হাতিরঝিলে আগ্রাসী বিদেশি কচ্ছপ এল কীভাবে, কেন বাড়ছে শঙ্কা
রাজধানীর কংক্রিটের জঙ্গলে হাতিরঝিল এখনো টিকে আছে অন্যতম বড় জলজ বাস্তুতন্ত্র হিসেবে। কিন্তু নানা ধরনের দূষণের পাশাপাশি এবার নতুন এক হুমকির মুখে পড়েছে এই জলাধার। সেখানে দেখা মিলছে বিশ্বের অন্যতম আগ্রাসী বিদেশি কচ্ছপ রেড ইয়ারড স্লাইডারের।
জীববৈচিত্র্য–বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে একসময় সাকার ফিশের মতোই এই কচ্ছপ দেশীয় জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় সংকট হয়ে উঠতে পারে।
হাতিরঝিলের বিভিন্ন স্থানে গাছের শিকড়, ভাসমান গুঁড়ি কিংবা রোদ পোহানোর উপযোগী জায়গায় এসব কচ্ছপকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর আরও কয়েকটি পুকুরেও মিলেছে এদের উপস্থিতি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শখ করে অ্যাকুয়ারিয়ামে পালন করা কচ্ছপ বড় হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই সেগুলো হাতিরঝিলসহ জলাধারে ছেড়ে দিচ্ছেন। আর সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন বিপদ।
হাতিরঝিলের বিভিন্ন স্থানে গাছের শিকড়, ভাসমান গুঁড়ি কিংবা রোদ পোহানোর উপযোগী জায়গায় বিদেশি কচ্ছপ রেড ইয়ারড স্লাইডারকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর আরও কয়েকটি পুকুরেও মিলেছে এদের উপস্থিতি।
শখের কচ্ছপ, প্রকৃতির শত্রু
৩ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে অভিযান চালিয়ে বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট ১ হাজার ১০৪টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করে। এর মধ্যে ৮৪৬টি ছিল রেড ইয়ারড স্লাইডার কচ্ছপের বাচ্চা। উদ্ধার করা হয় ৫৬টি কমন স্ন্যাপিং টার্টলও, এটিও একটি আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি।
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, চীন ও থাইল্যান্ড হয়ে বিমানবন্দর ব্যবহার করে এসব প্রজাতির কচ্ছপ অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে অ্যাকুয়ারিয়ামে বিদেশি কচ্ছপ পালনের একটি বাজার তৈরি হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর পর কচ্ছপ বড় হয়ে গেলে অনেকেই সেগুলো আর রাখতে চান না। তখন সেগুলো ছেড়ে দেওয়া হয় পুকুর, লেক কিংবা জলাধারে। আর তাতেই শুরু হয় পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, শুধু হাতিরঝিল নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি পুকুরেও এ কচ্ছপ দেখা গেছে। এগুলো সর্বভূক প্রাণী। কোনোভাবে যদি নদী-খাল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশীয় জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য তা বড় হুমকি হয়ে উঠবে।
অসীম মল্লিক আরও বলেন, মিরপুর থেকে উদ্ধার হওয়া কমন স্ন্যাপিং টার্টল আরও ভয়ংকর। রেড ইয়ারড স্লাইডার সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় কেজি ওজনের হলেও কমন স্ন্যাপিং টার্টল ৩৫ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। উভয় প্রজাতিই সর্বভূক এবং অত্যন্ত ক্ষতিকর।
শুধু হাতিরঝিল নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি পুকুরেও এ কচ্ছপ দেখা গেছে। এগুলো সর্বভূক প্রাণী। কোনোভাবে যদি নদী-খাল ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশীয় জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য তা বড় হুমকি হয়ে উঠবে।
কেন এত ভয় এই কচ্ছপকে
রেড ইয়ারড স্লাইডারের আদি নিবাস যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের মিসিসিপি নদী অববাহিকা। এটি মাঝারি আকৃতির স্বাদুপানির কচ্ছপ।
ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, মিসিসিপি অববাহিকা থেকে শুরু করে গালফ অব মেক্সিকো হয়ে পশ্চিম ভার্জিনিয়া পর্যন্ত এ প্রজাতির বিচরণ আছে।
ওই ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হওয়া পোষা কচ্ছপগুলোর একটি। অ্যাকুয়ারিয়ামের শোভাবর্ধনকারী প্রাণী হিসেবে এর জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে।
