বাংলাদেশে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ায় সীমান্তবর্তী চা-বাগানে কালো তিতির পাখির প্রচুর ডাক শোনা যায়। ডাক শুনলেই দেখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কদাচিৎ দেখা মেলে।
এই পাখিটির দুটি অদ্ভুত নাম আছে। ‘পান বিড়ি সিগারেট’ এবং ‘শেখ ফরিদ’। এ দুটির কোনো নামই পাখির নাম হওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। স্থানীয় লোকেরা কালো তিতির নামে চেনেন না। তাঁরা এই অদ্ভুত দুই নামেই চেনেন। আমি যখন প্রথম এই নাম শুনেছি, তখন মনে হয়েছিল কেউ রসিকতা করে বলছেন।
সারা দেশ থেকে পাখির আলোকচিত্রীরা কালো তিতির ও ময়ূরের ছবি তোলার জন্য পঞ্চগড়ে যান। আমি নিজেও কয়েকবার গিয়েছি কালো তিতির এবং ময়ূরের খোঁজে। অতীতে কখনো কখনো ঘন চা-বাগানের ভেতরে কালো তিতিরকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেছি। কখনো ক্ষিপ্র গতিতে উড়ন্ত অবস্থায়ও দেখেছি। ওই পর্যন্তই। শুনেছি বৃষ্টি হলে এ পাখি গাছের ডালে বসে পাখা ঝাপটায়। কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর কালো তিতিরের ছবি তুলতে পারব—এই আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।
অতিসম্প্রতি পঞ্চগড়ে নদীর কাজের জন্য আমাকে যেতে হয়েছিল। যেহেতু পঞ্চগড়ে যাব, তাই তেঁতুলিয়া না যাওয়ার কারণ নেই। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়া প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। কালো তিতির ও ময়ূর দেখার আশায় তেঁতুলিয়া গিয়েছিলাম।
রংপুর থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব পৌনে ২০০ কিলোমিটার। দুবার বাস বদলাতে হয়। যেতে প্রায় ছয় ঘণ্টা লাগে। চিকিৎসক ও পাখির আলোকচিত্রী রকিবুল আলম চয়ন আমাকে আগেই জানিয়েছেন কালো তিতির পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তিনি ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে কর্মরত। ঠাকুরগাঁওয়ে আরও দুজন আলোকচিত্রীসহ রকিবুল আলম সকালে যাবেন তেঁতুলিয়া।
আমার সঙ্গে প্রকৌশলী ফজলুল হকও গেলেন ছবি তুলতে। আমরা রাত সাড়ে নয়টায় পৌঁছালাম তেঁতুলিয়া। মহানন্দার পাড়ে রাতে কয়েকজন আলোকচিত্রীর সঙ্গে দেখা হলো। তাঁদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আলোকচিত্রী রয়েছেন। তাঁরাও এসেছেন কালো তিতির ও ময়ূরের ছবি তোলার জন্য।
সকাল সাড়ে পাঁচটায় আমরা তেঁতুলিয়া বাজারে যেতেই ঠাকুরগাঁও থেকে রকিবুল আলম, রেজাউল হাফিজ ও আহমেদ কবীর—এই তিনজন আলোকচিত্রীও এসে পৌঁছান। তাঁরা ভোর চারটায় রওনা করেছিলেন ঠাকুরগাঁও থেকে। আমরা পাঁচজন মিলে চা-বাগানে চলে যাই, যেখানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অংশে এ পাখি দেখা যায়। প্রথমে যেখানে ময়ূর দেখা যায়, সেখানে গেলাম। সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই গাছ থেকে ময়ূর চা–বাগানে নেমে যায়। ফলে আর দেখার উপায় থাকে না।
সবাই মিলে এবার কালো তিতিরের সন্ধান করতে থাকি। রেজাউল হাফিজ গরম পানি, টি ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। আমরা এক ফাঁকে চা খেয়েছি। রকিবুল আলম উত্তেজিত হয়ে প্রথমে একটি কালো তিতির দেখালেন। দেখতে দেখতেই চা–বাগানে আড়ালে চলে গেল। কোনো রকম একটি ছবি তুলতে পেরেছিলাম। পাখির আলোকচিত্রীদের কাছে প্রথম এই ছবি নেওয়াকে সাক্ষী ছবি বলে। মানে আমি যে কালো তিতিরি দেখেছি, তার প্রমাণস্বরূপ এই ছবি।
এরপরই আমরা দেখতে পেলাম এক জোড়া কালো তিতির হেঁটে হেঁটে খাবার খুঁজছে। জোড়া কালো তিতির দেখে ভীষণ আনন্দ হলো। মন ভরে দেখলাম। ছবিও তুললাম। তখনো সকালের আলো ঠিকমতো ফোটেনি। বলা যায়, ভোরের আলোয় দেখা মিলল। চারদিকে অনেক তিতিরের ডাক ক্রমাগত কানে বেজে চলেছে। ডাক শুনে মনে হয় খুব কাছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে রেজাউল হাফিজ রাহী জানালেন এই ডাক যত কাছের মনে হয়, তত কাছে নয়।
রেজাউল হাফিজ ও আহমেদ কবীর প্রায় ১০ বছর ধরে নিয়মিত এ পাখির সন্ধান করেন। তাঁদের ভাষ্য, এ বছর যতটা সময় ধরে তাঁরা দেখতে পেলেন, অতীতে এ রকম দেখেনি। তিতির পাখি পাঁচ-সাত মিনিট ধরে দেখা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের বিষয়। এপ্রিল থেকে কালো তিতিরের প্রজনন সময় শুরু হয়। পুরুষ পাখিটি বেশি রঙিন। এর মাথা কালো, চোখের নিচে সাদা। গলায় একটি অংশ লালচে, পিঠ কালো-সাদার মিশেল এবং বড় ছোট তিলা তিলা সাদা দাগ আছে। পেটের দিকটা কালো। স্ত্রী পাখিটি দেখতে বাদামি রঙের ওপর সাদাটে ছোট, বড় তিলা তিলা দাগ। মাথার অংশে হলদেটে রং, চোখ কালো। পাখিটির ইংরেজি নাম Black Francolin। বৈজ্ঞানিক নাম: francoliniusn francolinous।
কালো তিতিরের আচরণ অনেকটা দেশীয় মুরগির মতো। মাটি থেকে খাবার সংগ্রহ করে খায়। ঝোপঝাড়ে বাসা করে। স্থানীয় লোকেরা কালো তিতিরকে কখনো কখনো ৮-১০টি বাচ্চা নিয়ে চলাফেরা করতে দেখেছেন। খুবই সাবধানী চলাফেরা। রকিবুল আলম জানালেন, মানুষের পা ফেলায় যে সামান্য শব্দ হয় এটুকু বুঝতে পারলেই সটকে পড়ে। ফলে সহজে দেখা যায় না। শুনেছি কেউ কেউ পাখিটি শিকার করে খায়। বাংলাদেশের দুর্লভ এ পাখিটি ভালোভাবে টিকে থাকুক এটি প্রত্যাশা।
তুহিন ওয়াদুদ, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর