শাললতার স্নিগ্ধ শোভা
শালবনে ঘুরতে ঘুরতে এই লতা কতবার যে দেখেছি, তার হিসাব নেই। ভালোভাবে চোখে পড়ল ফুল ফোটার পর। এমন অনেক লতাই শালবনের বাসিন্দা। বিভিন্ন মৌসুমে এসব লতা বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বদলে যায়। নতুন পাতা আর ফুলের প্রাচুর্যে নিজেদের সাজিয়ে নিতে পছন্দ করে। এদের কোনো কোনোটির ফুলের রং এতটাই চটকদার যে অনেক দূর থেকেই আমাদের আকৃষ্ট করে। তবে শাললতার জৌলুশ ঠিক ততটা না হলেও প্রাচুর্যের কারণে খুব সহজেই চোখে পড়ে।
শরতে কাশ-শিউলির রেশ কমতে শুরু করলে প্রকৃতি প্রায় হতশ্রী হয়ে ওঠে। তত দিনে শাপলা-পদ্মের বিলও জৌলুশ হারাতে থাকে। তখন চারপাশে দু–একটি করে শুভ্র কেওফুল ফুটতে শুরু করে। আর দূরের বনে ফোটে এই ফুল। এরা স্থানীয়ভাবে গোয়ালিয়া লতা বা পানলতা নামেও পরিচিত। শাললতা নামকরণের প্রধান কারণ, এরা মূলত শালবনের স্থায়ী বাসিন্দা। শরৎ বা হেমন্ত ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়ই জংলি লতা হিসেবে আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। তবে শরতে ফুলের দীনতা ঘোচাতে নগর উদ্যানেও এ ফুল থিতু হতে পারে। প্রায় এক দশক আগে গাজীপুরের হাতিয়াবোয় আরণ্যক লাগোয়া শালবনে ফুলটি প্রথম দেখি। তারপর অবশ্য শালবনের বিভিন্ন অংশে আরও কয়েকবার দেখেছি।
শাললতা (Spatholobus parviflorus) চিরসবুজ লতানো গাছ। কাণ্ডÐবাঁশির মতো, মূল বেশ বড় কন্দযুক্ত, ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। শাখা–প্রশাখা ধূসর, রোমশ ও গুটিযুক্ত। কাণ্ডে লেন্টিসেল আছে। তাই লাল আঠা নিঃসৃত হয়। আবার কচি ডগা কাটলেও লাল আঠা বের হয়। পুষ্পবিন্যাস ও পাতার নিম্নতল ধূসর মখমলের মতো। পত্রফলক তিনটি। পাতা ত্রিপত্রিক, ১৫ থেকে ২২ সেমি লম্বা। ফুল ক্রিমের মতো ঘিয়ে-সাদা বা গোলাপি রঙের, শূন্য দশমিক ৮ থেকে ১ দশমিক ২ সেমি লম্বা। পুংকেশর ১০টি, দ্বিগুচ্ছক, পরাগধানী সমরূপ। ফল শিমের মতো, ৭ থেকে ১২ সেমি লম্বা এবং তির্যকভাবে আয়তাকার। ফুল ও ফলের মৌসুম আশ্বিন থেকে চৈত্র।
বিভিন্ন মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে শাললতার অবস্থান উল্লেখ করার মতো। এই লতা গিঁটের ব্যথা উপশম করে রক্তসঞ্চালনে সাহায্য করে। গাছের শিকড়, পাতা ও মূল আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণ করে প্রাণশক্তি বাড়াতে পারে। তবে ব্যবহারবিধি সঠিক হওয়া জরুরি।
এ গাছের বীজ থেকে তেল হয়। সেই তেল রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। এতে ট্রাইগিøসারাইড নামে একধরনের চর্বি থাকে। এই চর্বি শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগে। পাতা ও কাণ্ড সেদ্ধ করে ভাঙা হাড়ের ব্যথানাশক হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। পাতার পেস্ট চোখের প্রদাহ চিকিৎসায় কাজে লাগে। বাকলের ক্বাথ কৃমি, অন্ত্রের সমস্যা এবং সাপের বিষক্রিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।
বাকল থেকে প্রাপ্ত তন্তু দড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। গাছ থেকে একধরনের লাল আঠা নির্গত হয়। ট্যানিনসমৃদ্ধ এই আঠা ওষুধ তৈরিতে এবং রঞ্জক হিসেবে ব্যবহার্য। এ গাছের বীজের শুঁটির ক্ষতস্থানে কাচের মতো শক্ত রজন দেখা যায়। বীজ তেল তন্ত্রমন্ত্রে লোকজ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। বাকলের নির্যাস প্রসাধনী তৈরিতে চুলের কন্ডিশনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাকলের মধ্যে রোটেনোন নামে একটি প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, যা কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। শাললতার প্রায়োগিক গুণ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
বীজ থেকে চারা হয়। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেটের বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়। গাছটি এখনো বিপন্ন হয়ে ওঠেনি।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক