default-image

এই চিত্রার দুই পারে বাগেরহাট সদর ও চিতলমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ১৭-১৮টি গ্রাম এখন হয়ে উঠেছে একখণ্ড সুন্দরবন। স্থানীয় মানুষজনের কথায়, ‘মিনি সুন্দরবন’। আর পাখি ও বন্য প্রাণিবিষয়ক লেখক শরীফ খানের ভাষায়, ‘সুন্দরবনের আরেক সন্তান।’

সুন্দরবনের গাছের পাশাপাশি এখানে উপস্থিত হয়েছে প্রাণিকুলও। মেছো বাঘ, বাঘডাশা, খাটাশ, বিষধর সাপের মতো বিপন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণীর দেখা পাওয়ার কথা হলফ করে বলছে গ্রামের মানুষ। এ–ডালে ও–ডালে বা নদীর ধারে মুহূর্তে মুহূর্তে ঠিকানা বদলাচ্ছে মাছরাঙা, ঘুঘু, শালিক অথবা পানকৌড়ি।

গত অক্টোবর আর এ বছরের জুলাইয়ে দুবার যাওয়া হলো ওই এলাকায়। উপজেলা পৃথক, তবে জনজীবনের রূপটি অভিন্ন। প্রধান সড়কের দুই পাশেই যত দূর চোখ যায় কেবল জলের ফসল চিংড়ির বসতির আয়োজন। ফাঁকে ফাঁকে গ্রাম, বাজার আর বসতির কোলাহল। একটু পরপর চায়ের দোকান। গরুর দুধের চা প্রতি কাপ ৮ টাকা!

বাগেরহাটের কম পরিচিত চিত্রা নদী সম্পর্কে জেলা তথ্য বাতায়ন বলছে, ওর উৎপত্তি মোল্লাহাট উপজেলার কেন্দুয়া বিল থেকে। তারপর বাগেরহাটে এসে হয়েছে ভৈরবের অংশ। আরও দক্ষিণে এগিয়ে বলেশ্বর নদ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়ার আগে কোথাও পয়লাহারা, কোথাও পানগুছি নাম পেয়েছে চিত্রা। উৎপত্তি থেকে সাগরে পৌঁছানো পর্যন্ত এই এ নদীপ্রবাহের দৈর্ঘ্য পৌনে দুই শ কিলোমিটার।

default-image

৯ জুলাই বিকেলে চিত্রা নদীর ওপর বানানো গোদাড়া স্লুইসগেট ও বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে চোখে পড়ল বৈচিত্র্যময় বৃক্ষরাজি। তখন চিত্রার নীল জল, আষাঢ়ের আকাশে সাদা মেঘের ছোটাছুটির তলায় বয়ে চলেছে রঙিন পোশাকের পর্যটকদের বিপুল উচ্ছ্বাস। বাঁধ থেকে নদীর প্রান্ত ধরে কয়েক পা এগোতেই দেখা পেলাম গোলপাতা আর কেওড়াগাছের। মানুষ যখন গাছ দেখে, গাছও তখন মানুষের দিকে তাকায়।

ঘোরাঘুরি, দেখাদেখির পর পৌঁছাই চিতলমারী উপজেলার প্রবেশমুখে, ডুমুরিয়া বাজারে। চিতলমারী সদর ইউনিয়নের ডুমুরিয়া, রায়গ্রাম, শুরিগাতির মতো কয়েক গ্রাম আর বাগেরহাট সদরের উজলপুর, হদেরহাট, চাঁপাতলার মতো কিছু জনপদ ঘেঁষে খরস্রোতা চিত্রার দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে তৈরি হয়েছে এই মিনি সুন্দরবন।

বন বিভাগ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলছেন, সুন্দরবন থেকে গাছের বীজ নদীপথে এসেছে ভেসে। জোয়ার-ভাটা যেন উসকানি দিয়ে সে বীজ পৌঁছে দিয়েছে গ্রামগুলোর নদীঘেঁষা মাটিতে। অঙ্কুরোদ্‌গম ঘটেছে প্রাকৃতিক নিয়মেই। এভাবে অন্তত তিন দশক ধরে একটু একটু করে পেয়েছে বনের আকার। কেউ এখানে কিছু সৃজন করেননি। স্থানীয় সাংবাদিক পংকজ মণ্ডলকে নিয়ে জনশ্রুতি আছে, তিনিই প্রথম সামনে এনেছেন সুন্দরবনের এই মিনিয়েচারের কথা। পংকজ বললেন, নতুন এই বনকে টিকিয়ে রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে।

টিকিয়ে রাখার কথাটিতে বেশি জোর দেওয়ার কারণ নদীর দুই তীরে খাসজমিতে গড়ে ওঠা এসব বনের সম্পদে দখল নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে পৈতৃক সম্পত্তির মতো। আছে পাখিশিকারি চক্র।

এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, ‘প্রভাবশালীদের কবল থেকে নতুন বন উদ্ধার করে সেখানে পার্ক করার পরিকল্পনা আছে। চিতলমারী ও বাগেরহাট সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথাও হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি দেখতে পাবেন।’

এ বনের এখনো নামকরণ হয়নি। বাগেরহাটেরই মানুষ, লেখক শরীফ খান বলছিলেন, চিতলমারীর সঙ্গে মিলিয়ে ‘চিত্রাসুন্দরী বন’ বা ‘চিত্রাসুন্দরবন’ যেকোনোটি হতে পারে। পদ্মা সেতু হওয়ার পর রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণের যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়েছে। নতুন এক পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার হাতছানি দিচ্ছে চিত্রাপারের এই নতুন সুন্দরবন। স্থানীয় মানুষও ভালোবেসে ডাকতে পারে কোনো এক নামে এই বনকে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন