ছোটবেলা মা-চাচিদের বলতে শুনেছি, বিলে যখন পালিত হাঁসগুলো থাকত, তখন বুনো হাঁসও মিলেমিশে চলত। পালিত হাঁসের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কোনো কোনো বুনো হাঁস বাড়িও চলে আসত। দু-এক দিন থেকে আবার চলে যেত। পাখি বিষয়ে যখন থেকে একটু লেখাপড়া করি কিংবা পাখি দেখি, ছবি তুলি, তখন মাঝেমধ্যে মা-চাচিদের ওই কথা মনে পড়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দুর্লভ দুটি পরিযায়ী হাঁস দেখেছি, যেগুলো দেশি হাঁসের ঝাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
শীতকালে তিস্তায় আমরা কয়েকজন পাখির সন্ধান করি। বোঝার চেষ্টা করি তিস্তায় কোন কোন পাখি আসে। যে মাঝি আমাদের সঙ্গে নিয়ে তিস্তায় যান, তাঁর নাম খাইরুল ইসলাম। একদিন তিনি জানালেন, তিস্তা নদীসংলগ্ন একটি বড় কোলা তথা নিম্নাঞ্চল আছে, যেটি নদী থেকে এখন প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিছুদিন আগে সেখানে অনেক পাখি দেখা গেছে। জায়গাটি রংপুর জেলার মধ্যেই পড়েছে।
প্রায় দেড় কিলোমিটার চরে হেঁটে সেখানে যেতে হলো। খুব আগ্রহ করে গেলাম ওই কোলায়। দূর থেকে অনেকগুলো শামুকখোল পাখি দেখতে পেলাম। এরপর দেখলাম গাঙ টিটি, তিলা লালপা, পাতি সবুজপা পাখি। কয়েকটি নথজিরিয়াও চোখে পড়ল। কিছু পাখি বিশ্রাম করছে, কিছু খাবারের খোঁজে এদিক-সেদিক ব্যস্ত।
অনেকখানি চর হেঁটে যাওয়ায় ক্লান্তও লাগছিল। ক্যামেরায় চোখ রেখে বোঝার চেষ্টা করছিলাম বিশেষ কোনো পাখি আছে কি না। মাঝিকে বললাম কিছুটা কাছে গিয়ে দেখে আসতে। দেশি হাঁসের ঝাঁকে একটি অন্য রকম পাখি দেখা যাচ্ছিল। সেটিও দেখে আসতে বলি। মাঝি ঠিকমতো চিনতে না পেরে আমাকে ইশারা করে কাছে যেতে বলেন।
দূর থেকে ক্যামেরায় ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে দেখি, পাখিটি উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস। রংপুর অঞ্চলে এ হাঁস একদিন কেবল কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদে দেখেছি। তা-ও কয়েক বছর আগে। তিস্তায় কখনো দেখিনি। তিস্তায় দেখা পাখির সংখ্যা তাহলে একটি বাড়ল। কাছে যেতে যেতে উত্তুরেল্যাঞ্জা ছাড়া আরেকটি ভিন্ন হাঁস দেখতে পেলাম। দেশি হাঁসের চেয়ে সামান্য আলাদা। হাঁসটি আবার উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসের কাছে কাছেই ছিল। আরেকটু কাছে যেতেই বুঝলাম, এটি উত্তুরেখুন্তে হাঁস। উত্তুরেখুন্তে প্রতিবছর তিস্তা নদীতে দেখা যায়। ব্রহ্মপুত্রেও দেখেছি। এ দুই জাতের হাঁসই শীতকালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়।
এক ব্যক্তি জাল নিয়ে মাছ ধরতে এসেছেন। ওই লোককে দেখে হাঁস দুটি দেশি হাঁসের দলের ভেতরে ঢুকে যায়। দেশি হাঁসের দলে ঢুকে যাওয়ায় আর ঠাওর করা যাচ্ছিল না। কয়েক দিন ওই কোলা তথা নিম্নাঞ্চলে পরিযায়ী হাঁস দুটো ওই দলে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসটি পুরুষ এবং উত্তুরেখুন্তে হাঁসটি ছিল স্ত্রী। একদিন দেখলাম পাখি তিনটি—উত্তুরেল্যাঞ্জার স্ত্রী হাঁস এসেছে।
এর কয়েক দিন পর রংপুরেই তিস্তায় এক জোড়া উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস দেখেছি। এরও কিছুদিন পর প্রকৌশলী ফজলুল হক আমাকে জানালেন, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় ভাড়ারদহ বিলে অনেক পাখি আসতে শুরু করেছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস রয়েছে। পবিত্র রমজান মাসের এক বিকেলে গিয়ে হাজার হাজার পাতিসরালির ভিড়ে কয়েকটি উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস দেখতে পেয়েছি।
উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস দেখতে অদ্ভুত মায়াবী। সহজে আকৃষ্ট করে। এ হাঁসের লেজের শেষ প্রান্ত সুচের মতো। যখন ওড়ে, তখনো লেজের জন্য আলাদা করে সহজে চেনা যায়। এ হাঁসের মাথা থেকে গলা পর্যন্ত চকলেট রং। চকলেট রঙের গলায় সাদা রেখা আছে। উত্তুরেখুন্তে স্ত্রী হাঁসটি দেখতে একেবারেই দেশি হাঁসের মতো। কেবল তার ঠোঁট পালিত হাঁস থেকে আলাদা করেছে। অনেক চ্যাপ্টা ঠোঁট এদের।
বিভিন্ন শীতপ্রধান দেশ পরিযায়ন করে অনেক পাখি খাবারের এবং নিরাপদ আবাসের খোঁজে বাংলাদেশে আসে। উত্তুরেল্যাঞ্জা ও উত্তুরেখুন্তে হাঁসও তা-ই করে। আমাদের উচিত পরিযায়ী পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শীতে যে বহু প্রজাতির লাখ লাখ পরিযায়ী পাখি আসে, সেই পাখি তো আমাদের দেশকে প্রাকৃতিক সম্পদে-সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ করে। এই সম্পদ আর সৌন্দর্য বজায় রাখা দেশের প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
তুহিন ওয়াদুদ, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর