গাইবান্ধায় ২৩০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি
‘হামার নিজের জমি নাই। কসটো করি জমানি ট্যাকা দিয়া এক বিগে জমি বনদোক নিচি। এবারক্যা তিন হাজার ট্যাকা খরোচ করি আমনের আবাদ করচি। তাক বানে খায়া গেলো। ৬০০ ট্যাকার বেচন (চারা বীজ) কিনি ওই এক বিগেত ধান করচিনো। একন এক বিগেত ধান নাগবার গ্যালে চার হাজার ট্যাকার চারা নাগবে। সে ট্যাকা পামো কোনটে। বানের সমায় চাউল-চিড়া পাচি। কিনতো বেচন পাই নাই।’
কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের চকগয়েশপুর গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন (৫৭)। গতকাল বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, রোপা আমন দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকায় ধানগাছ নুয়ে পড়েছে। কোথাও গাছ পচে গেছে। কোথাও পচে যাওয়া ধানগাছ শুকিয়ে গেছে। পচে যাওয়া ধানগাছের গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোথাও কৃষকেরা পচে যাওয়া ধানগাছ পরিষ্কার করছেন।
সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের কুন্দেরপাড়া গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম (৫৮) বললেন, ‘হামার চার বিগে জমির ভুট্টে, মরিচ নসটো হচে। সোমায় যাবার নাগচে, কিনতো একনো সোরকার থাকি চারা বীজ পানো না। হামরা কিরসোক মানুষ। চাষাবাদ করি খাই। আবার ধান নাগামো ক্যামন করি।’
ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামে গিয়ে একই চিত্র দেখা গেল। গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক জামাল শেখের চার ছেলেমেয়ে। ছয় সদস্যের সংসার। পাঁচ বিঘা জমি চাষাবাদ করেন। এবার চার বিঘায় আমন ও এক বিঘাতে পাট চাষ করেন। পাঁচ বিঘার খেতই বন্যার পানিতে নষ্ট হয়েছে।
জামাল শেখ বললেন, ‘জমিগুলা ছাড়া হামার ঘরে আয়ের পত নাই। হামরা ধানের ভাত খাই, কোসটা (পাট) বেচি দায়দ্যানা মিটাই। কিনতো বানের পানি হামার ঘরে সগকিচু কারি নিচে। একন খামো কী, দ্যানা মিটামো ক্যামন করি। গেরেসতো মানুষ হয়াও হামরা ইলিপ খাবার নাগচি। সোরক্যার চারা সার কিচুই দিলো না।’
এবারের বন্যায় গাইবান্ধা জেলার ২৩০ কোটি টাকার ফসল ক্ষতি হয়েছে। বেশি ক্ষতি হয়েছে রোপা আমন। কিন্তু সরকারিভাবে কৃষি পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্র জানায়, বন্যায় গাইবান্ধার সাতটি উপজেলার ২৭ হাজার ১৬৭ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। এর মধ্যে আমন ২৬ হাজার ৮৬৮ হেক্টর, আমন বীজতলা ১৫১ হেক্টর, শাকসবজি ১৪৮ হেক্টর।
কৃষি পুনর্বাসনে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আ কা ম রুহুল আমিন গতকাল দুপুরে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল বিকেল পর্যন্ত কৃষি পুনর্বাসনে সরকারি কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তবে এ পর্যন্ত জেলার ৭৫০ জন কৃষককে ধানের চারা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকে এক বিঘা পরিমাণ জমিতে ধান রোপণ করতে পারবেন। এ ছাড়া বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকদের মাষকলাইসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।