সংকটের সমাধান হতে পারে ছাদবিদ্যুৎ 

ভবনের অব্যবহৃত ছাদ হতে পারে বিদ্যুৎ–সংকটের সমাধান। দেশের সব ছাদ ব্যবহারে বদলে যেতে পারে বিদ্যুৎ খাতের চিত্র।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি ভবনের ছাদে ১ হাজার ৯০০টি সৌর বিদ্যুতের প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি তোলাছবি: মনিরুল ইসলাম

দফায় দফায় দাম বাড়িয়েও বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। আবার চড়া দাম দিয়েও চাহিদার সময় পুরোপুরি বিদ্যুৎ পায় না গ্রাহক। বিদ্যুৎ খাতে চলমান এ সংকটের সহজ সমাধান হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ। শুধু ভবনের অব্যবহৃত ছাদ ব্যবহার করেই কম খরচে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। ছাদে ছাদে গড়ে উঠতে পারে নিজস্ব ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র’।

বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে যে বিল হয়, তার চেয়ে কম খরচে পাওয়া যায় ছাদবিদ্যুৎ থেকে। ইতিমধ্যে কয়েকটি বড় শিল্পকারখানা চাহিদার বড় অংশ পাচ্ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে। একের পর এক শিল্পকারখানা এখন সেদিকে ঝুঁকছে।

এক দশক ধরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও উৎপাদন তেমন বাড়েনি। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে করার কথা ছিল ২০২১ সালে। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ২০২৫ সালে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এটি এখনো ৫ শতাংশের নিচে। ২০১২-১৩ সালেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে এবার পরিস্থিতি বদলাতে পারে। এ ক্ষেত্রে ছাদ হতে পারে বড় উৎস।

আরও পড়ুন

ঢাকা ও আশপাশের ছাদ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নিও বিভি। এতে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ শহর এলাকাকে কেন্দ্র করে ঢাকা সেন্টার অঞ্চলে ৪ লাখ ২৫ হাজার ২৪৪ এবং বৃহত্তর ঢাকা এলাকায় ২ লাখ ১৪ হাজার ২৪২টি আবাসিক, বড় ও ছোট বাণিজ্যিক, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবন চিহ্নিত করা হয়। এসব ছাদ ব্যবহার করে ১০ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এসব ভবনের অর্ধেকের সক্ষমতা ধরলেও ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।

২০২৫ সালের ২৬ জুন ‘ন্যাশনাল রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সব সরকারি ভবন, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনের নির্দেশনা দেন। এরপর গত বছরের অক্টোবরে তিন মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগের সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা স্মারকে সই করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ। ছয়টি বিভাগ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ। ৪৬ হাজার ৮৫৪টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও তেমন সাড়া দেখা যায়নি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বিবেচনায় নিয়েই সরকার সব করেছে। নীতিমালায় সেটি পরিষ্কার। এ ছাড়া সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপকরণ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পরে কেউ কেউ আরও সুবিধা দাবি করেছে। তবে ৯০ শতাংশ অংশীজনের চাহিদা পূরণ হয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

কর্মকর্তারা বলছেন, দরপত্রের ক্ষেত্রে পাইকারি দামের চেয়ে কম দর দেওয়ার সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যদিও ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা আলাদা দামে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ কেনে। ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা বিদ্যুৎ কেনে বেশি দামে। তাই ঢাকার দরপত্রে আগ্রহ দেখালেও গ্রামে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অথচ এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি করার কথা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। এ সীমা তুলে দিলে আগ্রহ বাড়বে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, ঢাকা নগরে ১৬৫টি ছাদে সাড়ে ১২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ক্ষমতা বসানোর কাজ চলছে। তবে আপাতত দরপত্র আহ্বান বন্ধ আছে। সরকার এটি নিয়ে একটি কৌশলপত্র তৈরি করছে। এরপর আবার দরপত্র আহ্বান করা হবে। দরপত্রে দামের সীমা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন করে ডাকা দরপত্রে আর দামের সীমা থাকবে না। নীতিগত যত বাধা ছিল, সবই দূর করা হয়েছে। বাজেটে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করায় খরচ আরও কমে যাবে। তাই বিনিয়োগে উৎসাহ বাড়বে, প্রতিযোগিতায় দামও কমে আসবে। সরকার বিনিয়োগ না করে ওপেক্স মডেলে কাজ করতে চায়। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদার নিজে বিনিয়োগ করে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বিবেচনায় নিয়েই সরকার সব করেছে। নীতিমালায় সেটি পরিষ্কার। এ ছাড়া সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপকরণ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পরে কেউ কেউ আরও সুবিধা দাবি করেছে। তবে ৯০ শতাংশ অংশীজনের চাহিদা পূরণ হয়েছে। এখন সবাই কাজ শুরু করুক। এরপর যদি আরও কিছু করার প্রয়োজন হয়, বাস্তবিকভাবে চিন্তা করে সরকার বিবেচনায় নেবে। 

