সাগরের নীল জলরাশির দিকে ১ হাজার ৭০০ ফুট বাড়িয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য এখন ১০ হাজার ৭০০ ফুট। রানওয়ে সম্প্রসারণের ফলে বড় আকারের উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালও প্রস্তুত। চলতি অক্টোবরেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারের সক্ষমতা শুধু রানওয়ে বা টার্মিনালের ওপর নির্ভর করছে না। যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা, কার্গো, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, বিমান সংস্থার আগ্রহ এবং পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে তিনটি উন্নয়ন প্রকল্প। এর মধ্যে প্রথম দুটি প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও তৃতীয় প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারে এখন কী কী সুবিধা তৈরি হয়েছে, আর কোন সুবিধাগুলো এখনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়?
রানওয়েতে ক্যাটাগরি-২ এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল) ব্যবস্থা বসানো হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়োজাহাজ ওঠানামায় এই আলোকব্যবস্থা সহায়তা করবে। সমুদ্রের দিকে রয়েছে ২ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইট। কুয়াশা বা বৃষ্টির মতো পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজকে রানওয়ের দিকে নিরাপদে পরিচালনায় এই ব্যবস্থা কাজে লাগবে।
রানওয়ে বড়, কী সুবিধা হলো
কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য ছিল বড় আকারের উড়োজাহাজ, যেমন বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর (দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট ওয়াইড-বডির যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ) এর মতো সুপরিসর উড়োজাহাজের ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি করা।
সমুদ্রের দিকে ১ হাজার ৭০০ ফুট বাড়ানোর পর রানওয়ের দৈর্ঘ্য এখন হয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এতে দেশের অন্যতম দীর্ঘ রানওয়ের এই বিমানবন্দরে বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই রানওয়ে থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্লাইট চালিয়েছে কয়েকটি বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা।
রানওয়েতে ক্যাটাগরি-২ এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং (এজিএল) ব্যবস্থা বসানো হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়োজাহাজ ওঠানামায় এই আলোকব্যবস্থা সহায়তা করবে। সমুদ্রের দিকে রয়েছে ২ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইট। কুয়াশা বা বৃষ্টির মতো পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজকে রানওয়ের দিকে নিরাপদে পরিচালনায় এই ব্যবস্থা কাজে লাগবে।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বিবেচনায় সমুদ্রতীরে রক্ষাপ্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে চলতি মাসে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর দেশের চতুর্থ কোনো বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হবে।
অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার পর চলতি মাসে বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে।
আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য যা থাকছে
কক্সবাজার বিমানবন্দরে ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের টার্মিনাল ভবন তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে ৪৫০ জনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া টার্মিনালে থাকছে একটি বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এস্কেলেটর ও কনভেয়ার বেল্ট। বহির্গমন ও আগমনী ইমিগ্রেশন ডেস্কের পাশাপাশি রয়েছে আগমনী লাউঞ্জ। যাত্রীদের জন্য ডিউটি ফ্রি শপও থাকছে।
নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ও ভারী হ্যান্ড লাগেজ স্ক্যানিং ব্যবস্থা বসানো হচ্ছে। ফ্লাইটের তথ্য জানাতে থাকবে ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম (এফআইডিএস), ঘোষণা ব্যবস্থা ও সাইনেজ।
একসঙ্গে পাঁচটি উড়োজাহাজ পার্ক করা যাবে
বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোনের আয়তন ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটার। সেখানে দুটি সুপরিসর ও তিনটি ক্লাস-৮ উড়োজাহাজ পার্ক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রানওয়ের সঙ্গে পার্কিং ইয়ার্ড বা টার্মিনালের সংযোগ স্থাপনকারী দুটি ট্যাক্সিওয়েও তৈরি করা হয়েছে।
টার্মিনালের সামনে গাড়ি রাখার ব্যবস্থাও থাকছে। সেখানে ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ গাড়ি পার্ক করা যাবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের টার্মিনাল ভবন তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে ৪৫০ জনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া টার্মিনালে থাকছে একটি বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এস্কেলেটর ও কনভেয়ার বেল্ট। বহির্গমন ও আগমনী ইমিগ্রেশন ডেস্কের পাশাপাশি রয়েছে আগমনী লাউঞ্জ। যাত্রীদের জন্য ডিউটি ফ্রি শপও থাকছে।
যেসব কাজ এখনো বাকি
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত বিমানবন্দর উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং রানওয়ের কাজের অগ্রগতি ৯১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। দুটি প্রকল্পের মেয়াদই চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
রানওয়ের নিরাপত্তা সীমানাপ্রাচীর, টহল সড়ক ও নিষ্কাশনব্যবস্থার কিছু কাজ এখনো চলছে বলে জানিয়েছে বেবিচক।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় বড় অবকাঠামোর বেশির ভাগই প্রস্তুত। গত ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার বিমানবন্দর পরিদর্শন করে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেছেন, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার পর চলতি মাসে বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে।
