২০১৫ সালের দিকে আমার ফিল্ড গাইডের পাণ্ডুলিপি তৈরির সময় লতাজবার ছবি তুলতে গিয়েছিলাম বলধা গার্ডেনের সিবিলি অংশে। বলা যায়, এই প্রথম ফুলটির সঙ্গে পরিচয়। বাগানের মাঝামাঝি দূরত্বে ডান পাশের সীমানাদেয়াল লাগোয়া পাম্প হাউসের পাশে একটি গাছে ডালপালা বেয়ে ঝুলে আছে কয়েকটি শক্ত লতা।
ফুলগুলো আরও ওপরে। সাধারণ জবা থেকে আকারে ছোট, তবে দেখতে অনেকটা একই রকম। পাতা ও ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কয়েকটি ফুল খুঁজে পেলাম। ভালোভাবে না তাকালে ফুলগুলো চোখে পড়ত না। দেখে খুব আনন্দ হলো। ছেলেবেলা থেকে বিচিত্র রঙের জবার কত যে রকমফের দেখেছি, কিন্তু ফুলটি আবার লতানো গাছে হতে পারে কখনো ভাবিনি! আনন্দিত হওয়ার পাশাপশি কিছুটা শঙ্কিতও হলাম গাছটির জীর্ণদশা দেখে।
কাষ্ঠললতার কাণ্ডজুড়ে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। মনে হচ্ছিল মৃত্যুর প্রহর গুনছে গাছটি। যেকোনো মুহূর্তে বলধা গার্ডেনের দুর্লভ উদ্ভিদের সংগ্রহ থেকে হারিয়ে যেতে পারে গাছটি। এমন দুর্ভাবনা থেকেই ২০০৫ সালের দিকে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের বোটানিস্ট শামসুল হক গাছটির কয়েকটি কলম করে বোটানিক্যাল গার্ডেনে রোপণ করেন। কিন্তু সে গাছগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
কয়েক বছর আগে লতাজবার একটি কলম সংগ্রহ করে বৃক্ষ–অন্তঃপ্রাণ যায়েদ আমীনকে পাঠালে তিনি গাজীপুরের শ্রীপুরে তাঁর বৃক্ষাশ্রমে সেটি রোপণ করেন। গাছটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। এ বছর জানুয়ারি মাসে তিনি ফুলের কয়েকটি ছবি পাঠিয়ে রীতিমতো চমকে দিলেন।
এত দ্রুত ফুল ফুটেছে! কয়েক দিন পর সরেজমিন ফুলটি দেখার সুযোগ হলো। এপ্রিল মাসে বান্দরবানের লামায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বাগানেও ফুলটি আবার দেখার সুযোগ হলো।
লতাজবা (Hibiscus fragrans) ছোট গুল্ম বা কাষ্ঠল আরোহী। বাহন পেলে অনেক উঁচু গাছেও দিব্যি উঠে যেতে পারে। প্রচলিত ইংরেজি নাম ফ্রাগ্রান্ট হিবিসকাস। স্থানীয় নাম কিনুর্লুর বা কাইনুলুর। পরিবার মালভাসিই। গাছের গুঁড়ি ২০ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট হতে পারে। কচি কাণ্ড এবং পত্রবৃন্ত তারকাকৃতির।
পাতা ২ থেকে ৭ সেন্টিমিটার লম্বা বৃন্তযুক্ত, ফলক ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার, ডিম্বাকার, অখণ্ড ও হৃৎপিণ্ডাকার। ফুল সুগন্ধি, কাক্ষিক অথবা প্রান্তীয় যৌগিক মঞ্জরিতে সজ্জিত। দলমণ্ডল আড়াআড়িভাবে প্রায় ৪ সেন্টিমিটার, পাটলবর্ণের এবং একটি ফ্যাকাশে হলুদ কেন্দ্রবিশিষ্ট সাদা ও সুগন্ধিযুক্ত। ফুলের পাপড়িসংখ্যা ৫, বিডিম্বার ও শীর্ষ গোলাকৃতি। ফল বিদারী ও ক্যাপসিউল আকৃতির, প্রতি প্রকোষ্ঠে ২ মিলিমিটার চওড়া বীজের সংখ্যা দুই থেকে তিনটি।
ফুল ও ফলের মৌসুম নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ-এর তথ্যমতে, লতাজবা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক আবাসে জন্মে। তবে নিজস্ব আবাসে গাছটি যে দুর্লভ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মূলত ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় বনাঞ্চলে লতাজবার বসবাস। ভারত, মিয়ানমার ও চীনে প্রাকৃতিক আবাসেই লতাজবা জন্মে। এ গাছের বাকল থেকে একধরনের তন্তু পাওয়া যায়। বিলুপ্তি থেকে রক্ষা পেতে গাছটির চারা-কলম বিভিন্ন উদ্যানে রোপণ করা যেতে পারে।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক