আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের ভিড়

ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ধেয়ে আসছে। গতকাল সোমবার দুপুর থেকে চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হলেও লোকজন খুব একটা গা করেনি। তখন ৭ নম্বর বিপৎসংকেতের হুঁশিয়ারি ছিল। সন্ধ্যায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণার পর চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকার লোকজন ধীরে ধীরে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ঘূর্ণিঝড়টি ৩৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং কক্সবাজার থেকে ৩০৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ৮৯ কিলোমিটার। দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া আকারে এটি ১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আজ মঙ্গলবার ভোরে এটি চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চতার জোয়ারে প্লাবিত হতে পারে উপকূলীয় এলাকা।

গত বছরের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানে চট্টগ্রাম উপকূলে। তখন ৭ নম্বর বিপৎসংকেত ঘোষণা করেছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঝড়ে চট্টগ্রামে ১০ জনসহ সারা দেশে মোট ২১ জন মারা যান।

এদিকে গতকাল সকালে ৭ নম্বর বিপৎসংকেত ঘোষণার পরই চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়ের সময় জেটিতে জাহাজ রাখা বিপজ্জনক বলে বন্দরের কর্মকর্তারা জানান। জেটিতে অবস্থান করা পণ্যবাহী ২৪টি বড় জাহাজ বিকেলের মধ্যে সাগরের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য আনার কাজ করা লাইটার জাহাজগুলোকেও কর্ণফুলী নদীর উজানে শাহ আমানত সেতু এলাকায় সন্ধ্যার মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ঘূর্ণিঝড় মোরা মোকাবিলায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আজ মঙ্গলবার আধাবেলা বিমান চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার রিয়াজুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, মঙ্গলবার সকাল পৌনে ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম নগরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। সন্ধ্যার পর বৃষ্টি থেমে যায়। রাত ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় বৃষ্টি ছিল না। ঝড়ের পূর্বাভাসের কারণে বিকেল থেকেই নগরের সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল কিছুটা কম ছিল।

গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা হয়। জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী সভায় বলেন, চট্টগ্রাম নগর ও জেলার ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে সাড়ে চার লাখ লোকের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, অন্যবার তিন-চার দিন আগে ঘূর্ণিঝড়ের আভাস পাওয়া যেত। কিন্তু এবার একেবারে কম সময়ের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের খবর তাঁরা পেয়েছেন। উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, রাজনীতিবিদ, স্বেচ্ছাসেবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে লোকজন সরানোর কাজ শুরু হয়েছে বলে সভায় জানান তিনি।

সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তর, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর, রেড ক্রিসেন্ট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ঘূর্ণিঝড়কে সামনে রেখে চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত ওষুধও মজুত রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গতকাল বিকেলের মধ্যে ৩৪২ টন চাল ও ৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, মিরসরাই, আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও সীতাকুণ্ড উপজেলায় ১০ টন করে চাল এবং ৫০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট টাকা ও চাল পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে।

ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য ও জরুরি সহায়তার জন্য ৬১১৫৪৫ এই নম্বরে যে কেউ যোগাযোগ করতে পারবে। গতকাল দুপুর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এটি চালু থাকবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ মোকাবিলায় নগরের দামপাড়ায় নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে। সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, দামপাড়া ও সাগরিকা এলাকায় উদ্ধারকারী সরঞ্জাম (এক্সকাভেটর), অ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার মজুত করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, উপজেলায় ৫৮টি আশ্রয়কেন্দ্র আছে। এতে ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে গতকাল দুপুরে বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করেন আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গৌতম বাড়ৈ। রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীর ছনুয়া, খানখানাবাদ, গণ্ডামারাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে নারী-পুরুষেরা রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছেন বলে জানান ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এম হারুনুর রশীদ। গতকাল রাত আটটায় মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণার পর লোকজন ধীরে ধীরে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছে।

বাঁশখালীর ইউএনও কাজী মোহাম্মদ চাহেল তস্তরী বলেন, লোকসংখ্যার তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্র অনেক কম। ১১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য রাতেও তাঁরা মাইকিং করেছেন।

আনোয়ারার বিভিন্ন উপকূল থেকেও রাতে স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতায় ও নিজ উদ্যোগে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছে বলে জানান উপজেলার রায়পুর ইউপির চেয়ারম্যান মো. জানে আলম।

এদিকে গতকাল দুপুরেই চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সৈকত এলাকার দোকানিরা নিজেদের মালামাল নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেন। সৈকত এলাকায় প্রায় ৫০০ দোকান রয়েছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, গত বছর ঘূর্ণিঝড়ে (রোয়ান) সৈকত এলাকার দোকানিদের সব মালামাল ভেসে গিয়েছিল। তাঁরা সবাই আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। তাই এবার আগেভাগেই মালামাল সরিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।