সাক্ষাৎকার: গোলাম সারোয়ার টিপু

বিশ্বকাপে এবার ইউরোপের কোনো দল চ্যাম্পিয়ন হতে পারে

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে এবারের আয়োজনের অতিথি বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব গোলাম সারোয়ার টিপু। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের ফুটবলার হওয়ার গল্প আর জীবনের নানা বাঁকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।

আনিসুল হক:

 আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে। প্রথম আলোর এই বিশেষ আয়োজনে আমরা বাংলাদেশের পথিকৃৎদের সাক্ষাৎকার নিয়ে থাকি, তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা শুনি, সেই আলোয় নিজেদের পথকে উজ্জ্বল করার চেষ্টা করি।

 বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুমে আজ উপস্থিত আছেন একজন প্রথিতযশা ফুটবল খেলোয়াড়, ফুটবল কোচ। যিনি অল পাকিস্তান ফুটবল দলে খেলেছেন, আবাহনীর অধিনায়ক হিসেবে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন। তিনি ২০১৯ সালে ‘রূপচাঁদা-প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার-২০১৮’ আজীবন সম্মাননা পেয়েছিলেন। আমাদের সঙ্গে আজ আছেন বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব গোলাম সারোয়ার টিপু। টিপু ভাই, আপনাকে স্বাগত জানাই।

 গোলাম সারোয়ার টিপু: ধন্যবাদ আপনাকে।

আনিসুল হক:

এই অনুষ্ঠানে আমরা গল্প করি, শৈশবের কথা শুনি, জন্মের কথা শুনি। আপনার জন্ম একটু আগে আমরা শুনছিলাম ১৯৪৪ সালের ২৩ অক্টোবর। আপনি তো একদম টাইমও বলতে পারেন, বলেন।

গোলাম সারোয়ার টিপু: প্রথমে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই, আমাকে এভাবে এই একটা ব্যাপারে ইনভল্ভ করবেন, এটা আমি বুঝতে পারিনি। যাহোক, আমার জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৩ অক্টোবর সোমবার সকাল সোয়া ১০টায়। এটা আমি জানতে পেরেছি, কারণ আমার বাবা ডায়েরি লিখতেন। আমার ওপরেই শুধু। ওই ডায়েরিটা শুধু আমার ওপরেই, আমি কখন ঘুমাচ্ছি...

আনিসুল হক:

 আপনার জন্ম হলো বরগুনায়, সেটা আপনার নানার বাড়ি।

গোলাম সারোয়ার টিপু: নানার বাড়ি।

আনিসুল হক:

আর আপনার আব্বা, ওনার নামটা একটু বলবেন।

 গোলাম সারোয়ার টিপু: এ এম গোলাম মোস্তফা, আবু মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। গোলাম মোস্তফা।

আনিসুল হক:

 আর আপনার আম্মার নাম?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: আম্মার নাম নূরজাহান বেগম।

আনিসুল হক:

  তো আপনার আব্বা তো পুলিশে ছিলেন।

 গোলাম সারোয়ার টিপু: আব্বা পুলিশে ছিলেন, হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

 যখন আপনার জন্ম হলো ওই সময় আপনার আব্বার পোস্টিং কোথায় ছিল?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: এটা হলো রাজাপুর। রাজাপুর পুলিশ স্টেশন। ওই অঞ্চলেই।

আনিসুল হক:

আর আপনাদের দাদার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

 গোলাম সারোয়ার টিপু: ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আনিসুল হক:

  সেখানে আপনার শৈশব কখনো কাটেনি?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: না। ওইখানে কখনো পারমানেন্টলি থাকার কোনো স্কোপ নেই। বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া হয়েছে, এই–সেই আরকি।

আনিসুল হক:

 তো আপনার প্রাইমারি স্কুল কোনটা হলো?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: প্রাইমারি স্কুল হলো রাধাবল্লভ প্রাইমারি স্কুল। এটা হলো মানিকগঞ্জে। আব্বার বদলির কারণে নানান জায়গায় আমার ঘুরতে হয়েছে। তো ওইখানে রাধাবল্লভ প্রাইমারি স্কুলে প্রথম...

আনিসুল হক:

আপনি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়েন তখন কি আপনি দৌড়াতেন, খেলতেন, সাঁতার কাটতেন?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: এমন কিছু নেই যে না করতাম। দৌড়াতাম, সাঁতার কাটতাম, ঘোড়ায় চড়তাম।

 তারপরে যে...

আনিসুল হক:

ঘোড়া পেলেন কোথায়? মানিকগঞ্জে এখনো আছে মনে হয়।

 গোলাম সারোয়ার টিপু: হ্যাঁ, মানিকগঞ্জে ঘোড়া আছে। আর তারপরে যে আপনার ইয়েতে ঘোড়া থাকত তো, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ঘোড়া থাকত না? ওই যে মফস্সলে যাওয়ার জন্য। নৌকা থাকত, ঘোড়া থাকত, ঘোড়ার গাড়ি থাকত, এই–সেই আরকি।

আনিসুল হক:

মনে পড়ে হাইস্কুলটা কোথায়?

গোলাম সারোয়ার টিপু: হাইস্কুল ঢাকায়। ফিফটি সিক্সে যখন ঢাকায় আসি তখন তেজগাঁও হাইস্কুলে প্রথম আমি সেভেনে ভর্তি হই এবং এখান থেকেই আমার ম্যাট্রিকুলেশন সিক্সটি টু-তে।

আনিসুল হক:

  ওটাকে তখন তেজগাঁও পলিটেকনিক হাইস্কুল বলত।

গোলাম সারোয়ার টিপু: তেজগাঁও পলিটেকনিক হাইস্কুল বলত।

আনিসুল হক:

আপনাদের বাড়ি তখন ফার্মগেটেই।

গোলাম সারোয়ার টিপু: ফার্মগেটে। বাড়ি মানে কি আমরা ভাড়া বাসায় থাকতাম।

আনিসুল হক:

