সাদা পাকুড়ের দেখা পেলাম
এ বছরের ২৭ মে, সকালবেলায় জিয়া ভাইকে সঙ্গে নিয়ে খুলনা থেকে রওনা দিলাম বাগেরহাটের ফকিরহাটের দিকে। উদ্দেশ্য, পাখিবিদ ও লেখক শরীফ খানের বাড়িতে যাওয়া, তাঁর সঙ্গে দেখা করা। বিশ্বরোডে ফকিরহাট বাসস্ট্যান্ড থেকে একটা রাস্তা যাত্রাপুর বাজারের দিকে গেছে। সেই পাকা রাস্তা ধরেই আমরা ছুটে চললাম শরীফ ভাইয়ের দিকনির্দেশনা মতো। বেশ কিছুটা পথ যেতেই হঠাৎ একটা বিশাল গাছ চোখে পড়ল রাস্তার ধারে, সে প্রাচীন গাছের ডালে ডালে সাদা রঙের গুটি গুটি ফল ধরেছে। গাছটাকে অচেনা ঠেকল। তাই জিয়া ভাইকে গাড়ি থামাতে অনুরোধ করলাম। রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে গাছটির কাছে যেতেই দেখলাম ছোট্ট ছোট্ট ডুমুরের মতো ফল, পাতাগুলো দেখতে অনেকটা জগডুমুরের পাতার মতো। পাতা দেখে কিছুটা আন্দাজ করলাম, মনে মনে মেলালাম ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে দেখা একটি অচিন বৃক্ষের সঙ্গে। হুবহু এক পাতা। তাই তাকে শনাক্ত করলাম সাদা পাকুড় নামে।
গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে তার বয়স আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম। সে সময় দুজন গ্রামবাসী সেই আট্টাকী গ্রামের পথ থেকে বেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠছিলেন। তাঁদের কাছে জানতে চাইলাম, তাঁরা সে গাছের নাম জানেন কি না। তাঁরা একজন বললেন, বট। আরেকজন বললেন, পাইকরগাছ। তাঁদের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০। তাঁরা বললেন, ছোটবেলা থেকে তাঁরা এ গাছকে প্রায় একই রকম দেখে আসছেন। বরং গাছটি এর আগে আরও তেজি ও বড় ছিল বলে মনে হয়। এখন সে গাছের কিছু ডালপালা মরে গেছে, গাছের বাকলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোনো কাজে লাগে না এই গাছ, লাকড়িও হয় না। তাঁরা আরও জানালেন, এ গাছ এ তল্লাটে আর কোথাও চোখে পড়েনি। তাঁদের কথাগুলো শোনার পর গাছটিকে আরও ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। সত্যিই তো, সে গাছের ওপর জন্মেছে আরও অনেক পরগাছা। নানা রকমের ফার্ন ও অন্যান্য পরাশ্রয়ী। সেসব গাছের শিকড় সাদা পাকুড়গাছের বাকল ফাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। বাকল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গাছের খাদ্য চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কাহিল হয়ে যাচ্ছে গাছটা। গ্রামবাসীর অনুমান, গাছটার বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছর হতে পারে। আইইউসিএন বাংলাদেশ গাছটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলেছে। এর অর্থ এ প্রজাতির গাছ এ দেশে অধিকসংখ্যক রয়েছে। হয়তো আছে, চোখে পড়েনি। চোখে পড়েছে মাত্র দুটি গাছ।
সাদা পাকুড়ও বট পরিবারের গাছ, গোত্র মোরেসী। এ গোত্রের গাছগুলো চেনা নিয়ে সব সময়ই দ্বিধায় থাকি। কোনটা অশ্বত্থ আর কোটা পাকুড়, তারপর আবার পাকুড়ও আছে কত রকমের! এ গাছের ফল সাদা, তাই এর নাম হয়েছে সাদা পাকুড় বা সাদা ডুমুর। ইংরেজি নাম হোয়াইট ফিগ, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Ficus virens। অশ্বত্থগাছের যেমন শীতে সব পাতা ঝরে যায়, এ গাছের তেমন হয় না, সব পাতা ঝরে না। সে জন্য একে আধা পাতাঝরা গাছ বলা হয়। তবে ডুমুরের মতো এর ফলও খাওয়া যায়, কিন্তু কাউকে খেতে শুনিনি। পাখিরা খায়। বটের মতো বড় বড় কোনো ঝুরি নামতে দেখলাম না। এ গাছ জলাভূমির ধারে ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে শুকনো ডাঙা জায়গায় ৮০ ফুটের বেশি লম্বা হয় না। জায়গা পেলে পাশে ডালপালা ছড়িয়ে বেশ ছাতার মতো গড়ন তৈরি করে, ছায়া দেয়। আট্টাকী গ্রামের মোড়ের এ গাছ অবশ্য জায়গার অভাবে সেভাবে ছড়াতে পারেনি। আশপাশে অন্য গাছগাছালিতে ঠাসা।
সাদা পাকুড়গাছ কারও কারও গাছে সাদা ডুমুর ও ‘স্ট্র্যাঙ্গলার ফিগ’ নামে পরিচিত। কেননা এর ফল পাখিরা খায়। খাওয়ার পর সেসব পাখি অন্য গাছের ওপর বিষ্ঠা ত্যাগ করে। তখন বীজ অন্য গাছের ওপর বিষ্ঠার সঙ্গে আটকে থাকে ও সেখানে চারা গজায়। সেসব চারা আশ্রয়দাতা গাছের মধ্যে ঢুকে অনেকটা গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার মতো একসময় মেরে ফেলে। কিন্তু নিজে মরে না। নিজে তখন বড় হয়ে মাটির বুকে ঠিকই স্থায়ী আশ্রয় পেয়ে যায়। এ দেশের পরিবেশে বছরে দুবার এ গাছের বৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়Ñবসন্তে ও বর্ষাকালে। বসন্তে ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নতুন পাতা গজায় ও ফল ধরে। তখন গাছটিকে বেশ সুন্দর দেখায়। কখনো কখনো এ গাছ লম্বার চেয়ে চারপাশে ডালপালা বেশি দূরত্বে ছড়ায়, অথচ সেসব ডালপালার ভার সইবার জন্য বটের মতো কোনো ঠেস দেওয়ার মূল বা ঝুরি নামে না। এটি এই উপমহাদেশের দেশীয় বৃক্ষ। ফকিরহাটের আট্টাকী গ্রামের গাছটি প্রাচীন, বিপন্ন না হলেও সুলভ না। তাই গাছটিকে প্রাচীন গাছ হিসেবেও রক্ষা করা দরকার। এর ডাল কাটিং করে চারা তৈরি করা যেতে পারে।