ডাহুক ছানা

ডাহুক ছানারা দেখতে এ রকমই হয়
ডাহুক ছানারা দেখতে এ রকমই হয়

ছিটকার ঘন ঝোপটা ঘিরে দারুণ হইচই করছে পাঁচ-সাতজন ছেলে, দৌড়াদৌড়ি-হুড়োহুড়ি করে দুর্ভেদ্য ঝোপটার ভেতর থেকে কিছু একটা ধরতে চাইছে। ছিটকাগাছের ডালপালা ভীষণ শক্ত, ঝোপগুলোও হয় দারুণ ঝোপালো। আশপাশের ঝোপ থেকে মাঝে মাঝেই ত্রস্ত পাখায় লাফিয়ে উঠছে একটা পাখি, অনেকটাই পোষা মুরগির মতো ‘কক্ কক্’ ডেকে ওই ঝোপটার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়ছে আবার নিচের দিকে। অনেক লোকই খালপাড়ে দাঁড়িয়ে গেছে, সবাই উৎসুক ও কৌতূহলী। মান্ডা খালপাড়ের পশ্চিম কিনারা ধরে একটি হাঁটা পথ সোজা উত্তরে চলে গেছে; মিশেছে কদমতলা ব্রিজের কাছে। এখানে এক বৃদ্ধ বললেন, মায়ের কোল ওরা খালিই করে দিল, একটি মাত্র বাচ্চা ছিল, তা-ও আজ বুঝি ধরা পড়ে! বলতে না-বলতেই বালকদের উল্লাসধ্বনি! একজনে দুই হাতের মুঠি উঁচু করে ধরে ছুটে আসছে রাস্তার দিকে, পেছনে অন্যরা। মুঠিতে চেপে ধরা কালো রঙের পাখিটা। পেছনের ঝোপের মাথায় মা পাখিটার অস্থির ওড়াউড়ি আর কান্নার ডাক। চতুর ও ভিতু পাখি ওটা। উড়ছে, আবার চুপ করে নিচে পড়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। একটি মাত্র বাছাকে কেড়ে নিল ওরা!
রাস্তায় উঠতে উঠতে ছেলেটি ওর হাতের দুমুঠি একটু শিথিল যেই-না করেছে, অমনি কুচকুচে ছানাটা লাফ দিল, পড়ল রাস্তার ঢালুতে, তারপরে এক দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে পড়ল বিপরীত দিকের একটা ঘাসবনের ভেতর, পানি এখানে বেশি। আর কি ধরা যায়!
এই কুচকুচে ছানাটা ছিল আমাদের এক কালের বহু পরিচিত পাখি ডাহুকের। রাজধানী ঢাকার পূর্ব প্রান্তের মান্ডা খালটি উত্তর দিকে এগিয়ে যেখানে কদমতলা খালে মিশেছে, ঘটনাটি ওখানকারই কাছাকাছির। মান্ডা খালপাড় ধরে আমার যাতায়াত ওদিকটায়। মান্ডা এলাকার জলাজমিতে এবার আমি মোট তিন জোড়া ডাহুকের মোট ১৪টি ছানা দেখি। বাঁচতে পারেনি একটাও। যদিও ছিটকা ও অন্যান্য ঝোপ ও জলাভূমি মিলে এলাকাটা ডাহুকের আদর্শ আবাসভূমি। ঘটনাস্থল থেকে পূর্ব দিকে মান্ডার শেষ মাথা পর্যন্ত দূরত্ব খুব বেশি নয়। আমার ধারণা, ওদিক থেকেই এই ডাহুকমাতা পাঁচটি ছানা নিয়ে এদিকটায় চলে এসেছিল নিরাপত্তার জন্য। চমৎকার ঝোপ ছিল, ছিল খাবারও, তবু চারটি খোয়া গেছে। যেটি পালাল, সেটিকে খুঁজে নেবে ওর মা, বাঁচাতে পারবে কি!
একসময় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে ডাহুক ছিল, রাতের বেলায় শোনা যেত ওদের করুণ-বিষণ্ন ডাক। লোকজনের বিশ্বাস ছিল, ডাকতে ডাকতে গলায় রক্ত তুলে ডিমে না মাখালে ডিম ফুটে ওদের ছানা হবে না। ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। ডাহুক ছিল আমাদের নিত্য প্রতিবেশী, মানুষের উঠোন-বাড়িতেও চলে আসত। ডাহুক ছিল ডোবানালায়। ডাহুক ছিল ঝোপঝাড়ে। আজ কমে গেছে। তবু ঢাকার শহরতলির বা খোদ রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের কোথাও কোথাও ওদের দেখা মেলে পূর্ণ বর্ষায়, কোথাও আছে ওরা স্থায়ীভাবে। সাদাকালো রঙের এই পাখিটির ছানারা হয় কুচকুচে কালো। বেজায় চালাক আর দৌড়বিদ ছানারা আত্মগোপনে পারদর্শী, পুরো শরীরটাই তুলতুলে নরম। বয়সী পাখির ওজন হয় ১৯০ গ্রাম। সদ্যোজাত ছানার ওজন হয় গড়ে আট গ্রাম। ডাহুকের মূল খাদ্য জলজ কচি ঘাসের ডগা-পাতা, পাকা ধান ইত্যাদি। ডিম পাড়ে পাঁচ-সাতটি। ফোটে ২০-২৪ দিনে। এককালে পোষা ডাহুক দিয়ে বুনো ডাহুক শিকার করা হতো গ্রামবাংলায়। শিকারি ডাহুক চড়া মূল্যে বিক্রি হতো। ডাহুক ডাকা গ্রাম আজও আছে, আছে ডাহুকের বসবাস-উপযোগী পরিবেশ, খাদ্যাভাবও নেই, তবু কেন যে কমে গেল পাখিটি! মান্ডা খালপাড়ের পলাতক ছানাটি বেঁচেবর্তে থাক—এ কামনা করি।
ডাহুকের ইংরেজি নাম White-breasted waterhen। বৈজ্ঞানিক নাম Amaurornis phoenicurus। মাপ ৩২ সেন্টিমিটার।