 তখনকার ঢাকাটা কেমন ছিল? ফার্মগেট কেমন ছিল? আমি তো দেখিনি, কল্পনা করি।

গোলাম সারোয়ার টিপু: আচ্ছা, তখন ফার্মগেট থেকে আপনার দুই আনা দিয়ে গুলিস্তান চলে যাওয়া যেত বাসে। আর এখান থেকে প্রায়ই দেখতাম যে এক ঘোড়ার গাড়িতে দশ–বারোজন প্যাসেঞ্জার নিয়ে গাড়ি গেল। ফার্মগেটে এখন যেখানে এই যে চৌরাস্তা যেটা আরকি, এখানে পুলিশ বক্সটা যেখানে আছে, এখানে দাঁড়ালে তখন এয়ারপোর্ট ছিল… কুর্মিটোলা এয়ারপোর্ট।

 সারা দিনে হয়তো তিনটা–চারটা প্লেন নামতে দেখতাম, উঠতে দেখতাম। আর বিশ মিনিট পরপরই একটা বাস আসতে দেখতাম, ওই মহাখালী থেকে ছেড়ে আসত। আমরা রাস্তার মাঝখানে বসে গল্পসল্প করতাম, এ রকম ছিল আরকি।

আনিসুল হক:

  আমি তো ঢাকা শহরে এসেছি ধরেন প্রথম ’৭৮ সালে। আমার মনে আছে যে এই যে

  আপনার কী বলে বাস, বেগুনবাড়ী এসব জায়গায় তো বিল ছিল। কিন্তু আমাদের কারওয়ান

  বাজারেও ওই এলাকাতে কী অবস্থা ছিল তখন?

গোলাম সারোয়ার টিপু: এখন যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, ওইখানে এই রাস্তাটাকে তো ময়মনসিংহ রোড বলত তখন। কারওয়ান বাজারের ভেতর দিয়ে রাস্তা ছিল শুধু। আর ভিআইপি রোডটা কিন্তু সিক্সটি ওয়ানে হলো। রানি আসবে, তখন আযম খান বাংলাদেশের গভর্নর, উনি সোজা করলেন রাস্তাটা। যাহোক এখন যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, এখানে মাটির হাঁড়ি… তারপরে বাঁশ নিয়ে নৌকা বাঁধা থাকত। আর এ পাশে থাকত তেজগাঁও থানার নৌকা, এই রাস্তার এই পাড়ে যেখানে এখন এই যে বাগানের মতো করছে না একটা?...ওপাশ থেকে কোত্থেকে আসত ওই ঘাসি নৌকা আরকি। ওগুলোর মধ্যে আপনার এই যে মাটির হাঁড়ি, বাঁশ তারপরে এই সব জিনিস, তারপরে ভেজিটেবলস, মিষ্টিকুমড়া এগুলো…। আর এদিকে থাকত ওই তেজগাঁও থানার নৌকা এবং ওই প্যাসেঞ্জার টানাটানি করত এখান দিয়ে, ভেতর দিয়ে কোথায় যেত। আমি তখন আমার অত খেয়ালও নেই; কিন্তু নৌকা ওখানে আমি দেখেছি।

আনিসুল হক:

 তারপর আপনার কলেজ কোথায়?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: কলেজ ঢাকাতেই। জগন্নাথ কলেজ।

আনিসুল হক:

  জগন্নাথ কলেজ থেকে আপনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সিক্সটি ফাইভে। সাবজেক্ট নিয়েছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান?

গোলাম সারোয়ার টিপু: সোশিওলজি।

আনিসুল হক:

 সমাজবিজ্ঞান নিলেন। তারপরে তো খেলার...

 গোলাম সারোয়ার টিপু: হ্যাঁ, আমার পার্সেন্টেজ নষ্ট হয়ে গেল। ওই যে তখন...মানে

আমি নিজেকে…

আনিসুল হক:

আপনি মোটামুটি ভালোভাবে পেশাদার যদি না–ও বলি ক্লাব ফুটবল খেলতে শুরু

  করলেন কত সালে?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: সিক্সটি ফোর। তার মানে ২০ বছর বয়সে। সিক্সটি থ্রি বলি আমি। সিক্সটি থ্রিতে আমি তেজগাঁও ফ্রেন্ডস...আমি তেজগাঁও যেহেতু থাকতাম। তেজগাঁও তখন সেকেন্ড ডিভিশন টিম। তেজগাঁও কিন্তু একসময় খুব ভালো টিম ছিল, ফার্স্ট ডিভিশনে ছিল। তখন সেকেন্ড ডিভিশনে। তো সেকেন্ড ডিভিশনে আমাকে আরকি দিনেশ দত্ত আমার স্কুলের টিচার… অসম্ভব অমায়িক ভদ্রলোক। বাংলা গ্রামার, ইংলিশ গ্রামার এবং বাংলা সাহিত্য পড়াতেন আরকি। উনি আমাকে এই ফোর্স করলেন যে ‘টিপু খেলো।’ তেজগাঁও স্কুলের পক্ষে একটা ম্যাচ খেলছিলাম আগে। তারপরের ম্যাচে উনি আমাকে খেলতে দেননি। বললেন যে ‘তুমি ব্যথাট্যথা পাইবা।’ উনি কি মনে করতেন, খুব আদর করতেন আরকি! বললেন যে বড়রা খেলত তো, বললেন যে ‘এখানে খেলে ইনজুরিটিঞ্জুরি হইতে পারে, খেলো না।’ কিন্তু তেজগাঁও ফ্রেন্ডসে আবার বললেন যে ‘এখানে খেলো।’ সিক্সটি থ্রিতে প্রথম খেললাম সেকেন্ড ডিভিশনে এবং সিক্সটি ফোরে ফার্স্ট ডিভিশন, বিজি প্রেস। এখানে একটা ইতিহাস আছে।

অল পাকিস্তান ফুটবল দলে খেলেছেন প্রথিতযশা ফুটবলার গোলাম সারোয়ার টিপু
ছবি: প্রথম আলো
আনিসুল হক:

  ফার্স্ট ডিভিশন বিজি প্রেস?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: বিজি প্রেস। তখন ওই ইপিজি প্রেস ছিল। আচ্ছা, পাকিস্তান হওয়ার আগে কিন্তু এটা বিজি প্রেসই ছিল, বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেস। পাকিস্তান হওয়ার পরে ইপিজি প্রেস হলো, আবার এখন তো বিজি প্রেস। আমি ঘটনাটা বলি… আমি কিন্তু মাঠে গেলাম কিন্তু রাইট ব্যাক খেলার জন্য। এক ঘোড়ার গাড়িতে আমরা পুরো টিম। এখন যেখানে ভাসানী স্টেডিয়াম, হকি স্টেডিয়াম, এইখানে ছিল চার নম্বর মাঠ। এখানেই সেকেন্ড ডিভিশনের খেলা হতো। আমি প্র্যাকটিস করি তো আমাকে সোনা ভাই...আমি সব পজিশনে খেলতাম। সোনা ভাই, যিনি সিনিয়র মোস্ট প্লেয়ার এবং কোচ; সোনা ভাই, হ্যাঁ। সোনা মিয়া আরকি। উনি ফার্স্ট ডিভিশনের প্লেয়ার ছিলেন একসময়। তখন সেকেন্ড ডিভিশনে খেলেন তেজগাঁওয়ে। ওরাই অর্গানাইজ করত টিমটা। আমি যখন যাই, তখন সেকেন্ড ডিভিশনে; আমি ওই আগে থেকেই জানতাম আমাকে রাইট ব্যাক খেলানো হবে। তো গেলাম। যাওয়ার পরে ওইখানে কড়ইগাছ ছিল অনেক। এখন তো চিন্তাও করা যায় না যে কী অবস্থা। যাহোক, তো কড়ইগাছের নিচে আমরা পুরো টিম দাঁড়ালাম। ওইখানেই চেঞ্জ করলাম, সবকিছু করলাম। তো তখন এগারোজন কিন্তু কোনো চেঞ্জ টেঞ্জ ছিল না তো। জার্সি দিত যে দুই নম্বর হলো রাইট ব্যাক, তিন নম্বর হলো লেফট ব্যাক, এই রকম। তো আমাকে সোনা ভাই, টিপু...আমি তো মহাখুশি যে খেলছি আমি। কিছুক্ষণ পরেই বলল, টিপু তোমার জার্সি দাও। যেই বলছে টিপু তোমার জার্সি দাও, আমার চোখ দিয়ে পানি পড়া শুরু করছে। কারণ, প্রথম ম্যাচ খেলব তেজগাঁও সেকেন্ড ডিভিশনের। আমি ভাবলাম আমি আর চান্স পাচ্ছি না। পরে একটু পরে বলল যে এটা নাও। মিনিট পাঁচেক পরে বোধ হয়। আমি কিন্তু গাছের আড়ালে গিয়ে চোখ দিয়ে পানি...হাউমাউ করে তো কান্দা যায় না। তো বলল যে এটা নাও। ওটা দেখি এগারো নম্বর। এগারো মানে লেফট উইঙ্গার। তো চিন্তা করেন আমি রাইট ব্যাক খেলতে গেলাম, সেইখানে আমার লেফট উইং।

আনিসুল হক:

 এই যে আপনি লেফট উইঙ্গার হলেন, আজীবন লেফট উইঙ্গার।

গোলাম সারোয়ার টিপু: লেফট উইঙ্গার। এর কারণ হলো ওই যে একজন বয়স্ক লোক ছিল, যিনি সোনা ভাইয়ের বন্ধু।উনি লেফট উইঙ্গার খেলার কথা। উনি ঘুম থেকে উঠতে পারেনি যে জন্য উনি যাননি। এ জন্য প্লেয়ার শর্ট দেখে এখন আমার জায়গায় অন্য একটা— জহির বলে একটা ছেলে খেলল, আর আমি লেফট উইঙ্গার। এখন এইখানে কেন পারমানেন্ট হয়ে গেল লেফট পজিশনটা। ওই সোনা ভাই লেফট ইনসাইড ফরোয়ার্ড খেলতেন। সুন্দর সুন্দর বল থ্রো দিতেন। খেলার পরে ওই এক ভদ্রলোক ছিলেন ওয়ান্ডারার্সের সাপোর্টার। ওয়ান্ডারার্স তো তখন দুর্দান্ত টিম।

 উনি সাদা পায়জামা, সাদা ওই হেমন্ত মুখার্জি যে রকম শার্ট পরতেন, ফুল শার্ট পকেটওয়ালা ও–রকম একটা পকেট হাতে একটা লাঠি...ছাতি। এই নিয়ে সব মাঠে ঘুরতেন আর সব খেলাই দেখতেন উনি। উনি আইসা সোনা ভাইরে… উনি সোনা ভাইরে চেনে আগে থেকে। উনি বলছেন, সোনা এই ছেলেটা কে? বলে যে কেন? ভালো, ভালো ফ্যামিলির ছেলে। তখন তো একটা ইয়ে ছিল যে কারা খেলে এই ধরনের ফ্যামিলিগত একটা প্রবলেম টোবেলেম ছিল। অনেকে মনে করত ভালো ফ্যামিলির ছেলেপেলেরা আসে না খেলায়। তো সোনা ভাই আমার ডিটেইলসটা বলছে। উনি আমারে দশ টাকার একটা নোট দিল। দশ টাকা দিয়া বলল বাবা তুমি নিজেকে সুস্থ রাইখো, চরিত্রটা ঠিক রাইখো। সোনা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল। আমি নিতে চাই না, সোনা ভাই ইশারা করলেন যে নাও। এই যে উনি সার্টিফিকেট (দিলেন)… উনি মানে খুব ওয়ান্ডারার্সের দারুণ রকমের সাপোর্টার; অর্গানাইজারদের ভেতরে একজন ছিলেন। সোনা ভাই কয় টিপু তোমার পার্মানেন্ট পজিশন হয়ে গেল। তুমি এখানেই খেলবে। এই...

