ভৈরবতীরের শতবর্ষী আমগাছ

যশোরের অভয়নগরের শ্রীধরপুর ইউনিয়নের দেওয়াপাড়া গ্রামে শতবর্ষী আমগাছছবি: প্রথম আলো

উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে চলেছে ভৈরব। অনেকটা দূর পাড়ি দিয়ে নদটি আচমকা বাঁক নিয়ে পূর্বমুখী হয়েছে। খানিকটা দূর এগিয়ে নদটি আরও কিছুটা বাঁক নিয়ে গেছে উত্তর-পূর্ব দিকে। এই বাঁক নেওয়া জায়গাটার নাম দেওয়াপাড়া। ভৈরবের পাশে সড়কের দুই পাশে অসংখ্য গাছগাছালি। গাছগুলো যেন একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কিন্তু সব গাছ ছাড়িয়েছে একটি গাছ। অনেক দূর থেকে চোখে পড়ছে গাছটি।

যশোরের অভয়নগর উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়নের এই দেওয়াপাড়া গ্রামে ভৈরবের তীরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি আমগাছ। ভৈরব নদ থেকে পাকা সর্পিল সড়ক দিয়ে আনুমানিক ২০০ মিটার এগোলেই দেখা মিলবে এ গাছের।

আমগাছটির বয়স নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে নানা মত। কেউ বলেন, এর বয়স ১০০–এর বেশি। কেউ বলেন ১৫০। আবার অনেকের মতে, গাছটির বয়স ২০০–এর বেশি। তবে গাছটির বয়স নিয়ে যতই মতভিন্নতা থাকুক, গাছটি শতবর্ষী—এ নিয়ে তাঁদের কোনো মতপার্থক্য নেই। গাছটির পরিচয় তাই শতবর্ষী আমগাছ।

৪২ শতাংশ জমির ওপর রয়েছে প্রাচীন গাছটি। উচ্চতা প্রায় ৮০ ফুট। কাণ্ডের প্রস্থ প্রায় ১৫ ফুট। এ জায়গার মালিক এখন আবুল কাসেম মোল্যা এবং তাঁর ভাইয়েরা।

আবুল কাসেম মোল্যা (৬৫) বলেন, ‘দেশি প্রজাতির আমগাছটি আমাদের পূর্বপুরুষের কেউ রোপণ করেছেন। আমার বাবা, আমার দাদাও এ আকারেই দেখেছেন গাছটি। গাছটির নাম “বোয়ালে আমগাছ”। গাছটিতে প্রতিবছর ২০০-২৫০ মণ আম হয়। সর্বোচ্চ ৪৫০ মণ আম পেয়েছি এই গাছ থেকে।’

আবুল কাসেম মোল্যা বলেন, ‘আমগাছটি অনেক পুরোনো। অনেক বড়। গাছটি আমাদের ঐতিহ্য। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন গাছটি দেখতে। এ জন্য আমরা কখনো গাছটি বিক্রির কথা চিন্তা করি না।’

গাছটি কত প্রাচীন? জানতে চাইলে দেওয়াপাড়া গ্রামের গৃহবধূ রাধারানী চক্রবর্তী (৯১) জানান, গাছটির বয়স ২০০ বছরের বেশি হবে। তিনি জানালেন, তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৩ বছর বয়সে। বিয়ের পর স্বামী ও শ্বশুরের মুখে গাছটির কথা শুনেছেন। গাছটি দেখতে আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে।

অভয়নগর বন বিভাগ ২০১৮ সালের ১২ মার্চ আমগাছটি পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে গাছটির বয়স আনুমানিক ৩০০ বছর উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবেদনে গাছটির উচ্চতা ৮০ ফুট এবং কাণ্ডের বেড় ১৪ ফুট ৬ ইঞ্চি উল্লেখ করা হয়।

উদ্ভিদবিজ্ঞানী এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম মনজুর হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে দুই ধরনের আমগাছ হয়—গুটি ও কলমের আমগাছ। আঁটি থেকে যে গাছ হয়, তাকে গুটি আমগাছ বলে। এই আমগাছ বড় হয় এবং একটি গাছ থেকে আরেকটি গাছ আলাদা হয়। আর আমগাছের ডালে কলম তৈরি করে যে গাছ হয়, তাকে কলমের গাছ বলে। এই আমগাছে মাতৃগাছের গুণাবলি থাকে এবং প্রতিটি গাছ এক রকমের হয়। আমাদের দেশে গুটি আমগাছ ২০০ বছরের বেশি সময় বাঁচতে পারে।’

শতবর্ষী আমগাছটির পাশেই রয়েছে একটি শতবর্ষী কাঠবাদামগাছ। ঐতিহ্যবাহী দুটি গাছ ঘিরে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্রে গড়ে তোলা যেতে পারে বলে মত অনেকের।

অভয়নগর উপজেলা বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার সমীরণ বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই আম ও কাঠবাদামগাছ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যাতে বন বিভাগ উদ্যোগ নেয়, এ ব্যাপারে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করব।’