এই প্রজাতির কচ্ছপ অন্য অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে থাকা নানা জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী খেয়ে বাস্ততন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। শুধু তা–ই নয়, এ কচ্ছপ নানা রোগের জীবাণুর বাহক এবং এসব জীবাণু দেশীয় প্রজাতির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে বলেও জানানো হয়েছে ওই ওয়েবসাইটে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৫ সালে করা জনস্বাস্থ্যবিষয়ক এক গবেষণায় এ প্রজাতির কচ্ছপ থেকে সালমোনেলা নামক জীবাণু মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একটি স্ত্রী কচ্ছপ বছরে প্রায় ৬ বার পর্যন্ত ডিম দিতে পারে, প্রতিবারে ৩০টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে।
বন্য প্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিওডব্লিওএফ) তাদের ওয়েবসাইটে এ প্রজাতির কচ্ছপ প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার বিষয়ে সতর্ক করে বলেছে, এ কচ্ছপ তার প্রাকৃতিক বিচরণ এলাকার বাইরে ছাড়া হলে ওই এলাকার বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৫ সালে করা জনস্বাস্থ্যবিষয়ক এক গবেষণায় এ প্রজাতির কচ্ছপ থেকে সালমোনেলা নামক জীবাণু মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একটি স্ত্রী কচ্ছপ বছরে প্রায় ৬ বার পর্যন্ত ডিম দিতে পারে, প্রতিবারে ৩০টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে।
অবৈধ পথে ঢুকছে দেশে
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক বলেন, মিরপুরের ওই অভিযানে কাজী শহীদ উল্লাহ দস্তগীর নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দেশে-বিদেশে বিক্রির জন্য এসব কচ্ছপ মজুত করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন। তাঁর পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে তদন্ত চলছে।
অসীম মল্লিক বলেন, লাগেজের মাধ্যমে বিমানবন্দর ব্যবহার করে কচ্ছপসহ বিভিন্ন বিদেশি বন্য প্রাণী দেশে ঢুকছে। পাশাপাশি স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং সীমান্তপথও ব্যবহার করে বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনা ঘটছে।
এই কর্মকর্তার ভাষ্য, বিমানবন্দরে এসব প্রাণী শনাক্ত করার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি আছে। আবার ফেসবুকভিত্তিক যেসব পেজে এসব প্রাণীর কেনাবেচা হয়, সেগুলো শনাক্ত ও নজরদারির ক্ষেত্রেও সক্ষমতার ঘাটতি আছে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকেও এই কচ্ছপের উপস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, সাকার ফিশ কীভাবে বুড়িগঙ্গা থেকে শীতলক্ষ্যা, তুরাগ হয়ে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের আগ্রাসী প্রজাতি (রেড ইয়ারড স্লাইডার) পরিবেশ ও প্রকৃতিতে সাকার ফিশের মতো আরেকটি ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।
সাকার ফিশের মতো আরেক বিপদ
এ ধরনের আগ্রাসী প্রজাতি পরিবেশ ও প্রকৃতিতে সাকার ফিশের মতো আরেকটি ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ।
অধ্যাপক এম এ আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকেও এই কচ্ছপের উপস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, সাকার ফিশ কীভাবে বুড়িগঙ্গা থেকে শীতলক্ষ্যা, তুরাগ হয়ে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।’
এক বছর ধরে গবেষণা করতে গিয়ে সাকার ফিশের বিস্তৃতি চোখে পড়েছে জানিয়ে এম এ আজিজ বলেন, অবিলম্বে এসব আগ্রাসী প্রজাতির অবৈধ আমদানি ঠেকাতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে, ফেসবুকের যেসব পেজে এসব বেচাকেনা হয়, সেগুলোকে আইনের আওতায় আনা, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে নজরদারি এবং এসব বন্য প্রাণী শনাক্তে সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কয়েক বছর আগেও হাতিরঝিলে সাকার ফিশ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা ছিল না। সেই মাছ এখন রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের নদী ও পুকুরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে রেড ইয়ারড স্লাইডারের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য দেখতে হতে পারে।