আনিসুল হক:

 তারপর আপনি পাকিস্তান ন্যাশনাল টিমে ডাক পেলেন। কিন্তু আপনি এই ডিগ্রি পাস করলেন কীভাবে, কোত্থেকে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আর পার্সেন্টেজ হচ্ছে না।

গোলাম সারোয়ার টিপু: পার্সেন্টেজ হচ্ছে না দুবার করে গেছি। তারপর আমাকে আব্বা বলল তোমার তো বয়স হয়ে গেছে, চাকরিবাকরি পাবে না তো। তো এক বছর আমি এবং প্রতাপদা সেম কেস। প্রতাপ শংকর হাজরা আরকি। তখন জগন্নাথ কলেজে আমি কিন্তু ফ্রি পড়তাম। ওইখানে নূর হোসেন স্যার ছিলেন, উনি ওই প্লেয়ারদের নিয়ে...সাইদুর রহমান সাহেব ছিলেন এই যে...হাবিবুর রহমানের বাবা, হ্যাঁ উনি প্রিন্সিপাল ছিলেন। যাহোক ওই ফ্রি এক নম্বর, দুই নম্বর হলো ওইখানে অটোমেটিক আমার অ্যাডমিশন হয়ে গেল এবং স্যার আমার তো কয় আসো আসো। এই প্রতাপদা আর আমি দুজনে বোধ হয় ওইখানে ভর্তি হলাম। তারপর ওখান থেকে ডিগ্রি পাস করলাম। ’৭২ সনে জয়েন করলাম সোনালী ব্যাংকে।

আনিসুল হক:

 এখন আমরা ন্যাশনাল টিমে যাওয়ার গল্পটা শুনি। প্রথম কি আপনি ইরানে গেলেন?

গোলাম সারোয়ার টিপু: বিদেশে ইরানে। এমনে হোমে খেলছি রাশিয়া থেকে টিম আসছিল তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন।

আনিসুল হক:

তখন অল পাকিস্তান টিমে বাংলাদেশের ওই প্রথম টিমে কয়জন ছিলেন মনে আছে আপনার?

গোলাম সারোয়ার টিপু: আমি সিক্সটি সেভেনের ডিসেম্বরে চান্স পাইলাম। ওই জন্য আমার ব্লেজারে কিন্তু সিক্সটি সেভেন। ডিসেম্বরেই ইয়ে হলো। করাচিতেই প্রথম ম্যাচটা হলো। করাচিতে আমারে খেলাইল না, আমি মুলতানে খেললাম। এখানে আমরা ছিলাম। আমি ছিলাম, প্রতাপদা ছিল, পিন্টু ভাই। তারপর জাকারিয়া পিন্টু... তারপর হলো হাফিজ ভাই স্পিকার, শান্তু। শহিদুল ইসলাম শান্তু না। শাহিদুর ইসলাম শান্তু, রংপুর। আমার খুবই প্রিয় গোলকিপার। আমরা দুজনে একসঙ্গেই চান্স পেলাম।

গোলাম সারোয়ার টিপু আজীবন সম্মাননার চেক হাতে। ২০১৯ সালে ‘রূপচাঁদা-প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার-২০১৮’ আজীবন সম্মাননা পান তিনি
ফাইল ছবি
আনিসুল হক:

তারপর ইরানে গেলেন মনে আছে?

গোলাম সারোয়ার টিপু: হ্যাঁ, ইরানে সিক্সটি নাইনে। ওইখানে ফ্রেন্ডশিপ কাপ টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলাম। ফ্রেন্ডশিপ কাপ মানে আপনার পাকিস্তান, ইরান, টার্কি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে টিম ছিল।

আনিসুল হক:

আপনার পেছনে আপনার একটা চমৎকার ছবি দেখা যাচ্ছে। অনেকগুলো ছবি দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে একটা কোট পরা ওপরে গলায়, এটা মনে হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন?

গোলাম সারোয়ার টিপু: না না, এইটা ইরান। ইরানেও এত বরফ পড়ত নাকি?

আনিসুল হক:

খুব সুন্দর। আপনি তো অত্যন্ত সুদর্শন ছিলেন। আপনি কি সিনেমা করতেন?

গোলাম সারোয়ার টিপু: হ্যাঁ, অভিনয় করছি এক সিনেমায়।

আনিসুল হক:

থিয়েটারও করেছেন, মঞ্চে করেছেন।

গোলাম সারোয়ার টিপু: মঞ্চে অভিনয় করেছি...

আনিসুল হক:

 কত সালের দিকে হবে?

গোলাম সারোয়ার টিপু: এটা ফিফটি এইট, ফিফটি নাইন, সিক্সটি—এই সিক্সটির পরে আর আমি ওই স্টেজে বা এগুলোতে যাইনি। তখন এই বলের ইয়েটা পুরাদমে...

আনিসুল হক:

আর একটা যে সিনেমা করলেন শিশু অভিনেতা হিসেবে নাম কী?

গোলাম সারোয়ার টিপু: ‘আকাশ আর মাটি’, ফতেহ লোহানী ডিরেক্টর ছিলেন। সুমিতা দেবী নায়িকা ছিলেন। আর প্রবীর কুমার ভারতীয় একজন উত্তমকুমারের চুলটুলের ভাবটা ওই উনি ছিলেন নায়ক আর আমিনুল হক মারা গেলেন বছর দেড়েক আগে, উনি ছিলেন হলো নায়কের ছোট ভাই। আমি ওই নায়কের ছোট ভাইয়ের রোলটা করছিলাম। আর আপনি চিনবেন, সাজু যে ক্রিকেট প্লেয়ার ছিল না, ফাস্ট বোলিং করত; ও ছিল আমার বড় ভাইয়ের রোল করছে। প্রবীর কুমারের রোলটা আরকি ছোটবেলার রোলটা ও করছে আর আমি করছি আমিনুল হকের ছোটবেলাটা। এই। তারপর আপনি বারবার নায়ক নায়ক বলছেন, আমি নায়ক ছিলাম না, নায়ক সাজু ছিল।

গোলাম সারোয়ার টিপু তাঁর ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প আর জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
আনিসুল হক:

না আপনি এখনো নায়কই আছেন। আপনি আমাদের নায়ক। তো ’৭২ সালে আপনাকে কি আবাহনীতে ডেকে নিল?

