয়ে কার্যকর। এর ফুল, ফল, বাকল—সবকিছু থেকেই তৈরি হয় আমাশয় রোগের ওষুধ। কুরচির বীজ অ্যান্টিডায়াবেটিক গুণসম্পন্ন।

কুরচি এক সুদর্শন পত্রঝরা স্বভাবের বহুবর্ষজীবী দ্রুতবর্ধনশীল ছোট বৃক্ষ। এ গাছ ছয় মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। কুরচি সরল কাণ্ডবিশিষ্ট গাছ। বাকল হালকা ধূসর ও অমসৃণ। শীতের শেষে গাছের পাতা ঝরে যায় ও বসন্তে নতুন পাতা গজায়। পাতার বোঁটা খুব খাটো, ডালে বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে, ডিম্বাকার ও অগ্রভাগ সুচালো। কিনারা মসৃণ বা খাঁজবিহীন ও সবুজ। গাছের ডাল ও পাতা ছিঁড়লে সাদা দুধের মতো আঠালো কষ ঝরে।

কুরচি থোকায় কয়েকটা সাদা রঙের সুগন্ধি ফুল ফোটে এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে। ছোট গাছেও ফুল ফোটে। ফুল ফোটে কয়েক দফায়। ফুলের পাপড়ি পাঁচটি। পাপড়ির অগ্রভাগ ভোঁতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলগুলোর রং ধীরে ধীরে ফিকে হলদে হয়ে যায়। একটি ফুল থেকে দুটি ফল জন্মে।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে ফুটেছে লাল কুরচি
ছবি: লেখক

ফল লম্বা, সরু, বাদামি ও বহুবীজবিশিষ্ট। বাতাসে বীজ ছড়ায় ও চারা জন্মে। এত দিন জানতাম কুরচি ফুলের রং দুধের মতো সাদা। গত বছর গ্রীষ্মে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে উদ্ভিদ সংগ্রাহক তানভীরের ওখানে গিয়ে দেখেছিলাম লাল কুরচি ফুল। মনে হলো কুরচির এ জাতটি দেশে নতুন এসেছে। সাদা ও লাল কুরচি ফুলের গাছ যেকোনো পার্ক বা বাগানে সুদর্শন তরু হিসেবে লাগানো যায়।

বাংলাদেশের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, কুরচি এ দেশে সংরক্ষিত উদ্ভিদ। তার মানে, যেখানে এ গাছ আছে, সেখানে সে গাছকে সংরক্ষণ করতে হবে। গাছের কেউ ক্ষতি করলে তিনি আইনের দৃষ্টিতে অন্যায় করবেন। কুরচির আদিনিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলা, ভারত ও মিয়ানমার। ভারতের হিমালয় অঞ্চলে কুরচিগাছ প্রচুর আছে। ভারত থেকে বিদেশে কুরচিবীজ চূর্ণ, বাকলচূর্ণ, কূটজক্বাথ ইত্যাদি রপ্তানি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র হলো কুরচিপণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

  • মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক