সংরক্ষিত বনে গুলি করে হাতি হত্যা করছে কারা

সরকারি হিসাবে এক দশকে কক্সবাজারে ৯ হাতি হত্যা। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সংখ্যা ১৮।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী সংরক্ষিত বনের ভেতর গাছের ওপর তৈরি এসব মাচাং ঘর থেকে হাতিকে গুলি করা হয়। গত ২০ জুন তোলা ছবিছবি: প্রথম আলো

২০২৩ সালের ১১ জুন। গভীর রাত। গহিন বনে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে হাসিনা বেগমের। টর্চলাইট নিয়ে বের হয়ে এসে দেখেন ভিটার এক কোণে কাঁঠালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে গোঙাচ্ছে একটি হাতি। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। কিছুক্ষণ পর হাতিটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে গোঙানির শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে। পরদিন মারা যায় হাতিটি।

কক্সবাজারের খুটাখালী বনের পাশে ৩৫ বছর বয়সী হাসিনা বেগমের সঙ্গে তাঁর ভিটায় দাঁড়িয়ে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ওই দৃশ্যের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আশপাশে আমবাগানে রাতে হাতি নামে। হাতির পালে গুলি চালালে এই হাতি আহত হয়ে মারা যায়। এখানে গত কয়েক বছরে আরও পাঁচ–ছয়টি এমন গুলির ঘটনা ঘটেছে।

কারা গুলি করছে হাতিকে? তেমন কাউকে তিনি চেনেন কি না, জানতে চাইলে সরাসরি উত্তর দেননি হাসিনা। এর উত্তর পাওয়া গেল খুটাখালী বনের পাশে আরেক গ্রামের আবদুল হামিদের কাছ থেকে। তিনি বললেন, ‘হাসিনার স্বামী মো. ইদ্রিস ওই হাতিটাকে গুলি করেছিলেন। তাঁর বাড়ি থেকে আমরা বন্দুক উদ্ধার করেছিলাম। পরে বন বিভাগের করা মামলায় ছয় মাস জেল খাটেন ইদ্রিস।’ তবে হাসিনা বেগম বলেন, ওই রাতে তাঁর স্বামী ঘরে ছিলেন না। এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। ইদ্রিস বাড়িতে না থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

হাতির দল নিয়মিত এ বন দিয়ে যাতায়াত করে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, ধান পাকার মৌসুম এলে এখানে হাতি হত্যা বেড়ে যায়।

হাসিনা বেগমের ভিটার পাশেই মধুশিয়া গর্জনবন। এখানে হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর (হাতি চলাচলের পথ) আছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের তালিকায় এই করিডর খুটাখালী–মেধাকচ্ছপিয়া নামে পরিচিত। হাতির দল নিয়মিত এ বন দিয়ে যাতায়াত করে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, ধান পাকার মৌসুম এলে এখানে হাতি হত্যা বেড়ে যায়।

আইইউসিএন ২০১৬ সালে সর্বশেষ হাতির সংখ্যা নিয়ে একটি জরিপ চালায়। এতে হাতির সংখ্যা পাওয়া যায় ২৬৮টি। অধিকাংশ হাতির আবাস কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই জরিপের পর হাতিকে ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড’ বা মহাবিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে আইইউসিএন।

আরও পড়ুন

কক্সবাজারে হাতি হত্যার কারণ তদন্তে ২০২০ সালের নভেম্বরে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই মাসেই দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হাতি রক্ষায় বন কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব আছে বলে উল্লেখ করা হয়।

হাতি রক্ষায় জবরদখলে সংকুচিত হতে থাকা হাতির করিডর উন্মুক্ত রাখা, বিদ্যুতের ফাঁদ অপসারণে টহল বাড়ানো, জনবল বাড়ানো, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন, হাতির খাদ্যোপযোগী বাগান সৃষ্টি, শুষ্ক মৌসুমে হাতির পানির চাহিদা পূরণে বনের ভেতরের জলাধারগুলো সংরক্ষণ, হাতির খাদ্য (যেমন উলু ফুল, ছন, বাঁশ) আহরণ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, সন্ধ্যা নামলে এখানে লোকজন বন্দুকসহ অবস্থান নেয়। পাকা ধান পাহারা দিতে এসব মাচাং তৈরি করেন এখানকার কৃষকেরা। এসব কৃষকের অধিকাংশই বন বিভাগের নিবন্ধনভুক্ত ভিলেজার। হাসিনা বেগমের স্বামী ইদ্রিসও একজন ভিলেজার।

গুলি করছে কারা

গত ২০ জুন সরেজমিনে দেখা যায়, খুটাখালী বনের হাজিরঘোনা আর মধুশিয়া গর্জনবনের মাঝখানে বিশাল ধানিজমি। এসব জমির যেখানে যেখানে গাছ আছে, সেসব গাছের ওপর বাঁশ আর ছন দিয়ে তৈরি পাঁচটি মাচাং চোখে পড়ে। দিনের বেলায় মাচাংগুলোতে কাউকে দেখা যায়নি। স্থানীয় লোকজন বলছেন, সন্ধ্যা নামলে এখানে লোকজন বন্দুকসহ অবস্থান নেয়। পাকা ধান পাহারা দিতে এসব মাচাং তৈরি করেন এখানকার কৃষকেরা। এসব কৃষকের অধিকাংশই বন বিভাগের নিবন্ধনভুক্ত ভিলেজার। হাসিনা বেগমের স্বামী ইদ্রিসও একজন ভিলেজার।

এ রকম ভিলেজারদের নিয়ে খুটাখালীতে একটি গ্রাম আছে ভিলেজারপাড়া। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকার বন সংরক্ষণে সহযোগিতার শর্তে গৃহহীনদের বনের ভেতর ২৫ শতক থেকে ২০০ শতক পর্যন্ত জমি বরাদ্দ দেয়। বরাদ্দ নেওয়া গৃহহীনেরাই ভিলেজার হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে তাঁদের পরিবারে সদস্যসংখ্যা বাড়লে তাঁরাও বনের ভেতর বসবাস শুরু করে বনের জমি দখল করেন। তাঁরা বিভিন্ন চাষাবাদ করেন। ফসল রক্ষায় তাঁরাও হাতি হত্যায় জড়িয়ে পড়ছেন।

আরও পড়ুন

ভিলেজারপাড়ার আবদুল হামিদ বলেন, বনের ভেতর প্রতিটি মাচাংয়ে অস্ত্র থাকে, বিশেষ করে একনলা গাদাবন্দুক। রাতে যখন হাতি নামে, তখন এসব মাচাং থেকে হাতিকে গুলি করা হয়। হাসিনা বেগমের ভিটায়ও আমগাছের ওপর এ রকম একটি মাচাং দেখা গেল। বন বিভাগের তিনটি মামলার নথিতে হাতি হত্যায় কয়েকজন ভিলেজারকে আসামি করা হয়েছে।

বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বন বিভাগের অধীন প্রতিটি বিট অফিসে ২০–২৫ জন ভিলেজার আছেন। কক্সবাজারে এ রকম বিট অফিসের সংখ্যা প্রায় ৬০। প্রতি বিট ২০ জনের হিসাবে ভিলেজারের সংখ্যা হবে ১ হাজার ২০০ জনের মতো।

ভিলেজারপাড়ার এক বয়োবৃদ্ধ মনসুর মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, আগে মুরব্বিরা নানা উপায়ে হাতি তাড়াতেন। এখন লোকজন গুলি করে। হাতিগুলোকে এভাবে মেরে ফেলা হচ্ছে। সংরক্ষিত বনের ভেতর ব্যক্তিমালাকাধীন জমি আছে। এসব জমিতে অনেকে খামারবাড়ি করেছে। তারাও হাতিকে গুলি করে থাকে। এ ছাড়া পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শূকর মারতে বনে ঢোকে অনেকে। হাতির মুখোমুখি হলে তারাও গুলি করে।

কক্সবাজার অঞ্চলে কতজন ভিলেজার আছেন, বন বিভাগের কাছে তার প্রকৃত হিসাব নেই। তবে কক্সবাজারে ২৮ হাজার একর বনভূমি বেদখল হয়েছে বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, ব্রিটিশ সরকারের প্রবর্তিত ভিলেজার প্রথার কোনো হালনাগাদ করা হয়নি। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত তাদের পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। বনের ওপরও চাপ বাড়ছে। এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে ঊর্ধ্বতনদের কাছে চিঠি দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বন বিভাগের অধীন প্রতিটি বিট অফিসে ২০–২৫ জন ভিলেজার আছেন। কক্সবাজারে এ রকম বিট অফিসের সংখ্যা প্রায় ৬০। প্রতি বিট ২০ জনের হিসাবে ভিলেজারের সংখ্যা হবে ১ হাজার ২০০ জনের মতো।