গোলাম সারোয়ার টিপু: হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

প্রথম ফুটবল টিম যখন হলো, তখন আপনাকে নিল নাকি?

 গোলাম সারোয়ার টিপু: হ্যাঁ, প্রথম আবাহনী।

আনিসুল হক:

কোথায়?

গোলাম সারোয়ার টিপু: ইকবাল স্পোর্টিং সেভেন্টিতে সেকেন্ড ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন হলো, মানে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলবে। সেভেন্টি ওয়ানে তো আর খেলা হলো না। সেভেন্টি টুতে তারা যখন খেলবে, মোহাম্মদপুরের টিম তো ওদের ফান্ডিংয়ে নানা অসুবিধা হচ্ছিল। নন বেঙ্গলদের টিম ছিল। তখন শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুবান্ধবরা চিন্তা করলেন যে এই টিমটাকে নেওয়া যায় কি না? তখন অ্যাপ্রোচ করার সঙ্গে সঙ্গে বলছে ঠিক আছে। তখন আবাহনী নাম দিয়ে ওদের একটা সাংস্কৃতিক সংঘ ছিল। নানা ধরনের অ্যাকটিভিটি করত। স্পোর্টসে এল ওই সময় আবাহনী ক্রীড়া চক্র নাম দিয়ে।

 এটা হলো ফুটবল টিম। ইস্পাহানির হকি টিমটাকে করল হকি আর আদমজীর ক্রিকেট টিমকে করল আবাহনী ক্রিকেট, এই তিনটে তিন জায়গা থেকে।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

 আপনি স্বাধীন বাংলাদেশেও তো জাতীয় দলে খেললেন।

 গোলাম সারোয়ার টিপু: না।

আনিসুল হক:

 স্বাধীন বাংলাদেশে আপনাকে জাতীয় দলে নেয়নি? তখন তো আপনি...

গোলাম সারোয়ার টিপু: নেয় নাই না। আমি চান্স পাওয়ার উপযুক্তই ছিলাম সেভেন্টি থ্রিতে, প্রথম টিম হলো মারদেকায় গেল ন্যাশনাল টিম। এমনিতে সেভেন্টি টুতে ঢাকা ইলেভেন নাম দিয়ে বরদলোই ট্রফি খেলতে গেল, ওইটাতে আমি ছিলাম। বরদলোই ওইটা বাংলাদেশের বাংলাদেশ টিমই কিন্তু ওইটা তো বাংলাদেশ টিম বলা যায় না ঢাকা ইলেভেন নাম দিয়ে গেল। অফিশিয়ালি সেভেন্টি থ্রিতে যখন ন্যাশনাল টিম যায় মারদেকাতে, আমি সেভেন্টি টুতে ব্যথা পেলাম হাঁটুতে। এ জন্য আমি আই ওয়াজ নট ইন শেপ। এ জন্য এটা আমার কোনো রিগ্রেট নেই।

আনিসুল হক:

বিয়ে হলো কত সালে?

গোলাম সারোয়ার টিপু: সেভেন্টি ফোরের ফার্স্ট মার্চ।

আনিসুল হক:

ভাবির নাম কী?

গোলাম সারোয়ার টিপু: কাজী মমতাজ আগে ছিল মমতাজ বেগম, এখন আমার নামের সঙ্গে সারোয়ার লাগাইছে আরকি। কাজী মমতাজ সারোয়ার।

আনিসুল হক:

আচ্ছা, বিয়ের আগে আপনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়নি?

গোলাম সারোয়ার টিপু: না, আমি তাকে দেখেছি রুসমতের সময়। এর আগে তাকে দেখিও নাই। এই শব্দটা কী বলেন? রুসমত, ওই যে দেখানো হয় না, ওই যে ঘোমটাটোমটা দিয়ে তাকে দেখায়; এরপর কি জানি আয়নাটায়না লাগায় না বিয়ের আসরে; হ্যাঁ, আমি অবশ্য … এভাবেই দেখছিলাম। এরপর ওই তখন তাকে দেখলাম।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

এত দিন সুখে–দুঃখে একসঙ্গে আছেন।

গোলাম সারোয়ার টিপু: হ্যাঁ, আছি।

আনিসুল হক:

আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন?

গোলাম সারোয়ার টিপু: আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে স্কলাস্টিকার টিচার। ছোট মেয়ে সানিডেলের টিচার ছিল কিন্তু ওর বিয়ে হয়ে গেছে ওই মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। ও শিপে ভয়েজে যাওয়ার পরে স্কুল আর কন্টিনিউ করতে পারেনি।

আনিসুল হক:

 সিঙ্গাপুর নাকি?

গোলাম সারোয়ার টিপু: না, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হাজবেন্ডের সঙ্গে শিপে যাইতে হইত তো। ওই একবার দুটি ভয়েজ করছে। এরপর ছেলে হওয়ার পরে আর যায়নি।

আনিসুল হক:

  আর আপনার পুত্রসন্তান?

গোলাম সারোয়ার টিপু: স্কটল্যান্ডে থাকে, ও ওখানে গভর্নমেন্ট জব করে। 

আনিসুল হক:

 আপনি তো বাংলাদেশ দলের ফুটবল দলের নানা ধরনের কোচ হয়েছিলেন জাতীয় দলের, বয়সভিত্তিক দলের। এখন আপনি আমাদেরকে বলেন আপনার এই যে খেলোয়াড়ি জীবনের আর খেলোয়াড়দের বন্ধুত্ব। খেলোয়াড় হয়তো এই যে এত দিন ধরে ফুটবল দেখছেন। আপনার সবচেয়ে প্রিয় বাংলাদেশি ফুটবলার কে?

গোলাম সারোয়ার টিপু: মারিদা। চিন্নু মং চৌধুরী মারি। উনি লেফট ইনসাইড ফরোয়ার্ড ছিলেন।

আনিসুল হক:

কত সালের দিকে খেলতেন?

গোলাম সারোয়ার টিপু: এটা… উনি বোধ হয়… ওনার জন্ম কিন্তু কুয়াকাটার… এখানে মং আসলে মগ। … আমি ওনার থেকে বেটার বাঙালি কোনো প্লেয়ার দেখিনি। যে যত বড় লেকচার দিক, আমার চোখে আরকি এটা।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

আর আমি তো বলছিলাম যে আমি যেহেতু রংপুরের; শান্তু, ওনাকে আমরা দেখতাম হরলিক্সের বিজ্ঞাপন করছেন। আপনি বলছিলেন রণজিৎ দা; রণজিৎ দাস … অসম্ভব ভদ্র মানুষ একজন…উনি আপনার প্রিয় গোলকিপার?

গোলাম সারোয়ার টিপু: বেস্ট গোলকিপার আমার দেখা। হাইট কিন্তু বেশি না, আমার মতোই।

আনিসুল হক:

আর এই খেলোয়াড়ের জগতে আপনার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু কে?

গোলাম সারোয়ার টিপু: এটা এভাবে বলা খুব ডিফিকাল্ট। কায়কোবাদ আমার খুব কাছের। কায়কোবাদের সঙ্গে খুব মনের মিল হতো। এমনি অনেকের সঙ্গেই আমার কোনো ঝগড়াঝাঁটি বা কোনো আর্গুমেন্ট—এ রকম হয় নাই যে তা নয়, কিন্তু ও–রকমের কিছু না; হয়তো আমার পিছন থেকে খারাপ বলে না ভালো বলে, সেটা আমি জানি না; কিন্তু আমার সামনাসামনি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে মোটামুটি ভালো রিলেশন। তো কায়কোবাদ হলো মানে উই কুড রিড ইচ আদার।

আনিসুল হক:

 এখন খেলোয়াড় বন্ধু পাঁচ–ছয়জন–সাতজন এ রকম নাই যে একসঙ্গে হন এখনো, নাকি সবাই...

গোলাম সারোয়ার টিপু: এখন প্রতাপদা আমার থেকে বয়সে বড় কিন্তু প্রতাপদা আমারে তুই তুই করে বলে, আমারে অনেক সময় গালাগালিও করে কিন্তু ভেতরে ভেতরে রেসপেক্টও করে এটা আমি বুঝি। এইটা প্রতাপদা আমার খুব কাছের মানুষ একজন। আর হলো পিন্টু ভাই আমার থেকে বড়। পিন্টু ভাই একটু ডিস্টেন্স মেইনটেইন করতেন। আর শান্তু ভাই ছিলেন, পাইলটের বাবা। রাজশাহীর।

আনিসুল হক:

 পরবর্তীকালে বাংলাদেশ তো আমরা আমাদের ছোটবেলায় আবাহনী–মোহামেডান নিয়ে তো পাগল ছিলাম। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ছিল। ওই যুগের খেলোয়াড়দের কেমন লাগে। সালাউদ্দিন ভাই, বাদল, আসলাম...

গোলাম সারোয়ার টিপু: আমি আপনাকে একটা কথা বলি যে আমরা ওই জীবনের সোনালি যুগের অমুক প্লেয়ার, নামটাম, এই সেই… যেমন মারিদার কথা… অনেকে হয়তো পছন্দ করে না…

  মোমেন মুন্না, আসলাম… এরা আমাদের থেকে মানে ওয়ার্কলোড… যখন ওরা খেলছে; আমাদের থেকে তারা ওয়ার্কলোড বেশি নিয়েছে। এখন আমরা যদি বলি আমরা বেটার ছিলাম, এটা বলা একেবারেই বোকামি। উচিতই না বলা। কারণ, আমরা প্রথম শুরু করেছি সেভেন্টি মিনিটের খেলা। ৭০ মিনিটে ৩৫+৩৫, মাঝে ৫ মিনিট ব্রেক। তারপর এল ৮০ মিনিট। এখন তো ৯০ মিনিটের, এটা ফিক্সড আরকি। এখন ওরা আমাদের থেকে মাঠে ডিসটেন্স কাভার করে অনেক বেশি এবং তাদের এন্ডুরেন্স লেভেল আমাদের থেকে বেশি এবং খেলার পেস অনেক বেড়ে গেছে তো এখন। ওই আন্ডারমাইন্ড করার কোনো কারণ নেই। আমাদের থেকে তারা খারাপ খেলছে—এটা বলাই যাবে না; এটাও বলা যাবে না, তারা আমাদের থেকে বেটার।

আনিসুল হক:

 আর এখন বাংলাদেশের যে টিম বাংলাদেশ তো বেশ ভালো করছে।

গোলাম সারোয়ার টিপু: বেশ ভালো করছে। এটার কারণ হলো আমরা কয়েকটা ছেলে পাইছি এই যে বাইরে থেকে যারা আসছে, এদের ভেতর সবাই যে খুব কোয়ালিটি কিন্তু; তিন–চারটা ছেলে রিয়ালি কোয়ালিটি এবং তারা অলআউট মানে তারা প্রাণটা দিয়ে দেয় বাংলাদেশে। এটা আমার ভালো লাগে। জামাল, এরপরে আইয়াজ। আইয়াজ হলো আপনি চিনবেন শরীফুল একটা ছেলে ছিল মোহামেডানে খেলত, ঝাঁকড়া চুল। ফর্সা মতো আইয়াজ কিন্তু ওর ছেলে। আমি জানতাম না এটা। সেকেন্ড জেনারেশন খেলতে আসছে, হ্যাঁ আইয়াজের খেলা দেখার জন্য শরীফ আমেরিকা থেকে চলে আসছিল।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

 আচ্ছা আর আমরা তো এখন বিশ্বকাপের সিজনে আসছি—এই প্রশ্ন তো করতেই হবে, এবার কে চ্যাম্পিয়ন হবে বলে আপনার মনে হচ্ছে?

গোলাম সারোয়ার টিপু: এই মুহূর্তে বলা ডিফিকাল্ট, প্রিলিমিনারি। হ্যাঁ, তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে ইউরোপ থেকে হবে।

আনিসুল হক:

আমার মনে হয়, ফ্রান্স অথবা স্পেন হয়ে যেতে পারে। তিন নম্বর সম্ভাবনা আমি দেখি আর্জেন্টিনা। এই তো। আর্জেন্টিনা তিন নম্বরে; কিন্তু ফ্রান্স ও স্পেনের বেশি চান্স; আর আমি মনে করি যে আমেরিকা অনেক দূর পর্যন্ত যাবে।

  গোলাম সারোয়ার টিপু: …তো দুর্দান্ত খেলেছে এ জন্য; বিভিন্ন জাতির প্লেয়াররা ওখানে সমবেত হয়েছে।

আনিসুল হক:

 হ্যাঁ, আমি চাই ব্রাজিল ভালো করুক; কিন্তু করবে এই কনফিডেন্স পেলাম না।

গোলাম সারোয়ার টিপু: ব্রাজিলের হয় কি, ওরা ওই খেলাটাকে খেলা হিসেবেই খেলে, এই হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস। এ জন্য এক জায়গায় আননেসেসারি একটা …বানাইতে যায়; যেটা অনেকক্ষণ আগেই ছেড়ে দেওয়া যায়, সেটাকে একটু কায়দা করে। যেমন নেইমার ব্যথাগুলো পায় কেন জানেন? …হ্যাঁ আননেসেসারি হোল্ড করে। কারণ, ওর অ্যারোগেন্স তো; ও তো বল নিয়ে ওর কাছ থেকে বৈধভাবে কেউ নিতে পারবে না, ফলে মাইর দিয়ে দেয়।

  এইটা তো এখন ওরা খেলার জন্য খেলতে আইসা এত দিন যাবত পারছে না; তবে এবার কিন্তু আনচেলত্তি অন্য মানুষ তো, অন্য জিনিস; কিন্তু কোনো দেশই এখন পর্যন্ত বিদেশি কোচ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়নি, তো এখন ও হলো আবার বিদেশি কোচ। এখন ওইটাই তো ও বলছে। আবার ওরে যখন প্রশ্ন করা হয়েছে, বলছে যে প্রথম শুরু তো হইতে পারে—এটা এভাবে বলছে আর কি। তার পরও আপনি… ইউ আর রাইট ফ্রান্স এবং স্পেন, একটা মানে ইয়ে হইতে পারে—একটা অঘটন হয়ে যেতে পারে। বলা যায় না পর্তুগালের মিডফিল্ডটা কিন্তু দুর্দান্ত এ বছর।

আনিসুল হক:

  উৎপল শুভ্র আশা করে যে নেদারল্যান্ডস দুইবার ফাইনালে গেছে একবারও পায় নাই, যদি পায় তো খারাপ কি!

গোলাম সারোয়ার টিপু: না, সেটা ঠিক আছে, নেদারল্যান্ডস তো সেভেনটি ফোরে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে, তারা দুর্দান্ত। রুথ গুলিথ নামে একজন যে ছিলেন। রুথ গুলিথ আরও পরে, ওরা ওই রুথ গুলিথের সময় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হলো।…৮৮–তে রুথ গুলিথ দুর্দান্ত প্লেয়ার ছিল; কিন্তু ও হলো… নেদারল্যান্ডস ওই ফাইনালে যায়।

আনিসুল হক:

আচ্ছা এখন আরেকটা প্রশ্ন আছে। সেটা হচ্ছে, আপনার জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার সময়ে আপনি যেদিন রিটায়ার করলেন, ওই দিনের গল্পটা একটু যদি বলেন।

গোলাম সারোয়ার টিপু: এটা হলো সেভেনটি এইটের বা সেভেন্টি সেভেনের ডিসেম্বর বোধ হয়। সেভেনটি সেভেনের ডিসেম্বর, সেভেনটি সেভেনে রিটায়ার করলাম আর কি। তো মুক্তিযোদ্ধা দল গঠিত হবে স্ট্রেট অ্যাওয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলবে। টিমে ওইটা তখন তো থার্ড ডিভিশন পাইওনিয়ার। খেলে আসতে হইত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। এটা অন্য রকমের একটা প্রায়োরিটি পাইল। পিন্টু ভাই ওটা মোটামুটি অর্গানাইজ করার দায়িত্বে ছিলেন; তো কলকাতা থেকে ক্যালকাটা মোহামেডান এল। তিনটি এক্সিবিশন মানে চ্যারিটি ম্যাচ খেলবে! প্রদর্শনী ম্যাচ। হ্যাঁ, প্রথমটা খেলবে মোহামেডানের সঙ্গে; দ্বিতীয়টা খেলবে আবাহনীর সঙ্গে; আর তৃতীয়টা ঢাকা ইলেভেন। আমার আব্বা সেভেনটি সেভেনের দোসরা নভেম্বর মারা যাওয়ার পরে …আমার হি ওয়াজ মাই বেস্ট ক্রিটিক। তো আসলে—আজকে তো তোমার এটা ভালো হয় নাই; ওই পাসটা ঠিক হয় নাই—এই রকম; এভাবে বলে যেত আরকি। যাহোক আমার এমনিও বয়স হয়ে গেছে। ইয়ে আমি খেলা ছাইড়া দেব তো। আমি গজনবী ভাইকে—নাম তো শুনছেন, গজনবী মোহামেডানের দুর্দান্ত প্লেয়ার ছিলেন। আমি বললাম, গজনবী ভাই আমি আর ইয়ে, এই আমারে যদি অ্যালাউ করেন। কয়, ঠিক আছে টিপু কর রিটায়ার। ঠিক আছে, আমি ওই খেলা খেলতে গেলাম তো। কথা ছিল আমার হাফ টাইম পর্যন্ত আমি খেলব। তারপর মুসাব্বের—ওরা তখন আসছে কেবল।

