লম্বা চুলের জন্য ৭০ দশকে বেগম পত্রিকায় মডেল হয়েছিলেন তাঁরা

৭০ দশকে সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় লম্বা চুলের জন্য মডেল হয়েছিলেন দুই বোন জরিফা হোসেন ও সালমা আহমেদ। বর্তমানে ৭৪ বছর বয়সী জরিফা ও ৭০ বছর বয়সী সালমা স্মৃতিচারণায় ফিরে গেলেন সেই ৭০ দশকে।

যখন জরিফা হোসেন (বায়ে) ও সালমা আহমেদের ছবি তোলা হয়েছিল, তখন জরিফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন আর সালমা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন
ছবি: সংগৃহীত

গল্পটা এত পুরোনো যে এখন শুধু ১৯৭২ সালে ছবিটা ছাপা হয়েছিল এর বাইরে এ নিয়ে আর কিছু মনে নেই জরিফা হোসেন ও সালমা আহমেদের। সেই বছর চুলের পরিচর্যাবিষয়ক লেখার সঙ্গে এই দুই বোনের লম্বা চুলের ছবি ছাপা হয়েছিল বাংলার প্রথম সচিত্র মহিলা সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকায়। কালের পরিক্রমায় বেগমের সেই সংখ্যাটি কোথায় হারিয়ে গেছে। তবে স্মৃতি হিসেবে দুই বোনের লম্বা চুলের সাদা–কালো ছবিটি বাঁধিয়ে রেখেছেন জরিফা হোসেন।

জরিফা হোসেনের বর্তমান বয়স ৭৪ বছর আর তাঁর ছোট বোন সালমা আহমেদের বয়স ৭০। জরিফার চুলে এখন কৃত্রিম কালো রং, আর সালমার মাথার সামনের অংশের কিছু চুলে পাক ধরেছে। দুজনেরই ক্লিপ দিয়ে খোঁপা বাঁধা। ‘আপনাদের চুল আগের মতো লম্বা আছে’ প্রশ্নে দুজনেই হেসে উঠলেন। ক্লিপ খুলে দেখালেন সেই চুল আর নেই।

গত বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে জরিফা হোসেনের বাসায় সত্তর দশকের এই দুই মডেলের সঙ্গে কথা হয়। যখন তাঁদের ছবি তোলা হয়েছিল, তখন জরিফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন আর সালমা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। তাঁরা ছবিটি তোলার অন্য একটি গল্প বললেন। জানালেন, তখন এলিফ্যান্ট রোডে আঁকাবাঁকা নামের একটি স্টুডিওর উদ্বোধন হবে। স্টুডিওর কাছেই ভোজ্যতেলের গলিতে ছিল এই দুই বোনের বাসা। স্টুডিওর মালিক দুই বোনের লম্বা চুল দেখে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাঁদের চুলের ছবি তুলেই স্টুডিও উদ্বোধন করবেন। দুই বোনও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। দুজনই জানালেন, স্টুডিওতে ছবিটি ১৯৭১ সালে তোলা হয়।

সত্তর দশকের দুই মডেল সালমা ও জরিফার বর্তমানে বয়স যথাক্রমে ৭০ ও ৭৪ বছর। ধানমন্ডিতে জরিফা হোসেনের বাসায়
ছবি: শুব্র কান্তি দাশ

কথাসাহিত্যিক মকবুলা মনজুর সাপ্তাহিক ‘বেগম’-এ একটানা ২৫ বছর ফিচার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ২০২০ সালে মারা যান। সালমা আহমেদ বললেন, বেগম পত্রিকায় মডেল হওয়ার পেছনে কথাসাহিত্যিক মকবুলা মনজুরের হাত ছিল। তিনিই তাঁকে (সালমা) বলেছিলেন চুলের পরিচর্যাবিষয়ক লেখার সঙ্গে লম্বা চুলের ছবি লাগবে। তিনি যাতে তাঁর লম্বা চুলের একটি ছবি দেন। তখন সালমা আহমেদ স্টুডিওতে তোলা দুই বোনের ছবির কথা জানালে মকবুলা মনজুর ছবিটি নেন। এরপর একদিন তা ছাপাও হয়।

স্মৃতি হিসেবে দুই বোনের লম্বা চুলের সাদা–কালো ছবিটি বাঁধিয়ে রেখেছেন জরিফা হোসেন
ছবি: মানসুরা হোসাইন

জরিফা হোসেন বললেন, ছবিটি যখন ছাপা হয়, তখন তিনি স্বামীর সঙ্গে সিলেটে থাকেন। আর সালমা কলেজে পড়েন। মডেল হিসেবে নিজেদের ছবি দেখতে কেমন লেগেছিল প্রশ্নে আবার দুই বোন হাসলেন। বললেন, তখনকার উচ্ছ্বাস প্রকাশের ভঙ্গিটা অন্য রকম ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো ছিল না, তাই ছবি পোস্ট করে খবরটি জানানো হয়নি। তবে তখন প্রায় ঘরে ঘরেই ছিল বেগম পত্রিকা। তাই পরিবারের বাইরেও আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি, বন্ধুদের চোখে পড়েছিল ছবিটি।

