পানিসংকটাপন্ন বরেন্দ্র এলাকায় বিধিনিষেধ অনেকটাই কাগজে

পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় ৩ জেলার ১৫৩ ইউনিয়নকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলেও বিধিনিষেধ কার্যকর হয়নি।

পান ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের জন্য বাড়ি থেকে দূরের একটি গভীর নলকূপ থেকে বালতিতে পানি সংগ্রহ করছেন এক পরিবারের সদস্যরা। গত ১৪ এপ্রিল রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোন্দাইল গ্রামেছবি: শফিকুল ইসলাম

খাওয়ার পানি ছাড়া নতুন নলকূপ বসানো যাবে না। সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে, অধিক পানিনির্ভর ফসলের চাষ সীমিত করতে হবে এবং নতুন করে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর কিছু এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করে এমন ১১টি বিধিনিষেধ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি সুপেয় পানি, ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নদী-খাল-পুকুর পুনঃখনন কর্মসূচির নির্দেশনাও দেওয়া হয়। পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে বরেন্দ্র এলাকায় তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়। সেচ ও খাওয়ার পানির অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। এ কারণে তিন জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আট মাস পরও মাঠপর্যায়ে এসব বিধিনিষেধের কার্যকর প্রয়োগ আশানুরূপ দেখা যাচ্ছে না।

প্রজ্ঞাপনে খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন

১৫৩ ইউনিয়ন সংকটাপন্ন

গত বছরের আগস্টে জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় তিন জেলার পানি পরিস্থিতি নিয়ে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) সমীক্ষা উপস্থাপন করা হয়।

সমীক্ষায় ৩ জেলার ২৫ উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ৪৭ ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা অতি উচ্চ, ৪০ ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা উচ্চ এবং ৬৬ ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজা মধ্যম পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়।

পরে এ বছরের ২২ জানুয়ারি ‘পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা আদেশ (সংশোধিত)’ গেজেট প্রকাশিত হয়। ঘোষিত ইউনিয়ন ও মৌজাগুলোকে গেজেট প্রকাশের দিন থেকে পরবর্তী ১০ বছরের জন্য পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়।

উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকায় জলাশয় ইজারামুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
মো. আল মামুনুর রশীদ, নির্বাহী প্রকৌশলী, বিএমডিএ
আরও পড়ুন

কী কী নিষেধ, হচ্ছে কী

প্রজ্ঞাপনে খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। ফসল বাছাইসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দুই বছরের মধ্যে সেচে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর নতুন শিল্প বা প্রতিষ্ঠানও নিষিদ্ধ। খাল, বিল, পুকুর ও নদীর শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দেওয়া যাবে না। খাস জলাশয় ও জলমহাল ইজারা দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নদী, জলাশয় ও জলাভূমিতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ। অধিক পানিনির্ভর ফসল সীমিত করে পানিসাশ্রয়ী ফসলের আবাদ বাড়াতে হবে। বিধিনিষেধ লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তবে অনেক স্থানে পানিসাশ্রয়ী ফসলের আবাদ বাড়ানো বা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে কৃষকদের উৎসাহিত করা সম্ভব হচ্ছে না। যেমন নওগাঁর সাপাহার উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন আইহাই, গোয়ালা, সাপাহার, শিরণ্ডী ও তিলনা অতি উচ্চসংকটাপন্ন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, তিলনা ও সাপাহারে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট তীব্র হলেও বাকিগুলোতে সংকট তীব্র নয়।

এদিকে এখনো পুকুর বা খাল ইজারামুক্ত করে বিকল্প সেচে ব্যবহারের সুযোগ হয়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সাড়ে ছয় হাজারের মতো পুকুর আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০টি সংস্কার করা হয়েছে। তবে এগুলো সেচের বিকল্প উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকায় জলাশয় ইজারামুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

যেসব এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু এলাকা মোটেও সংকটে নেই বলে স্থানীয় অনেক প্রকৌশলী ও কৃষিবিদের মত।
আরও পড়ুন

এলাকা চিহ্নিতকরণ নিয়ে প্রশ্ন

যেসব এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু এলাকা মোটেও সংকটে নেই বলে স্থানীয় অনেক প্রকৌশলী ও কৃষিবিদের মত। যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজা মধ্যম পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকার একদিকে পদ্মা এবং অন্যদিকে মহানন্দা নদী বয়ে গেছে। ওই এলাকায় স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সংকটাপন্ন এলাকা নিয়ে মতবিনিময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিএমডিএর একজন কর্মকর্তা বলেন, এসব এলাকায় ১০ ফুট খুঁড়লেই পানি পাওয়া যাচ্ছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। তাহলে ওই এলাকা সংকটাপন্ন হয় কীভাবে?

এ অঞ্চলে বড় আকারে সেচকাজ পরিচালনা করে বিএমডিএ। তাদের অধীন সেচ এলাকায় অনেক ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম মেনে নিয়ন্ত্রণ চলছে। কিন্তু বেসরকারি বা ব্যক্তিগত সেচে নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৭২ হাজার হেক্টর বিএমডিএর সেচের আওতায়। বাকিটা ব্যক্তিগত সেচের অধীনে। এসব এলাকা সংকটাপন্ন হলেও ব্যক্তিগত সেচ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করেন পানিবিশেষজ্ঞ চৌধুরী সারোয়ার জাহান। কিছু এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। আমরা আমাদের পদ্ধতি অনুসরণ করে এটা করেছি। এটা নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে।’

আরও পড়ুন

দায়িত্ব বহু সংস্থার, জবাবদিহি কার

প্রজ্ঞাপনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএমডিএ, কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনসহ বহু প্রতিষ্ঠানকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দায়িত্ব অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করা হলেও এককভাবে জবাবদিহির কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হয়নি। বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, এ ক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব বিএমডিএর। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়ক হিসেবে থাকবে।

পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার সংকটের গভীরতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। তবে বিকল্প পানির উৎস, অর্থায়ন, তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কার্যকর না হলে শুধু গেজেটের ঘোষণা ভূগর্ভস্থ পানির পতন ঠেকাতে পারবে না বলে মনে করেন সারোয়ার জাহান।