বড় প্রাণী বিলুপ্তির পথে বাড়ছে ছোট মাছ

আকারে বড়, চামড়া মোটা ও গায়ে-গতরে শক্তিশালী—এমন প্রাণী একসময় বাংলাদেশে নিরাপদেই ছিল। এখন তারা বেশ বিপদেই আছে। গত ১০০ বছরে এ দেশ থেকে বিলুপ্ত হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে গন্ডার, বুনো মহিষ থেকে শুরু করে বারো শিংওয়ালা হরিণ। তবে ছোট আকারের প্রাণীর অবস্থা তুলনামূলক ভালো। বিশ্বজুড়ে বিলুপ্তির পথে থাকা কুঁচিয়া ও মলা মাছ বাংলাদেশে বাড়ছে।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) থেকে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য প্রতিবেদন ২০১৯’–এ বাংলাদেশ বিষয়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মূলত জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যচক্রের চিত্র তুলে ধরতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদন তৈরিতে বিশ্বের ৯১টি দেশের ১ হাজার ৩০০ গবেষক যুক্ত ছিলেন। ২৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষা পর্যালোচনাও করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিসংক্রান্ত জিনগত সম্পদ কমিশন। প্রতিবেদনে বিশ্বের জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ার কারণগুলোর ৫৭ শতাংশই মানুষের সৃষ্টি। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ, জীববৈচিত্র্যের বেড়ে ওঠার এলাকা ধ্বংস বা কমে যাওয়া, পরিবেশদূষণ ও ভূমির ধরনের বদল।
বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির বলেন, ‘বড় প্রাণীদের বিচরণ ও বসবাসের জন্য বড় এলাকার দরকার হয়, যা দেশে মানুষের চাপ ও নানা তৎপরতার কারণে ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। তবে আমরা ইতিমধ্যে শকুন, বাটাগুড় বাস্তা কাছিম, নোনাপানির কুমিরের মতো প্রাণীদের রক্ষায় উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছি। আশা করি অন্য প্রাণীগুলো রক্ষার কাজেও সাফল্য পাব।’
মলা মাছ ও কুঁচিয়ায় সাফল্য
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মলা’ মাছ ও ভাসমান সবজি বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের পুষ্টি আর প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে মলা মাছে জৈব ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, আয়রন ও জিংক ব্যাপক পরিমাণে রয়েছে। বাংলাদেশের ৪০ লাখ পুকুরে বছরে গড়ে ১০ কেজি করে মলা উৎপাদিত হয়, যা দেশটির ৫ বছরের নিচে ৬০ লাখ শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া বাংলাদেশে উৎপাদিত মাছের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ ছোট ও মাঝারি আকৃতির। এগুলোর পুষ্টিমান বড় মাছের চেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুই প্রজাতির কুঁচিয়ার উৎপাদন বাড়ছে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ওই প্রাণী জনপ্রিয় খাদ্য। কিন্তু এর উৎপাদনের জন্য যে ধরনের মাটি ও জলাভূমির দরকার হয়, তা পৃথিবী থেকে কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বাঘা কুঁচিয়া ও মাটির কুঁচিয়া চাষ দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে এই দুই ধরনের কুঁচিয়ার পরিমাণ কমে আসছে। অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে এই প্রাণী পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাভূমিপ্রধান এলাকায় ভাসমান সবজির বাগানের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে কৃষিজমি কমে আসায় জলাভূমিনির্ভর ওই সবজি চাষ দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এটি পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছে এবং বাণিজ্যিকভাবেই লাভজনক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা যে কটি কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ নিয়েছি, তার মধ্যে অন্যতম সফল হচ্ছে ভাসমান সবজি ও কুঁচিয়া চাষ। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কয়েকটি গ্রামকে আমরা কুঁচিয়া গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করেছি। এগুলো বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।’
কমছে বড় প্রাণী
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জলজ ও ছোট প্রাণীরা অপেক্ষাকৃত ভালো থাকলেও বড় আকৃতির প্রাণীদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। গত ১০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে গন্ডার ও মহিষের বেশ কটি প্রজাতি এবং হরিণের কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া পাখির মধ্যে বড় আকৃতির ময়ূরও এখন আর নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খানের হিসাবে, গত ১০০ বছরে ১৫টি বন্য প্রাণী বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডোরাকাটা হায়েনা, ধূসর নেকড়ে, ধীরগতির ভালুক, বারো শিংওয়ালা হরিণ, কৃষ্ণমৃগ, বুনো মহিষ, সুমাত্রার গন্ডার, জাভার গন্ডার, ভারতীয় গন্ডার, ভারতীয় ময়ূর, ডাহর ইত্যাদি। ১৯৩০ সালে গোলাপি মাথার হাঁস বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় বিশ্ব থেকেও হারিয়ে গেছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের বৈশ্বিক বন্য প্রাণীদের অবস্থাবিষয়ক প্রতিবেদন ‘রেড লিস্ট’ অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ১৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ১০ প্রজাতির পাখি ও ২ প্রজাতির উভচর প্রাণী মহা বিপন্ন অবস্থায় আছে। এদের মধ্যে বেঙ্গল টাইগার ও হাতির মতো বড় প্রাণীরই সংখ্যা বেশি। দেশে বর্তমানে ১০৬টি বেঙ্গল টাইগার ও আড়াই শ হাতি আছে।
অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশই বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণীদের সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছে। যেমন চীন পান্ডাকে বিলুপ্তির কাছাকাছি থেকে ফিরিয়ে এনেছে। দ্রুততার সঙ্গে প্রাণীগুলো বিলুপ্ত হলেও তাদের সংরক্ষণের উদ্যোগ ততটা জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া বন্য প্রাণীদের আবাসস্থলগুলো নানা ধরনের শিল্পায়ন, মানুষের চাপসহ বিভিন্ন কারণে ধ্বংস ও দূষিত হয়ে উঠছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনেরও যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ হচ্ছে না। প্রকৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাই গুরুত্ব বাড়াতে হবে।