গ্রেভিলিয়ার অদ্ভুত ফুল

গ্রেভিলিয়ার ফুল ও ফলছবি: লেখক

ফুলের থাকে পাপড়ি; কিন্তু এ বছর জানুয়ারির এক সকালে ঢাকার সাভারের বরিশাল নার্সারিতে গিয়ে এমন একটি ফুলের দেখা পেলাম, যেটি দেখে মনে হলো সেসব ফুলের কোনো পাপড়ি নেই। কেমন যেন মাকড়সার ঠ্যাংয়ের মতো পুষ্পমঞ্জরিতে গাঁথা ফুলগুলো।

নার্সারির ম্যানেজার উদ্ভিদটির নাম বললেন ‘বোতলব্রাশ’। খটকা লাগল নামটা শুনে। পুষ্পমঞ্জরি দেখতে খানিকটা বোতলব্রাশের মতো হলেও আমরা যাকে বোতলব্রাশ ফুল বলে চিনি, ওটি সে রকম নয়। ফিরে এসে বইপত্র আর অন্তর্জাল ঘাঁটতে শুরু করি। তার মিল পাই গ্রেভিলিয়া গণের ফুলগুলোর সঙ্গে; কিন্তু সে–ও তো আর এক মহাজগৎ।

গ্রেভিলিয়া গণের উদ্ভিদগুলো প্রোটিয়েসি গোত্রের অধীন, যে গোত্রে প্রায় ৮০টি গণের ২ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এ গোত্রের উদ্ভিদগুলোর ফুলে আলাদা কোনো পাপড়ি ও বৃতি থাকে না। এর পরিবর্তে এর ফুলে চারটি পাপড়ির মতো অংশের একটিমাত্র চক্র থাকে, যেগুলোকে টেপাল বলা হয়।

পৃথিবীর উদ্ভিদজগতের ভেতর থেকে সুনির্দিষ্টভাবে একটি প্রজাতির উদ্ভিদকে বিশেষভাবে চেনা ও সে সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সহজ নয়। বরিশাল নার্সারির স্বত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম জানান, স্বল্প কিছু গ্রেভিলিয়ার চারা তিনি এনেছিলেন থাইল্যান্ড থেকে। সেগুলোকে নার্সারিতে লাগিয়ে মাতৃগাছ হিসেবে বড় করা হচ্ছে। সেসব গাছে প্রায় সারা বছরই ফুল ফুটতে দেখছেন তিনি। ফুলগুলোর বিচিত্র গড়নই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল এ গাছ সংগ্রহে। একাধিক জাতের গ্রেভিলিয়া গাছ তাঁর সংগ্রহে আছে বলে জানান তিনি।

শুধু গ্রেভিলিয়া গণেই রয়েছে ৩৮০টি প্রজাতির উদ্ভিদ, যাদের সাধারণভাবে স্পাইডার ফ্লাওয়ার বলা হয়। গ্রেভিলিয়া গণের নামকরণ করা হয়েছে রয়্যাল হর্টিকালচার সোসাইটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ১৮ শতকের প্রখ্যাত উদ্ভিদবিদ চার্লস ফ্রান্সিস গ্রেভিলির নামানুসারে।

এ গণের প্রজাতিগুলোর তালিকা ও ছবি প্রকাশ করেছে উইকিপিডিয়া। সেগুলোর মধ্য থেকে ‘Grevillea acanthifolia’ প্রজাতির পুষ্পমঞ্জরির সঙ্গে সাভারে দেখা পুষ্পমঞ্জরির অনেকটা মিল খুঁজে পেলাম। এ প্রজাতিরও তিনটি উপপ্রজাতি আছে। পাতার গড়নে সেসব উপপ্রজাতির পার্থক্যগুলো দেখা যায়।

এ প্রজাতির সাধারণ বা ইংরেজি নাম ‘Acanthus-leaved grevillea’, কোনো বাংলা নাম পাওয়া যায়নি। জানা যায়, ইংরেজ উদ্ভিদবিদ অ্যালান কানিংহাম (১৭৯১-১৮৩৯) পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় উদ্ভিদ অভিযানে গিয়ে ১৮১৭ সালে এ উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছিলেন। কানিংহাম এই উদ্ভিদকে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের ব্লু মাউন্টেনস অঞ্চলের পিটযুক্ত জলাভূমিতে এবং কক্স নদীর তীরে জন্মাতে দেখেছিলেন। তিনি ১৮২৫ সালে জিওগ্রাফিক্যাল মেমোয়ার্স অন নিউ সাউথ ওয়েলস (ব্যারন ফিল্ড সম্পাদিত) গ্রন্থে এই প্রজাতির আনুষ্ঠানিক বর্ণনা প্রদান ও তা প্রকাশ করেন।

এটি একটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম প্রকৃতির উদ্ভিদ, যার পাতাগুলো শক্ত, কণ্টকিত ও চেরা বা বিভক্ত। এর ফুলগুলো দেখতে অনেকটা টুথব্রাশের মতো। রং গোলাপি থেকে বেগুনি। সেখানে দেখলাম, দুটি গাছের কাণ্ডÐসোজা হয়ে খানিকটা বেড়েছে বটে; কিন্তু তার ডালপালা এলোমেলোভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। গাছটি প্রায় সোয়া মিটারের মতো লম্বা হয়েছে। বয়স বাড়লে নিশ্চয়ই আরও লম্বা হবে। পাতার ফলকগুলো গভীরভাবে ৯ থেকে ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত। পাতা ৪ থেকে ৯ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৩ থেকে ৭ সেন্টিমিটার চওড়া। পত্রফলকের প্রতিটি খণ্ড আবার বিভক্ত হয়ে খণ্ডগুলোর আকৃতি রৈখিক, ত্রিভুজাকার বা কীলকাকার ও অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ হয়। পাতাগুলো উজ্জ্বল সবুজ, শক্ত ও কাঁটাযুক্ত।

ফুলগুলো এক পাশে বিন্যস্ত থাকে এবং দেখতে অনেকটা টুথব্রাশের মতো। পুষ্পমঞ্জরির দৈর্ঘ্য ৩ থেকে ১০ সেন্টিমিটার। ছোট সেপাল বা বৃত্যংশ ও পাপড়িগুলো হালকা সবুজ থেকে ধূসর রঙের। এগুলোর বাইরের দিক রোমশ ও ভেতরের দিক মসৃণ। ফুলের গর্ভদণ্ডটি বেশ লম্বা ও লাল রঙের, এর মাথায় একটি সবুজ রঙের পরাগ ধারণকারী অংশ থাকে। সারা বছর ফুল ফুটলেও মূলত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বেশি ফুল দেখা যায়। ফুল ঝরে যাওয়ার পর যে ফল উৎপন্ন হয়, তা একটি রোমশ ফল; যাকে বলে ফলিকল, তাতে লালচে দাগ থাকে।

এটি অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি স্থানীয় উদ্ভিদ। এটি শুধু সেখানেই জন্মায়, সাধারণত উঁচু স্থান ও ভেজা বা জলাভূমি এলাকায় পাওয়া যায়। এ দেশে গ্রেভিলিয়া গণের একটি উদ্ভিদ প্রজাতি (Grevillea robusta) বা সিলভার ওক থাকার তথ্য রয়েছে। তবে সরকারিভাবে এ উদ্ভিদ থাকার কোনো তথ্য নেই। সম্প্রতি এর দৃষ্টিনন্দন চেহারার কারণে বিভিন্ন দেশের বাগানে এটিকে শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে লাগানো হচ্ছে। এ দেশেও এর বিস্তার ঘটেছে।