পদ্মার চরের শ্যামলা কাঁকাল
বিরল এক পাখির খোঁজে রাজশাহীর পদ্মার চরে যাওয়ার জন্য শহরের চর সাতবাড়িয়ার ডোগার ঘাটে এসেছি। সঙ্গে রাজশাহী–চুয়াডাঙ্গার পক্ষিসঙ্গী মারুফ রানা, বখতিয়ার হামিদসহ চারজন। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে জাকারুল মাঝির নৌকায় ১০ নম্বর চরের দিকে রওনা হলাম। চখাচখি, পিয়ং হাঁস, খোঁপাডুবুরি ও অন্যান্য জলচর পাখি দেখতে দেখতে ৫০ মিনিটে চরে পৌঁছে গেলাম। বাবলা, বড়ই, আকন্দ, শিমুলগাছ ও ঝোপঝাড়ে পূর্ণ চরটি দেখতে যেন অনেকটা আফ্রিকার সাভানার মতো। ভারত সীমান্তঘেঁষা চরটিতে বিরল খৈর, খরগোশসহ নানা প্রজাতির পাখি–প্রাণীর বাস।
চরে উঠে প্রথমেই দেখা হলো দুর্লভ গাঙ টিটির সঙ্গে। এরপর একে একে হলদে খঞ্জন, মালা চ্যাগা, সাধারণ টিকরা, ধানী তুলিকা দেখা গেল। কিন্তু বিরল পাখিটির দেখা পেলাম না। ২ জানুয়ারি থেকে পাখিটিকে এখানেই দেখা যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে দেখা হলো ডা. আতিক শাহরিয়ার তূর্যর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এখানেই আছে পাখিটি, একটু খুঁজলেই পাবেন, স্যার।’ এরপর আমরা পাঁচজন অনেকটা চিরুনি অভিযান চালিয়ে তিন মিনিটের মধ্যে পাখিটিকে খুঁজে বের করলাম।
পাখি পর্যবেক্ষক ও শিক্ষক শাহরিয়ার কবির এবং রেদোয়ান রিয়াদ ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর কুয়াকাটায় প্রথম পাখিটিকে দেখেন। মাসখানেক পর রাজশাহীতেও দেখা গেল। তৃতীয়বারের মতো দেখা গেল এ বছরের জানুয়ারিতে। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে প্রথম ছবি তোলার পর সোয়া ২ মিনিটে ৬২টি ছবি তুলি। আবার পাখিটির সঙ্গে দেখা হলো দুপুর ১২টা ৪২ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে। তখন সে আমাদের দীর্ঘক্ষণ সময় দেয়। মনের মতো করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে চার শর বেশি ছবি তোলা হয়। নতুন বছরের শুরুতে নতুন একটি পাখির ছবি তুলতে পেরে মনপ্রাণ আনন্দে ভরে ওঠে।
পদ্মার ১০ নম্বর চরে দেখা বিরল পাখিটি ইসাবেলাইন হুইটিয়ার। এটি এ দেশের পন্থ–পরিযায়ী পাখি, অর্থাৎ শীতের আবাসে যাত্রাপথে ক্ষণিকের জন্য বাংলাদেশে যাত্রাবিরতি করে। কেউ কেউ এটিকে বাংলায় ‘ইসাবেলিন কানকালি’ বলে থাকেন। তবে ‘কানকালি’ শব্দটি অপ্রচলিত, এটি সম্ভবত ‘কাঁকাল’ (অর্থাৎ কোমর/কটি) শব্দের ভুল উচ্চারণ বা বানান। যেহেতু পাখিটির কোনো প্রতিষ্ঠিত বাংলা নাম নেই, তাই শাব্দিক অর্থ বিবেচনায় ‘শ্যামলা কাঁকাল’ বলা যেতে পারে। পাখিটির গোত্র মাসসিক্যাপিডি (Muscicapidae), বৈজ্ঞানিক নাম Oenanthe isabellina। ইউরোপ, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, মঙ্গোলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের আবাসিক পাখিটি শীতে আফ্রিকা ও উত্তর–পশ্চিম ভারতে পরিযায়ী হয়। বাংলাদেশে এটি অনিয়মিত পাখি।
শ্যামলা কাঁকাল ছোট আকারের গায়ক পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ১৫–১৭ সেন্টিমিটার, ওজন ২০–৩০ গ্রাম। পুরুষ ও স্ত্রীর চেহারা প্রায় অভিন্ন। ধূসর–হলদে বা শ্যামলা আভাযুক্ত দেহের ওপরের অংশ ফ্যাকাশে বালু–বাদামি। ভ্রু–রেখা ঘিয়ে–সাদা, কানঢাকনি হালকা বাদামি, থুতনি ঘিয়ে রঙা এবং গলা ফ্যাকাশে হলুদ। বালুরঙা বুকে শ্যামলা আভা, পেট ঘিয়ে–সাদা। পিঠের নিচের অংশ ধূসর–হলদে। ডানা গাঢ় বাদামি–কালো, যার প্রান্ত ও আগা ঘিয়ে–হলুদ। লেজতল হালকা হলদে। ডানার নিচ ও বগল সাদা। পাছা ও লেজের উপরিপালক সাদা। গাঢ় বাদামি–কালো লেজের প্রান্ত ও আগা হালকা হলদে এবং গোড়া সাদা। চোখের মণি বাদামি। ঠোঁট, পা ও আঙুল কালো।
এরা সমতল ও উন্মুক্ত স্থান, বালুময় সৈকত এবং ছড়ানো ঝোপঝাড়সহ আধা মরু পরিবেশে থাকে। অত্যন্ত সক্রিয় ও চঞ্চল পাখিটি মাটিতে লম্বা লাফে চলে এবং হঠাৎ উড়ে গিয়ে উঁচু জায়গা বা ঝোপে বসে। বারবার লেজ নাড়ায়। মাথা নিচু করে দ্রুত দৌড়ায়, মাঝেমধ্যে বুক টান করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বেশির ভাগ সময় মাটিতে খাবার খোঁজে, আবার কখনো উড়ে গিয়ে পোকা ধরে। পিঁপড়া, ফড়িং, মথ, মাছি, মাকড়সা ও শূককীট এদের প্রধান খাদ্য, বীজও খায়। ডাক অনেকটা ভরতের মতো—প্রথমে কর্কশ, পরে বিভিন্ন রকম শিস।
এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় স্ত্রী–পাখি আবাস এলাকায় পরিত্যক্ত ইঁদুর বা খরগোশের গর্ত, প্রাকৃতিক ফাঁকফোকর, পাথরের নিচে বা মাটির ঢিবিতে শুকনো ঘাস, শিকড়, খড় ও পশম দিয়ে বাসা তৈরি করে। ডিম পাড়ে ৪–৬টি। রং হালকা নীল বা নীলচে–সবুজ। স্ত্রী একাই তা দেয়, ডিম ফোটে ১২–১৪ দিনে। বাবা–মা দুজনেই ছানাদের খাওয়ায়। ছানারা ১৪–১৬ দিনে উড়তে শেখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল প্রায় ৫ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়