জলাবদ্ধতা থেকে যেন মুক্তি নেই চট্টগ্রামবাসীর

মুষলধারে বৃষ্টি। সড়কের বিভিন্ন স্থানে জমেছে পানি। ভোগান্তিতে পড়েছে পথচারীরা। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের বন্দরটিলা ইপিজেড এলাকায়।  ছবি: সৌরভ দাশ
মুষলধারে বৃষ্টি। সড়কের বিভিন্ন স্থানে জমেছে পানি। ভোগান্তিতে পড়েছে পথচারীরা। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের বন্দরটিলা ইপিজেড এলাকায়। ছবি: সৌরভ দাশ

বন্দরনগর চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখগাথা হয়ে আছে জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুমে ভারী কিংবা অল্প বৃষ্টিতে নগরের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে, এই নিয়তি একপ্রকার মেনে নিয়েছে নগরবাসী। এমনকি বৃষ্টি না থাকলেও অনেক সময় জোয়ারের পানিতেও ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার, হাসপাতালসহ বসতবাড়ি ডুবে যাওয়ার ঘটনা এখানে নৈমিত্তিক। গত রোববার ও মঙ্গলবার নতুন করে এই দুর্ভোগে পড়লেন চট্টগ্রামবাসী।

নগরবাসীর পুরোনো এই সমস্যা নিরসনের দায়িত্ব ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। কিন্তু সংস্থাটি রুটিন কাজের বাইরে তেমন পদক্ষেপ না নেওয়ায় জলাবদ্ধতা সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। 

এ অবস্থায় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সিটি করপোরেশনকে পাশ কাটিয়ে নগরের প্রধান সমস্যা দূর করতে বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প ওই বছরের আগস্টে অনুমোদন পায়। 

তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। ব্যয় হয়ে গেছে ১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। এখন মেয়াদ বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। ব্যয়ও বাড়বে। প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হলেও পানিতে ডুবে যাওয়ার দুর্ভোগ থেকে রেহাই মিলছে না নগরের লোকজনের। 

এ বছরও জলাবদ্ধতার সমস্যা পুরোপুরি দূর হচ্ছে না, তা অনেকটা নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা পুরোপুরি নিরসন হবে না। 

জানতে চাইলে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ও সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে খাল পরিষ্কার, নতুন নালা নির্মাণ ও পুরোনো নালা সম্প্রসারণের কারণে পানি বেশিক্ষণ জমে থাকে না। আর নগরের জলাবদ্ধতাপ্রবণ ২২টি পয়েন্টকে চিহ্নিত করে দ্রুত পানিনিষ্কাশনের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গঠন করা হয়েছে কুইক রেসপন্স টিম। প্রকল্পের সব কাজ শেষ হলে চট্টগ্রামে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। 

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ জোয়ারের পানি। বৃষ্টির সময় জোয়ার থাকলে অবস্থা ভয়াবহ রূপ নেয়। গতকালও একই ঘটনা ঘটেছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সাড়ে ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে ভারী বর্ষণ শুরু হয় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত। দেড় ঘণ্টার এই বৃষ্টিতে নগরের বাকলিয়া, প্রবর্তক মোড়, চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট, হালিশহর, সরাইপাড়া, চকবাজার, ডিসি রোড, কাপাসগোলা, চাক্তাই, আছদগঞ্জ, খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।

সরেজমিন 

মেঝেতে হাঁটুপানি। ভাসছে ব্যবহৃত গ্লাভস, মাস্ক, পলিথিন, গজ ব্যান্ডেজসহ নানা কিছু। শয্যার ওপর পা গুটিয়ে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছেন রোগী ও স্বজন। 

নগরের আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে গতকাল দুপুরের চিত্র এটি। রোববারের পর গতকাল আবার ডুবল হাসপাতালটি। দুপুরের মুষলধারার বৃষ্টিতে হাসপাতালটির নিচতলার শিশু ওয়ার্ড, প্রশাসনিক ব্লক, অভ্যর্থনা এবং বহির্বিভাগের বিভিন্ন কক্ষ হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়।

এই হাসপাতালের নতুন ভবনে এখন কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পুরাতন ভবনে অন্যান্য রোগী রয়েছেন। নিচতলায় শিশুস্বাস্থ্য বিভাগে গতকাল অন্তত ৩০ জন রোগী ছিল। ১২টার পর থেকে পানি ওঠা শুরু হয়।

হাসপাতালের পরিচালক নুরুল হক বলেন, ‘এটা প্রতিবছরের চিত্র আমার। পানি উঠে কত জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। এর স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।’

বৃষ্টিতে এই হাসপাতালের মতো নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকাও পানিতে ডুবে যায়। 

সরেজমিনে নগরের আছদগঞ্জ এলাকায় দেখা যায়, পানি ঢুকে গেছে কয়েকটি দোকান ও গুদামে। হামিম এন্টারপ্রাইজ নামে দোকানে কলা, আখ ভিজে একাকার। পানির মধ্যে নিরুপায় দাঁড়িয়ে আছেন দোকানি। পাশে জসিমের গুদামেরও একই চিত্র। তাঁর এখানে কলাসহ বিভিন্ন ফল ভিজে গেছে।

আছদগঞ্জ থেকে যত সামনে চাক্তাইয়ের দিকে এগোনো যায়, ততই পানি বেশি। পানি ঢুকেছে চাল, ডাল, মসলা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন গুদামে।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি ও সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য আলী আশরাফ প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের যে অগ্রগতি, তাতে এ বছর তেমন সুফল পাওয়া যাবে না। করোনাসহ নানা কারণে প্রকল্পের কাজের গতিও ছিল কম। তাই এবার বেশি কিছু আশা করলে মানসিক কষ্টের কারণ হবে। তবে মানুষকে স্বস্তি দিতে হলে কাজের গতি আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।