সত্তর দশকে মডেল হিসেবে ছবি ছাপা হওয়ায় বিব্রতকর কোনো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে জরিফা হোসেন স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘পাড়ায় আমার বাবা জয়েন উদ্দিন ও আমাদের পরিবারের সুনাম ছিল। পাড়ার ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম। আমরা কলের গানের কীর্তন শুনে বড় হয়েছি। ঐক্য সংঘ করতাম। আমরা ভাইবোনেরা গান করতাম, নাচতাম, বই পড়তাম। মা ছবি তুলতেন, কবিতা লিখতেন ও আবৃত্তি করতেন। তাই মডেল হিসেবে ছবি ছাপা হওয়ায় বিব্রতকর কোনো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। শ্বশুরবাড়িতেও সবাই বিষয়টিকে ভালোভাবেই নিয়েছিলেন।’

৭৪ বছর বয়সে সকাল–বিকেল হাঁটার পাশাপাশি নিয়মিত ইয়োগা করা জরিফা হোসেনের কণ্ঠে আক্ষেপ। বললেন, ‘আমরা স্বাধীনভাবে বড় হয়েছি। বরং এখন যে সমাজব্যবস্থা, তার কোনো সিলেবাস আছে বলে মনে হয় না। সংকীর্ণতা চারপাশে। কে কার বদনাম করবে তাই নিয়ে ব্যস্ত। মানুষের বিবেকটাও তেমন কাজ করছে না। এসব দেখে খুব খারাপ লাগে।’

আর চুলের পরিচর্যা বলতে গন্ধরাজ বা অন্য কোনো নারকেল তেল মাখতেন। তবে চুল সব সময় পরিষ্কার রাখতেন। খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে সব সময়ই সচেতন ছিলেন।

সালমা আহমেদ আবার ফিরে গেলেন তাঁর লম্বা চুলের গল্পে। বললেন, ‘আমি হেঁটে গেলে পেছন থেকে সবাই বলতেন মনে হয় পিঠে একটি লম্বা সাপ ঝুলছে।’ স্টুডিওতে ছবি তোলার সময় সালমা একটি কামিজের সঙ্গে ওড়না শাড়ির মতো পেঁচিয়ে ছবিটি তুলেছিলেন। আঁকাবাঁকা স্টুডিওটি এখন আর নেই, সেখানে বাটার দোকান হয়েছে, আর স্টুডিওর মালিকের নামও তাঁদের মনে নেই। দুই বোন হেসে বললেন, ‘এত বছর পর লম্বা চুলের মডেল হিসেবে আবার প্রথম আলোতে সাক্ষাৎকার দিতে হবে জানা থাকলে তো সবকিছু গুছিয়ে রাখতাম, সব মনে রাখতাম।’

আইন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদ থেকে অবসরে যাওয়া নাসরিন বেগমের পরিবারও ভোজ্যতেলের গলিতে থাকতেন এবং এখনো থাকেন। দুই বোনের মডেল হওয়ার খবরটি যখন ছাপা হয়, তখন তিনি নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। বললেন, ‘পাড়ার মধ্যে আপাদের পরিবারটি আমাদের কাছে ছিল ঠিক চাঁদের হাটের মতো। বেগমের মতো পত্রিকায় জরিফা আর সালমা আপার ছবি ছাপা হওয়ার বিষয়টি তখন আমাদের কাছে গর্বের বিষয় ছিল। দুই বোনের মডেল হওয়া নিয়ে কোনো নেতিবাচক কথা শুনেছি বলে মনে হয় না, তবে সেই সময়ের জন্য বিষয়টি অবশ্যই সাহসের ছিল।’

আমি হেঁটে গেলে পেছন থেকে সবাই বলতেন মনে হয় পিঠে একটি লম্বা সাপ ঝুলছে।
সালমা আহমেদ

দুই বোনের লম্বা চুল থাকলেও বিয়ের আগে সেই অর্থে বরপক্ষের সামনে চুল খুলে হাঁটতে হয়নি বলে জানালেন। বিয়ের পর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন লম্বা চুল দেখে অবাক হয়েছেন।

