‘দুই শতাব্দী’ আগের কাবিননামায় কনের তিন শর্ত

জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে এই কাবিননামাছবি: প্রথম আলো

জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলায় ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারি। কাচের বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে একজন দর্শনার্থী আরেকজনকে দেখাচ্ছেন পুরোনো একটি দলিল। কেউ ঝুঁকে পড়ছেন, কেউ পড়ার চেষ্টা করছেন ফারসি অক্ষরগুলো। বিবর্ণ কাগজে কী লেখা আছে, তা জানতে কৌতূহলী তাঁরা।

দলিলটি একটি কাবিননামা। শতাব্দী আগে বিয়েতে এক নারীর দেওয়া তিনটি শর্তের উল্লেখ রয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে আছে, বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করা এবং একাধারে ছয় মাস স্ত্রীকে ছেড়ে না থাকা।

কনে আফসারুন নেসা খাতুন। বর তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরী। ১৮২৩ সালের অক্টোবরে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল বলে দলিলের অনুবাদে ধারণা পাওয়া যায়। তবে জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে থাকা সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও নথিতে ১৯২৩ সাল উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক অসংগতি।

ফারসি ভাষায় লেখা সেই দলিল এখন সংরক্ষিত আছে জাতীয় জাদুঘরে। প্রায় ২০৩ বছর আগের ধারণা করা এই কাবিননামা যেন সেই সময়ের একজন নারীর নিজের অধিকার নিয়ে করা দর-কষাকষির সাক্ষী হয়ে আছে।

আফসারুন নেসা খাতুন ও তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরীর বিয়ের কাবিননামাটি জাতীয় জাদুঘরে উপহার দিয়েছিলেন লেখক ও ইতিহাসবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর। তিনি ঢাকা জাদুঘরের (বর্তমান জাতীয় জাদুঘর) ট্রাস্টি ছিলেন।

বিয়ের আগে কনের তিন শর্ত

১৮২৩ সালের অক্টোবর। মুকিমপুরের সৈয়দ নেজাবত আলী চৌধুরীর মেয়ে আফসারুন নেসা খাতুনের সঙ্গে বিয়ে হয় তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরীর।

অভিজাত দুই পরিবারের সেই বিয়েটি হয়েছিল ধুমধাম করে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল কাবিননামা। তাতে কনের দেওয়া তিনটি শর্ত উল্লেখ করা হয়।

শর্তগুলো ছিল বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না; একাধারে ছয় মাস স্ত্রীকে ছেড়ে থাকা যাবে না এবং স্ত্রীর কোনো ত্রুটি হলে স্বামী তাঁকে মারধর করতে পারবেন, তবে শরীরে কোনো দাগ ফেলা যাবে না।

জাতীয় জাদুঘরে কাচের বাক্সে সংরক্ষিত আফসারুন নেসা খাতুনের কাবিননামা। ৩৩ নম্বর গ্যালারি, ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগ, জাতীয় জাদুঘর
ছবি: প্রথম আলো

কনের সব শর্ত মেনে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেছিলেন জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরী।

বিয়ের দেনমোহরও ছিল বড় অঙ্কের-পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও ৫০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা।

কাচের বাক্সে রাখা এই দলিল শুধু একটি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার নথি নয়; এতে দাম্পত্য জীবনের কিছু শর্ত লিখিতভাবে নির্ধারণের নজিরও পাওয়া যায়।

তবে সে সময় এমন শর্ত কেন রাখা হয়েছিল, তা বুঝতে হলে সে সময়ের সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হয়।

এখন পর্যন্ত আমরা ফারসি ভাষায় যত দলিল পেয়েছি, সব কটিতেই হিজরি সাল দেওয়া ছিল। কাবিননামার নিচের অংশে ১২শ হিজরি লেখা আছে। সে হিসেবে এটি ১৯২৩ সালের হওয়ার সুযোগ নেই। এটি ১৮২৩ সালের কাবিননামা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
মুমিত আল রশিদ, চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শুধু এই কাবিননামাই নয়

এমন শর্তযুক্ত কাবিননামা যে একেবারেই বিরল ছিল না, তার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে।

১৯৭৬ সালে সংগ্রহ করা ওই কাবিননামাটির বাংলা অনুবাদ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ গবেষক হাফিজ মাহবুবুর রহমান।

