মাকড়সাশিকারিদের গল্প

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দারগাছে বড় মাকড়সাভুকছবি: লেখক
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

নতুন একটি পাখির আশায় হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের টাওয়ারে অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ। এমন সময় এক পক্ষী আলোকচিত্রীর সংকেতে সামনের দিকে তাকালাম। মান্দারের কাঁটায় চোখ আটকে গেল! এ আমি কী দেখছি? টকটকে লাল মান্দার ফুলের পাশে বসে আছে আমার অতি আরাধ্য পাহাড়ের মাকড়সাশিকারি!

শিকারিটিকে কতই–না খুঁজেছি চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন পাহাড়ি বনে। অথচ আজ এভাবে আচমকা পাব ভাবতেই পারিনি! কিন্তু মান্দার ফুলের রসে জিব ভেজানোর আগেই পাখির রাজা ফিঙের তাড়া খেয়ে খুদে শিকারিটি পালিয়ে বাঁচল। পালানোর আগে মাত্র ১২ সেকেন্ড সময় দিল, তাতে ১২টি ক্লিক করতে পারলাম। ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ড পর আবারও এল। কিন্তু মাত্র ৬ সেকেন্ডের মাথায় এক সিপাহি বুলবুলির তাড়া খেয়ে আবারও পালাল। আরও ১২টি ক্লিক করলাম। তবে ছবি তুলতে পারলেও মাকড়সাশিকারির শিকার কৌশল দেখার সৌভাগ্য হলো না।

ঠিক ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর এই শিকারিরই আরেক ছোট ভাই মান্দারগাছে হাজির হলো। আরে এ যে দেখছি মেঘ না চাইতেই জল! একই দিনে একই স্থানে একই ধরনের দুই প্রজাতির পাখি! আমার কাছে ভাগ্যের ব্যাপার। মনটা আনন্দে ভরে উঠল। ২৭ বছর আগে দ্বিতীয় শিকারিটিকে প্রথমবার দেখেছিলাম বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার সাতশৈয়া গ্রামে। ও তার তলোয়ার চঞ্চুটি দিয়ে চমৎকারভাবে কলার মোচার ফুল থেকে রস পান করছিল। তবে ছবি তুলতে পারিনি। ছোট মাকড়সাশিকারিটির প্রথম ছবি তুলি মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে ২০১১ সালের ৮ এপ্রিল। এরপর প্রায় সময়ই ওকে দেখছি দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সর্বশেষ শূন্যে স্থির হয়ে কলার মোচার ফুলের রস পান করতে দেখলাম বড়লেখার মাধবকুণ্ড ইকো পার্কে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবারও বিরল মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যর্থ হলাম।

সাতছড়ির জাতীয় উদ্যানে দেখা তলোয়ার চঞ্চুর প্রথম পাখিটি এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি বড়, পাহাড়ি বা ডোরা মাকড়সাভুক। ইংরেজি নাম স্ট্রিক্ড স্পাইডার হান্টার। আর এক ঘণ্টা পর দেখা দ্বিতীয় পাখিটি হলো বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি মোচাটুনি, কলাটুনি বা ছোট মাকড়সাভুক। ইংরেজি নাম লিটল স্পাইডারহান্টার। মাকড়সাশিকারি দুটি পাখিই ফুলের রসপায়ী মৌটুসি পাখিদের গোত্র নেকটারিনিডি-এর সদস্য। বাংলাদেশ ছাড়াও ওরা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত।

আকারে ডোরা মাকড়সাশিকারি ১৭ সেন্টিমিটার এবং ওজনে ২৯ গ্রাম। অন্যদিকে ছোটটি গড়ে ১৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১৩ গ্রাম। বড়টির মাথাসহ দেহের ওপরটা গাঢ় হলদে-জলপাই ও নিচটা হলদে-সাদা। মাথা-পিঠ ও বুকে অসংখ্য মোটা কালো ডোরা। ডানা ডোরাবিহীন। খাটো লেজের আগা পীতাভ; তাতে কালো বন্ধনী। চঞ্চু কালো। চোখ বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কমলা।

অন্যদিকে ছোটটির মাথা-পিঠ জলপাই, গাল ধূসরাভ, গলা সাদা ও বুক-পেট হলুদাভ। খাটো কালচে-বাদামি লেজের আগা সাদা। পা ও চঞ্চু কালো। চোখ বাদামি। দুই প্রজাতিরই স্ত্রী-পুরুষে পার্থক্য নেই।

ছোটটি দেশব্যাপী বিস্তৃত হলেও বড়টি মূলত চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ পাহাড়ি বনের বাসিন্দা; মাঝেমধ্যে সিলেটের বনাঞ্চলেও দেখা যায়। দিবাচর পাখিগুলো সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। মাকড়সা, পোকামাকড়, কলার মধুরেণুসহ অন্যান্য ফুলের রস পান করে। ফুলের পরাগায়ণে সাহায্য করে। বেশ আকর্ষণীয়ভাবে ঢেউ খেলানোর মতো করে ওড়ে। বড়টি ধাতব কণ্ঠে ‘চিরইক্-চিরইক্-চিরইক্...’ বা ‘চিরিচিক-চিরিচিক...’ স্বরে ডাকে। অন্যদিকে ছোটটি তীক্ষ্ণœকণ্ঠে ‘চিপ’ শব্দে ডাকে অথবা ‘হুয়িচ-হুয়িচ-হুয়িচ...’ স্বরে একঘেয়েমি গান গায়।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দারগাছে ছোট মাকড়সাভুক
ছবি: লেখক

মার্চ থেকে জুলাই প্রজনন মৌসুমে বড়টি মাটির ২ থেকে ৩ মিটার উঁচুতে কলাপাতার নিচের দিকে মাকড়সার জাল, ছন, ঘাস ও পাতা দিয়ে লম্বাটে ধরনের বাসা বানায়। ছোটটিও কলাপাতার নিচের দিকে বাসা গড়ে। স্ত্রী বড় মাকড়সাশিকারি চকলেট-বাদামি বা বেগুনি সূক্ষ্ম ছিট-ছোপযুক্ত বাদামি বা জলপাই-বাদামি এবং ছোটটি বাদামি ছোপযুক্ত পাটকিলে-সাদা ডিম পাড়ে। উভয়েরই ডিম হয় দুই থেকে তিনটি। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের যত্ন করে। ডিম ফোটে ১২ থেকে ১৫ দিনে। উভয়েরই আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

  • আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