‘চুলের পরিচর্যার জন্য মডেল হলেন, তো চুলের পরিচর্যা কীভাবে করতেন’—জানতে চাইলে জরিফা ও সালমা দুজনই জানালেন, তাঁদের মা আশরাফুন্নেছার অনেক লম্বা চুল ছিল। তাঁরা চার বোনই মায়ের মতো চুল পেয়েছেন। আর চুলের পরিচর্যা বলতে গন্ধরাজ বা অন্য কোনো নারকেল তেল মাখতেন। তবে চুল সব সময় পরিষ্কার রাখতেন। খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে সব সময়ই সচেতন ছিলেন।

৭০ দশকের মতো ক্যামেরার সামনে আবারও মডেলের মতো পোজ দিলেন দুই বোন
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

জরিফা বললেন, ‘আমাদের সময় তো আর বিউটি পারলার, হেয়ার ট্রিটমেন্ট—এসব ছিল না। এখন তো অনেক সুযোগ।’ দুই বোনই জানালেন, তাঁদের মেয়েদের মাথায়ও অনেক চুল, তবে কাজের সুবিধার জন্য তাঁরা চুল ছোট রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

সালমা আহমেদ ঢাকা সিটি কলেজে শিক্ষকতা করতেন। ১১ বছর হলো অবসর নিয়েছেন। এই সিটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন সালমা আহমেদের বাবা জয়েন উদ্দিন। তিনি মারা গেছেন ২০০৭ সালে। আর তাঁদের মা মারা গেছেন ২০১৬ সালে। মানিকগঞ্জে বাড়ি হলেও ১৯৪৭ সাল থেকে এলিফ্যান্ট রোডের ভোজ্যতেলের গলির বাড়িটিতে থাকা শুরু করেছিলেন জরিফারা। বাড়িটি এখনো আছে। জরিফা ছাড়া তিন বোন ও চার ভাই (এক ভাই মারা গেছেন) পরিবার নিয়ে ওই বাড়িটিতেই থাকেন।

সালমা আহমেদের দুই মেয়ে। এক মেয়ে ব্যবসা করছেন। আরেক মেয়ে গৃহিণী। তাঁরা দেশেই আছেন। অন্যদিকে জরিফা হোসেনের তিন মেয়েই দেশের বাইরে থাকেন। মেয়েদের মধ্যে দুজন চিকিৎসক আরেক মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার।

‘এখন চুল পড়ে গেছে—এ নিয়ে কোনো আফসোস হয় কি না’—জানতে চাইলে সালমা আহমেদ বললেন, প্রকৃতির নিয়মে মানুষের বয়স বাড়বে, চুল পড়ে যাবে। এ নিয়ে আফসোসের কিছু নেই।

সত্তর দশকে মডেল হয়েছিলেন, সেই স্মৃতি মনে হয় কি না, জানতে চাইলে জরিফা হোসেন বলেন, ‘মাঝেমধ্যে যে মনে হয় না তা নয়, তবে স্মৃতি রোমন্থন করার সময়ই তো পাই না। জানালা খুলে বৃষ্টি দেখব, সে অবকাশই বা কোথায়।’

১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে বেগম প্রকাশিত হয়। বেগমের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন এবং প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদিকা ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। তবে চার মাস পর থেকেই পত্রিকাটির সম্পাদনা শুরু করেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সুযোগ্য মেয়ে নূরজাহান বেগম। ১৯৫০ সালে বেগম পত্রিকার অফিস চলে আসে ঢাকায়। সাপ্তাহিক পত্রিকাটি এখন মাসিক পত্রিকা হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কারণে নিয়মিত প্রকাশে ব্যাঘাতও ঘটে।

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন দুই বোন
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

কালের বিবর্তনে বেগম পত্রিকাটি হারিয়ে যেতে বসেছে—এ নিয়ে মন খারাপের কথা জানালেন জরিফা ও সালমা। নিজেদের ছবি প্রকাশের পাশাপাশি জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁরা পত্রিকাটি পড়েছেন। নূরজাহান বেগম ২০১৬ সালে মারা যান।

বেগম পত্রিকা প্রকাশের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০০ সালের ৮ নভেম্বর প্রথম আলোর নারীমঞ্চে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে নূরজাহান বেগম ‘বেগম’–এর মডেল পাওয়া প্রসঙ্গে নারীমঞ্চকে বলেছিলেন, ‘...আর মডেল? কোথায় পাব? কেউ রাজি হয় না। এর বোন, ওর খালার ছবি তোলা হতো প্রচ্ছদের জন্য।’

এই বেগম পত্রিকায় মডেল হয়ে জরিফা ও সালমাও ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। গত ২৯ জুলাই জরিফা হোসেনের জন্মদিনে দুই বোনের মডেলের ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী চিকিৎসক তানজিনা হোসেন। তারপরই আলোচনায় আসে ছবিটি। তানজিনা হোসেন ফেসবুকেই কারও সংগ্রহে বেগম পত্রিকার কপিটি থাকলে তা তাঁদের পরিবারকে দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।

আরও পড়ুন