ওই অনুবাদ থেকে জানা গেছে, ১৮২৬ সালের ৯ মার্চ চট্টগ্রামের ফতেহাবাদের মীর আমানি ওরফে মীর খানের সঙ্গে ফতেপুরের মুছাম্মৎ লুতফুন নিসা বিনতে খোন্দকার মুনিরুদ্দিনের বিয়ের সময় এই কাবিননামা তৈরি করা হয়েছিল। তৎকালীন ইসলামাবাদের ফতেহাবাদের (বর্তমানে হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ) মীর মদনের ছেলে ছিলেন মীর খান।

ওই বিয়ের কাবিননামায় চারটি শর্ত রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করা; অনুমতি ছাড়া দূর প্রবাসে না যাওয়া; স্ত্রীর দেনমোহর ও সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া এবং মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের দেখাশোনার জন্য স্ত্রীকে যেতে বাধা না দেওয়া।

বর্তমানে জাদুঘরের আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ গ্রন্থাগারে রাখা আছে এই কাবিননামা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটি কিনেছিল ৩০ টাকায়। তবে এটি কার কাছ থেকে কেনা হয়েছিল, এ তথ্য জানা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী এই কাবিননামার লিপিকর ছিলেন ছৈয়দ মোহাম্মদ বাছের।

দুটি কাবিননামার সময়ের ব্যবধান মাত্র কয়েক বছর। দুটিতেই দেখা যাচ্ছে, বিয়ের চুক্তিতে শুধু দেনমোহর নয়, দাম্পত্য জীবনের নানা বিষয়ও লিখিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ প্রথম আলোকে জানিয়েছে, ১৯৬৫ সালের আগের বেশির ভাগ সংগ্রহের দিন-তারিখ ও সালের তথ্য তাদের কাছে নেই। পুরোনো রেজিস্ট্রার ঘেঁটে শুধু এই কাবিননামার দাতার নাম পাওয়া গেছে।

কাবিননামা ছিল একধরনের চুক্তি

দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম বিবাহ আইনের বিবর্তন এবং আধুনিকতার ওপর পিএইচডি থিসিস ছিল ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনিসুর রহমানের।

২০ সেপ্টেম্বর তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সে সময়ে অনেক মুসলিম পরিবারের বিয়ের চুক্তিতে দেনমোহর ও দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ করার প্রচলন ছিল। বিশেষ করে অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবারের বিয়েতে কাবিননামায় নানা শর্ত যুক্ত করার নজির পাওয়া যায়।

একাধিক বিয়ের প্রচলন থাকায় প্রথম স্ত্রীর অধিকার, দেনমোহর ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতেও কাবিননামায় বিভিন্ন শর্ত রাখা হতো বলে জানিয়েছেন আনিসুর রহমান।

আনিসুর রহমান বলেন, ‘কাবিননামা একটি চুক্তি। ১৯৭৪ সালে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনটি পাস হওয়ার পর থেকে দেশে যে কাবিননামা প্রচলিত আছে, সেখানে অনেকগুলো ধারা দেওয়া আছে। বর-কনের পরিচয় থেকে আগের বিয়ের তথ্য, দেনমোহর থেকে তালাকের ক্ষমতাসহ অনেক বিষয় এতে উল্লেখ আছে।’

তাঁর ভাষ্য, জাতীয় জাদুঘরে রাখা কাবিননামাটি যে সময়ের, তখন বা তার আগে লিখিত এ ধরনের কাবিননামার কোনো আইন ছিল না। মৌখিক সম্মতিতেই সে সময় বিয়ে পড়ানো হতো। তবে উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলো লিখিত প্রমাণ রাখত।

আনিসুর রহমান বলেন, সে সময় জমিদাররা একাধিক বিয়ে ও উপপত্নী রাখতেন। তাই স্ত্রীদের দেনমোহর ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য লিখিত কাবিননামা করে রাখা হতো। মূলত দেনমোহরের প্রমাণ রাখার জন্যই এটি লিখে রাখা হতো।

জাতীয় জাদুঘরে কাবিননামার সামনে লেখা সংক্ষিপ্ত বিবরণ
ছবি: প্রথম আলো

কাবিননামাটি জাদুঘরে এল যেভাবে

আফসারুন নেসা খাতুন ও তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরীর বিয়ের কাবিননামাটি জাতীয় জাদুঘরে উপহার দিয়েছিলেন লেখক ও ইতিহাসবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর। তিনি ঢাকা জাদুঘরের (বর্তমান জাতীয় জাদুঘর) ট্রাস্টি ছিলেন।

এই কাবিননামা ছাড়াও দুই শতাধিক দুর্লভ জিনিস জাদুঘরকে উপহার দিয়েছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর। এর মধ্যে আছে প্রাচীন ও মোগল মুদ্রা, প্রত্নসামগ্রী এবং পূর্ব ভারত থেকে পাওয়া অস্ত্রশস্ত্র।