তাঁরা বলছেন, কক্সবাজারে যত হাতি হত্যা করা হয়, ময়নাতদন্তের সময় কমপক্ষে ৭০ শতাংশ হাতিকে তাঁরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পেয়েছেন। একজন ভেটেরিনারি সার্জন কক্সবাজারে ২০টি হাতির ময়নাতদন্তে গুলি বের করার কথা জানিয়েছেন।

গুলির ঘটনা বেশি, নথিভুক্ত কম

বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে কক্সবাজারে গুলিতে মারা গেছে ৯টি হাতি। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সংখ্যা ১৮। খুটাখালীতেই ঘটেছে ৬টির বেশি গুলির ঘটনা। বন বিভাগের নথিতে হাতির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা কম নথিভুক্ত হলেও মাঠপর্যায়ে বন কর্মকর্তা ও হাতির ময়নাতদেন্তর সঙ্গে যুক্ত সার্জনরা দিয়েছেন ভিন্ন চিত্র। হাতির ময়নাতদন্তে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও বন বিভাগের নিজস্ব ভেটেরিনারি সার্জন যৌথভাবে যুক্ত থাকেন।

তাঁরা বলছেন, কক্সবাজারে যত হাতি হত্যা করা হয়, ময়নাতদন্তের সময় কমপক্ষে ৭০ শতাংশ হাতিকে তাঁরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পেয়েছেন। একজন ভেটেরিনারি সার্জন কক্সবাজারে ২০টি হাতির ময়নাতদন্তে গুলি বের করার কথা জানিয়েছেন। বনের ভেতরে হাতির ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে তাঁরা মাচাং ঘর দেখেছেন, যেখান থেকে হাতিকে গুলি করা হয়।

২০২৫ সালে পুলিশ চকরিয়া থানার মাতামুহুরী এলাকা থেকে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। বিশেষ করে মহেশখালীর কালামারছড়া এলাকার গহিন পাহাড়ে অস্ত্র তৈরি হয়। সেখান থেকে কক্সবাজারের নানা জায়গায় এসব ছড়িয়ে পড়ে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অভিজিৎ দাশ

হাতি হত্যায় অস্ত্র আসে কোত্থেকে

এ বছরের ১৭ মে চকরিয়া উপজেলার ঈদগাঁও রেঞ্জে গুলিতে মারা যায় একটি হাতি। এর ময়নাতদন্ত করেন ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাতির বাঁ চোখের ওপর ৯ ইঞ্চি গভীর থেকে গুলিটি বের করা হয়। এই গুলির ওজন ছিল ৬ গ্রাম। এগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি গাদাবন্দুক থেকে ছোড়া গুলি।

২০২৫ সালের ১৫ মার্চ হাতি হত্যার ঘটনায় কক্সবাজারের ইনানীর গহিন বনের মাচাং ঘর থেকে একটি একনলা বন্দুক উদ্ধার করে বন বিভাগ। বন বিভাগ বলছে, এমএস পাইপ দিয়ে তৈরি এসব বন্দুকে শটগানের ছররা গুলি ব্যবহার করা হয়।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অভিজিৎ দাশ প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সালে পুলিশ চকরিয়া থানার মাতামুহুরী এলাকা থেকে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। বিশেষ করে মহেশখালীর কালামারছড়া এলাকার গহিন পাহাড়ে অস্ত্র তৈরি হয়। সেখান থেকে কক্সবাজারের নানা জায়গায় এসব ছড়িয়ে পড়ে। নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

২০১৩ সালে চকরিয়ার খুটাখালীর কালাপাড়া থেকে দেশীয় অস্ত্র তৈরির একটি কারখানা খুঁজে পায় র‍্যাব। এরপর ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর চকরিয়ার চরণদ্বীপ এলাকায় দুটি অস্ত্র কারখানার সন্ধান পায় র‍্যাব।

বিশিষ্ট বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান প্রথম আলোকে বলেন, হাতির ওপর গুলির ঘটনা থামাতে হলে পুলিশ, বন বিভাগ ও স্থানীয় রাজনীতিবিদ সবাইকে সম্মিলিত ভূমিকা রাখতে হবে। পুলিশের কাছে তথ্য থাকে কার কাছে বন্দুক আর গুলি আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্থানীয় রাজনীতিবিদ বন্য প্রাণী সংরক্ষণের পক্ষে না থাকলে পুলিশ কাজ করতে পারবে না। যেসব মাচাং থেকে হাতিকে গুলি করা হয়, সেগুলো ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।