বড় পরিকল্পনা এখনো কাগজে
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে তৃতীয় প্রকল্পে। এই প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে ৬৮২ একর জমিতে নতুন অবকাঠামো তৈরি করা হবে।
এই পরিকল্পনায় রয়েছে নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ও নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, প্রশাসনিক ভবন, কার্গো কমপ্লেক্স, কনভেনশন ও বিজনেস সেন্টার, জেনারেল এভিয়েশন ও এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার। এ ছাড়া থাকবে এয়ারপোর্ট কোয়ারেন্টাইন হাসপাতাল, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে ও রিফুয়েলিংয়ের ব্যবস্থা।
তবে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। বর্তমানে চলছে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ। এর অগ্রগতি ৫৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এই কাজ শেষ হওয়ার পর নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হবে।
বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোনের আয়তন ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটার। সেখানে দুটি সুপরিসর ও তিনটি ক্লাস-৮ উড়োজাহাজ পার্ক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রানওয়ের সঙ্গে পার্কিং ইয়ার্ড বা টার্মিনালের সংযোগ স্থাপনকারী দুটি ট্যাক্সিওয়েও তৈরি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চাহিদা কতটা
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে গত বছরের অক্টোবরে ‘আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ ঘোষণা করা হয়। পরে একই মাসে ‘আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ ঘোষণা করে জারি করা প্রজ্ঞাপন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে এই বিমানবন্দরের উন্নয়ন করছে সরকার। এখানে ৪০ থেকে ৫০টি উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হলেও বিদেশি কোনো এয়ারলাইনস এখনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ বা সূচি ঘোষণা করেনি।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণার পর কক্সবাজারের ব্যবসায়ীরা বিদেশি পর্যটক বাড়ার আশা করেছিলেন। তবে বাংলাদেশে আসা বিদেশি পর্যটকদের তুলনামূলক কম অংশ কক্সবাজারে যান। সৈকতকেন্দ্রিক পর্যটন অবকাঠামোতেও আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা সীমিত।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নে নেওয়া তিনটি প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিনিয়োগের সুফল কতটা মিলবে, তা নির্ভর করবে বিমানবন্দরটি কতটা ব্যবহার হচ্ছে, কতটি ফ্লাইট চালু হচ্ছে এবং কত যাত্রী নিয়মিত যাতায়াত করছে—তার ওপর।
আন্তর্জাতিক হাবের বাইরে আরও সম্ভাবনা
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর আগে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও যাত্রী চাহিদা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম।
প্রথম আলোকে ওয়াহিদুল আলম বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো এয়ারলাইনস কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ বা সূচি ঘোষণা করেনি। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েক মাস আগে ফ্লাইটের সূচি ঘোষণা করে বৈশ্বিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি শুরু করতে হয়।
কক্সবাজারে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত যাত্রীভিত্তি আছে কি না, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু পর্যটকদের সম্ভাব্য আগমনকে ভিত্তি করে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা বাস্তবসম্মত হবে না।
কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, কক্সবাজারকে শুধু আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে না দেখে এর বিকল্প ব্যবহার ও এভিয়েশন অবকাঠামো তৈরির দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে। ঢাকায় কুয়াশা বা অন্য কোনো কারণে ফ্লাইট অবতরণ করতে না পারলে কক্সবাজারকে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
পাশাপাশি সেখানে আন্তর্জাতিক মানের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও) সুবিধা এবং পাইলট প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন এই এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ। এতে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কক্সবাজার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
কক্সবাজারকে শুধু আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে না দেখে এর বিকল্প ব্যবহার ও এভিয়েশন অবকাঠামো তৈরির দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে। ঢাকায় কুয়াশা বা অন্য কোনো কারণে ফ্লাইট অবতরণ করতে না পারলে কক্সবাজারকে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এখন অপেক্ষা কিসের
রানওয়ে সম্প্রসারণ ও নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালের মাধ্যমে কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আরও অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
অক্টোবরে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হলে প্রথম কয়েক মাসে কতটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হয়, কোন কোন বিমান সংস্থা যুক্ত হয় এবং তৃতীয় প্রকল্পের নির্মাণকাজ কবে শুরু হয়—এসবের ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন সক্ষমতা কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে।
দেশের প্রধান পর্যটননগরী কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক আকাশপথের সঙ্গে আরও যুক্ত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার পরবর্তী ধাপে অবকাঠামোর পাশাপাশি ফ্লাইট ও যাত্রীর চাহিদা তৈরি করাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।