তবে কাবিননামাটি ঠিক কবে তাঁর কাছ থেকে জাতীয় জাদুঘর সংগ্রহ করেছিল, সে তথ্য নেই।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ প্রথম আলোকে জানিয়েছে, ১৯৬৫ সালের আগের বেশির ভাগ সংগ্রহের দিন-তারিখ ও সালের তথ্য তাদের কাছে নেই। পুরোনো রেজিস্ট্রার ঘেঁটে শুধু এই কাবিননামার দাতার নাম পাওয়া গেছে।

সে সময়ে অনেক মুসলিম পরিবারের বিয়ের চুক্তিতে দেনমোহর ও দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ করার প্রচলন ছিল। বিশেষ করে অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবারের বিয়েতে কাবিননামায় নানা শর্ত যুক্ত করার নজির পাওয়া যায়। একাধিক বিয়ের প্রচলন থাকায় প্রথম স্ত্রীর অধিকার, দেনমোহর ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতেও কাবিননামায় বিভিন্ন শর্ত রাখা হতো।
আনিসুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

ফারসি অক্ষরে লেখা সেই দলিল

কাবিননামাটি লেখা হয়েছে ফারসি ভাষায়। এর অনুবাদ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান মুমিত আল রশিদ।

জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে মুঠোফোনে কাবিননামাটির ছবি তুলে মুমিত আল রশিদকে দেখানো হয়। তবে কাবিননামাটির লেখাগুলো অস্পষ্ট হওয়ায় পুরো অনুবাদ করা সম্ভব হয়নি। এরপরও যতটুকু অনুবাদ করা গেছে, তাতেই সামনে এসেছে কনের তিন শর্তসহ বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য।

আরও পড়ুন

সময়পর্ব ১৮২৩ নাকি ১৯২৩

জাতীয় জাদুঘরে গ্যালারিতে দলিলটির সামনে লেখা সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও নথিতে কাবিননামাটির সময়কাল ১৯২৩ সাল উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু কাবিননামার নিচের অংশে থাকা হিজরি সালের উল্লেখ দেখে মুমিত আল রশিদের ধারণা, দলিলটি আরও প্রায় ১০০ বছর আগের।

জাতীয় জাদুঘরের দেওয়া তিনটি শর্তসহ কাবিননামার বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে হিজরি সালের উল্লেখ মিলিয়ে দেখেছেন মুমিত আল রশিদ। সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কাবিননামাটির ছবি ইরানের দুজন ও সিরিয়ার একজন নাগরিককেও দেখিয়েছেন তিনি।

মুমিত আল রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ফারসি ভাষায় যত দলিল পেয়েছি, সব কটিতেই হিজরি সাল দেওয়া ছিল। কাবিননামার নিচের অংশে ১২০০ হিজরি লেখা আছে। সে হিসেবে এটি ১৯২৩ সালের হওয়ার সুযোগ নেই। এটি ১৮২৩ সালের কাবিননামা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’

কাবিননামাটির সামনে কৌতূহলী এক দর্শনার্থী। জাতীয় জাদুঘরে
ছবি: প্রথম আলো

কাচের বাক্সে থেমে থাকা সময়

জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলায় ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারিতে এখন পাশাপাশি সাজানো মানুষ বিক্রির দলিল, হাতে লেখা কোরআন শরিফ, পুরোনো পাণ্ডুলিপি ও গাছের বাকলে লেখা পুঁথি। সেখানেই কাচের বাক্সে রাখা আছে আফসারুন নেসা খাতুনের সেই কাবিননামা।

ফারসি অক্ষরগুলো অনেকটাই অস্পষ্ট। সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন আছে। তবু কাচের সামনে দাঁড়ানো দর্শনার্থীদের কৌতূহল থামে না। তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন দুই শতাব্দী আগের বলে ধারণা করা সেই কাবিননামার লেখার অর্থ। তাঁরা হয়তো জানেন না, এই বিবর্ণ অক্ষরগুলোর ভেতরে শুধু একটি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নেই। আছে সেই সময়ে একজন নারীর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার চিহ্নও।

সময়ের সঙ্গে বিয়ের আইন বদলেছে, বদলেছে কাবিননামার কাঠামোও। কিন্তু জাদুঘরে রাখা সেই দলিলটি আজও একটি সহজ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে-বিয়ের আগে নিজের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে একজন নারীর কথা বলার প্রয়োজন কি কেবল আজকের?

বহু পুরোনো সেই কাবিননামা তার উত্তর দেওয়ার মতো করে আজও কাচের বাক্সে পড়ে আছে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন