বিরল তুরমতি বাজ

রাজধানীর সোবহানবাগের ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের টাওয়ারে এক জোড়া তুরমতি বাজ। গত ১৬ এপ্রিল তোলা ছবি l লেখক
রাজধানীর সোবহানবাগের ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের টাওয়ারে এক জোড়া তুরমতি বাজ। গত ১৬ এপ্রিল তোলা ছবি l লেখক

প্রাণিবিদ রওশনের আমন্ত্রণে গত ১৬ এপ্রিল বিকেল চারটায় সোবহানবাগে ওর অফিসের কাছে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে উঠলাম। সঙ্গে ভারতীয় বন্ধু বিশিষ্ট বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী দেব আনন্দ পাল। আকাশ পরিষ্কার ও ঝলমলে, তবে বাতাসের বেগ বেশি থাকায় ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। আকাশে যত পাখি উড়ছিল তারা যেন ভারসাম্য রাখতে পারছিল না। হঠাৎ করেই আমাদের পেছন দিকের একটি উঁচু দালান থেকে মাঝারি আকারের একটি শিকারি পাখি দ্রুতগতিতে উড়ে এসে পাশের সুউচ্চ টাওয়ারটির চূড়ায় গিয়ে বসল। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখতেই দেখলাম, বেশ আয়েশ করে শিকার করা একটি চড়ুই পাখি খাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আরেকটি পাখি একই টাওয়ারে শিকার নিয়ে বসল। টাওয়ারে সেদিন সর্বমোট পাঁচটি পাখি এসেছিল। টাওয়ারটিতেই ওদের বাসা। তবে বাচ্চারা বড় হয়ে যাওয়ায় বাসা ছেড়ে পাশের আরেকটি উঁচু দালানে থাকে। তবে সব সময়ই টাওয়ারে আসা-যাওয়া করে।
এটি আমাদের দেশের এক বিরল পাখি তুরমতি বাজ (Red-necked Falcon, Red-headed Falcon or Red-headed Merlin)। তুরমুতি বা শিরেল পাখি নামেও পরিচিত। Falconidae পরিবারের দুঃসাহসী বাজটির বৈজ্ঞানিক নাম Falco chicquera। বাংলাদেশে পাখিটি বিরল হলেও বর্তমানে বিশ্বে প্রায় সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত।
তুরমতি মাঝারি আকারের পাখি। ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত লম্বায় ৩১-৩৬ সেন্টিমিটার। ওজনে পুরুষ ১৩৯-১৭৮ ও স্ত্রী ১৯০-৩০৫ গ্রাম। স্ত্রী পাখি পুরুষ পাখির চেয়ে বড় হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঘাড় ও মাথা পোড়ামাটির মতো লাল। ছাই-সাদা বুকে ছোট ছোট কালো ছিট। সাদা পেটে আড়াআড়ি চিকন কালচে দাগ। লেজের আগা কালো। পিঠ ধূসর, তার ওপরে নীল রঙের পলিশ করা। চোখ বাদামি। চোখের চারদিক, পা ও আঙুল হলুদ। নখ কালো। ঠোঁট হলুদ ও আগা কালো।
সারা দেশেই দেখা মেলে। শহরে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া কৃষিজমি ও পত্রঝরা বনাঞ্চলেও আছে। সচরাচর জোড়ায় থাকে। ইলেকট্রিক বা অন্যান্য টাওয়ারের উঁচুতে অথবা গাছের মগডালে বসে শিকার খোঁজে। মূলত ভোর ও সাঁঝের বেলা জোড় বেঁধে শিকার করে। বাতাসি, চড়ুই, বাদুড়, ইঁদুর ও ব্যাঙ পছন্দের খাবার।
জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রজননকাল। সচরাচর খুব উঁচু বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের টাওয়ার, পানির ট্যাংকের তলদেশ ও উঁচু তাল, নারকেল প্রভৃতি গাছে কাক, চিল প্রভৃতির পরিত্যক্ত বাসায় তিন-চারটি ডিম পাড়ে। স্ত্রী ডিমে ৩২-৩৫ দিন তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। বাবা শিকার করে আনে ও মা সেই শিকার ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাচ্চারা প্রায় ৪৮ দিনে স্বাবলম্বী হয় ও নীল আকাশে ডানা মেলে।