  বাদল রায় এরা, সব মানে নতুন টিম গঠনের জন্য। ৪০ মিনিট না ৪৫ মিনিটের খেলা ছিল, আমি বোধ হয় ৩০–৩২ মিনিট পর্যন্ত খেলছি। এর মধ্যে আমার একটা পাসে এলাম, গোল করল। এক গোলে আমরা লিড নিলাম। লিডটা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গজনবী ভাই আমারে ডাক দিয়া বলল, টিপু তোরে আমি উঠাইনি? আর আমি বুঝলাম সে কেন বলতেছে। আমি বললাম, ঠিক আছে গজনবী, নো প্রবলেম। তারপর দেখলাম, কারে জানি, ইয়ং মুসাব্বের না কারে জানি ওয়ার্ম–আপ করাল এসে; তো প্রেসিডেন্ট জিয়া তখন গ্যালারিতে ছিলেন। উনি খেলা দেখতে এসেছিলেন। …আমার শোনা কথা… উনি (প্রেসিডেন্ট) বলছেন যে, আরে এই লোক, এই ছেলে এত ভালো খেলছিল, তাকে উঠাল কেন? আমার পাসে গোল; আর তো ভালোই খেলছি। তখন সবাই প্রেসিডেন্টকে বলেছে, স্যার, বয়স হইছে আপনি জানেন না। ও কিন্তু অনেক সিনিয়র প্লেয়ার। প্রেসিডেন্ট বলেন, তাতে কী হয়েছে, হি ওয়াজ প্লেয়িং ওয়েল। প্রেসিডেন্টকে জানানো হয়, যে আজকে আমার ফেয়ারওয়েল ম্যাচ।

আনিসুল হক:

 এর পরে আপনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেলেন।

  গোলাম সারোয়ার টিপু: আমি তো আর খেলব না। আমি মোহামেডান ক্লাবে দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া করতাম। ব্যাংক থেকে আইসা ওখানে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করতাম।

 আমি, কায়কোবাদ আর কে কে…এর মধ্যে এনএসসি থেকে—এনএসসি তো একদম মোহামেডানের সঙ্গে। … এক লোক পিয়ন বোধ হয়, আইসা বলছে, স্যার আপনাকে তো রশিদ স্যার ইয়ে সেক্রেটারি সাহেব ডাকতেছেন। সেক্রেটারি সাহেব তো রশিদ সাহেব ছিলেন আর কি। আমি বললাম, আমি তো খাচ্ছি, … আমি খাওয়াদাওয়া শেষ করে হাত–পা ধুয়ে গেলাম। রশিদ সাহেব রুমে ঢুকলেন। হ্যাঁ টিপু, তোমারে আমি এতক্ষণ যাবৎ ডাকছি, খুব ব্যস্ত আর কি! …আমার কাছে হার্ডলি থ্রি ফোর মিনিটস সে বায়োডাটা নিয়ে নিলো।…ওটা যে ওই (জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার) কারণে নিতেছে, ওটা আমি জানি না। ইট ওয়াজ ডিসেম্বর। …ওই আরকি তারপর একদিন… মাসুম আহমেদ রুমীর কথা মনে আছে আপনার? রুমী আর ডাক্তার নিজামের, আপনার বোধ হয় ইউনিভার্সিটির আপনার সিনিয়র নিজাম।

আনিসুল হক:

 হ্যাঁ হ্যাঁ সিনিয়র।

গোলাম সারোয়ার টিপু: আচ্ছা নিজাম তো ডেইলি স্টারে ফ্রিল্যান্সার আর রুমী ভাই দুজনে আসছেন। দুজনই অফিসে একই জায়গায় হেঁটে ক্লাবে ঢুকছে। তো আমি গল্প করছিলাম মোহামেডান ক্লাবে অফিসে রুমে। গজনবী ভাইটাই সবাই ছিল আরকি। তো রুমী ভাই আমার ডাক দিছে। টিপু ভাই একটু শোনেন তো। আপনি কি কোনো খবর জানেন? আমি ভয় পেয়ে গেছি। কারণ, কিছুদিন আগে আব্বা মারা গেছে। আমার খালি ওই সব তখন চিন্তা হইত, আমার আম্মার কিছু হইল কি না, এই–সেই; আর নিজাম হলো আমার শ্যালক; আমার ওয়াইফের মামাতো ভাই। টিপু ভাই, আপনি কিছু জানেন না? মুখ চুন কইরা, মানে অভিনয় করতেছিল তারা। আমি বললাম, আমি কি করে জানব বলেন, কী হইছে। তারপর দেখি, রুমী ভাই কয় আপনি ন্যাশনাল এওয়ার্ড পাইছেন।

আনিসুল হক:

আলিঙ্গন করে আপনাকে জানালেন যে আপনি ন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছেন। আপনি নিশ্চয়ই আমাদের ভালোবাসা পেয়েছেন, দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছেন, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আপনার যে অবদান, এটা আমরা নিশ্চয়ই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব। আবার বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম আপনার কাছ থেকে শিখবে। এত সুন্দর একটা জীবন, যেটা আমাদের খুবই মুগ্ধ করে। আপনার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। আপনি অনেক ভালো থাকবেন, আমাদের অনেক সময় দিলেন। তো আমরা এখানেই শেষ করছি।

গোলাম সারোয়ার টিপু: আমি আপনাকেও কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি? হ্যাঁ আপনি আমাকে এমব্যারেস করছেন; কিন্তু তারপরেও আপনাকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই যে আপনি আমাকে এভাবে মনে করছেন, এভাবে মানে হাইলাইট করছেন—এটা আমি বোধ হয় ডিজার্ভ করি না। অ্যানিওয়ে ধন্যবাদ আপনাকে।

আনিসুল হক:

দর্শকমণ্ডলী আমরা এতক্ষণ বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব গোলাম সারোয়ার টিপুর কাছ থেকে তাঁর জীবনের গল্প শুনছিলাম। এই জীবনের অভিজ্ঞতার আলোয় আমরা আমাদের সামনের ভবিষ্যতের দিনগুলোকে আলোকিত করে তুলতে পারব বলে আমার বিশ্বাস। সবাই ভালো থাকবেন, খোদা হাফেজ।