খুলনায় ৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিতে স্বস্তি
খুলনায় সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৫ মিলিমিটার। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর হওয়া ওই পরিমাণ বৃষ্টিই গত ছয় মাসের মধ্যে এক দিনের হিসাবে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। শুধু এক দিনের হিসাবেই নয়, গত ছয় মাসের মধ্যে এমন বৃষ্টি খুলনায় হয়নি। এর আগে ৯ মে মাত্র ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল।
সামান্য ওই বৃষ্টিতেই স্বস্তি ফিরেছে খুলনায়। খাবার পানি তীব্র সংকটে থাকা উপকূলীয় এলাকার মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখেও।
প্রচণ্ড দাবদাহ আর সেই সঙ্গে অনাবৃষ্টিতে ভুগছিল খুলনা। গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত খুলনায় বৃষ্টি হয়েছিল মাত্র ১১ মিলিমিটার। এত কম বৃষ্টিপাত গত ২০ বছরে হয়নি। এর আগে ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত হয়েছিল ২৯ মিলিমিটার।
খুলনা আবহাওয়া কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. আমিরুল আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, খুলনায় এক দিনের হিসাবে গত ছয় মাসের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এ সপ্তাহে থেমে থেমে আরও বৃষ্টি হবে, তবে তা খুব বেশি নয় বা দিনভর নয়। হয়তো মাঝেমধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হতে পারে।
দীর্ঘদিন খুলনায় বৃষ্টি না হওয়ায় পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। একদিকে যেমন বেড়ে গিয়েছিল দাবদাহ, অন্যদিকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল কৃষি। খালে-বিলে কোথাও পানি ছিল না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গিয়েছিল। এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বেড়ে গিয়েছিল লবণাক্ততা। দেখা দিয়েছিল খাবার পানির তীব্র সংকট। বৃষ্টি না হওয়ায় সুন্দরবনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গত ২৫ এপ্রিল গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল খুলনায়।
ওই দিন তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে তাপমাত্র ৩২ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। জীববৈচিত্র্যের যে চেইন সার্কেল থাকে, তা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে পরিবেশের ওপর একধরনের প্রভাব পড়ে। বৃষ্টি সামান্য হলেও পরিবেশের ভারসাম্য কিছুটা হলেও ফিরে আসবে।
২০২০ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের তথ্য সংরক্ষণে আছে খুলনা আবহাওয়া কার্যালয়ে। ওই তথ্যানুযায়ী, বরাবরই অক্টোবর মাসে ৫৩ থেকে ৩২২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। কিন্তু গত বছর অক্টোবরেও খুলনায় বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৯০ মিলিমিটার।
এ ছাড়া ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত খুলনায় বৃষ্টি হয়েছে ২৩৫ মিলিমিটার, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ১৩৫ মিলিমিটার, ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪৫ মিলিমিটার, ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৪১১ মিলিমিটার এবং ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১১ মিলিমিটার। ২০২০ সালের পুরো বছর ধরে খুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে। যেখানে অন্যান্য বছর গড় বৃষ্টি হয়েছে ১৫৫ মিলিমিটার, সেখানে ২০২০ সালে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৩২ মিলিমিটার।
আবহাওয়াবিদ মো. আমিরুল আজাদ বলেন, বিভিন্ন মডেল থেকে দেখা গেছে, এ বছর দেশব্যাপী কম বৃষ্টিপাত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে এমনটা হচ্ছে। বৃষ্টি কম হলে মৎস্য খাত, কৃষি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। তাপমাত্র বাড়বে, বাড়বে বায়ুদূষণও।
খুলনার উপকূলীয় এলাকার মানুষ খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি ও পুকুরের পানি। কিন্তু দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফুরিয়ে গেছে সংরক্ষণ করে রাখা বৃষ্টির পানি, শুকিয়ে গেছে পুকুর। ফলে খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা, কয়রাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছিল। মানুষ যেখানে পানির কথা শুনছিলেন, সেখানেই খাবার পানির জন্য ছুটছিলেন। তবে এ বৃষ্টি তাঁদেরও কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
পাইকগাছা উপজেলার গড়াইখালী ইউনিয়নের কুমখালী গ্রামের শান্ত মণ্ডল বলেন, এলাকায় আগ থেকেই খাবার পানি খুব সমস্যা রয়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় সমস্যা আরও তীব্র হয়েছিল। তবে সকাল থেকে কিছু বৃষ্টি হওয়ায় মানুষ পানি ধরে সংরক্ষণ করে রাখছে। ওই পানি দিয়ে হয়তো কিছুদিন খাবার পানির চাহিদা মিটবে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাও বলছেন সুন্দরবনের প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য বৃষ্টি খুব দরকার ছিল। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় বনের প্রতিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। বনের মধ্যে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। নদীতে বেড়ে গিয়েছে লবণাক্ততা। ওই লোনাপানি পান করে ও প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রাণিকুল অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। অন্যদিকে, বৃষ্টি না হওয়ায় বনের মধ্যে বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেড়ে গিয়েছিল।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, বৃষ্টি না হওয়ায় তরমুজ ও বোরো ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছুদিন আগে এমন বৃষ্টি হলে একদিকে যেমন বোরো ধানের বাম্পার ফলন হতো, অন্যদিকে তরমুজের ফলনও ভালো হতো। বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের সবজি, আউশ ধান ও পাট চাষ শুরু করতে পারবেন।