আরও পড়ুন

কারখানার ছাদে বড় সম্ভাবনা

শীর্ষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএলের বিভিন্ন কারখানার ছাদ ব্যবহার করে ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা চলছে। এ গোষ্ঠীর সূত্র বলছে, ২০টি কারখানায় ইতিমধ্যে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এ বছরের মধ্যে আরও অন্তত ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হতে পারে। নিজেদের কারখানা ব্যবহারের পাশাপাশি দুটি কারখানা থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। আরও ১৫টি কারখানা থেকে গ্রিডে সরবরাহের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের খরচ পড়ে গড়ে ৬ টাকার কম।

কারখানার ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে আরেক বড় গোষ্ঠী আকিজ বশির গ্রুপ। আকিজের জনতা জুট মিলসে ২১ মেগাওয়াট সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে, জুনে এটি চালু হয়েছে। এখন চাহিদার শতভাগ বিদ্যুৎ ছাদ থেকে পাচ্ছে এ জুট মিলটি। এ ছাড়া হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাসের কারখানার ছাদে ১৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বসানো হয়েছে, যার মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ব্যাটারি সিস্টেম আছে। এতে রাতেও বিদ্যুৎ পায় কারখানাটি। ২০২২ সালে শুরু করে তারা। এখন সব মিলে ছাদ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে আকিজ বশির। আরও ২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা বসানোর কাজ চলছে।

আকিজ বশির গ্রুপের ম্যানেজার (পিঅ্যান্ডডি, টিএসডি ও সোলার) হোসেইন মুহাম্মদ আলামিন প্রথম আলোকে বলেন, ছাদবিদ্যুৎ অনেক সাশ্রয়ী। তাই তাঁরা সব কারখানার ছাদেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছেন। তাঁদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ৪ থেকে ৫ টাকা। ছোট প্রকল্পে ইউনিট খরচ একটু বেশি পড়ে। আর যেখানে রাতেও বিদ্যুৎ পেতে ব্যাটারি বসানো হয়েছে, সেখানে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৮ টাকা।

প্রাণ-আরএফএল ও আকিজ বশির গ্রুপ; দুটোতেই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। বিশ্বব্যাংকের সাড়ে তিন কোটি ডলার, জার্মানির ৬ কোটি ডলার ও ইডকলের ৩০০ কোটি টাকা মিলে দেড় হাজার কোটি টাকার তহবিল করেছে ইডকল। ২০২০ সাল থেকে ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে এ তহবিল থেকে ঋণ দিচ্ছে ইডকল। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৩০ কোটি টাকার অর্থায়ন করা হয়েছে। নতুন করে তহবিল বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ইডকল নিজস্ব তহবিল থেকে আরও ৩০০ কোটি টাকা এ খাতে বিনিয়োগ করছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ভবনের ছাদে স্থাপন করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

কম খরচে বিদ্যুৎ, বাড়ছে আগ্রহ

ইডকলের কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়িক সংগঠনের কাছ থেকে সাড়ে ৪ হাজার কারখানার ছাদের হিসাব পাওয়া গেছে। এসব ছাদ ব্যবহার করেই ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। জমির চেয়ে ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কম। ছাদে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করতে ৪ থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা খরচ হয়, জমিতে এটি দ্বিগুণ হয়। তবে শুল্ক প্রত্যাহারে দুই ক্ষেত্রেই খরচ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমতে পারে।

ইডকল সূত্র বলছে, শুরুতে বছরে একটি বা দুটি প্রকল্প হতো, তিন বছর ধরে আগ্রহ বাড়ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির খরচ বাড়তে থাকায় এদিকে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। ২০২৫ সালে ১০০ মেগাওয়াট ছাদবিদ্যুৎ বসানোর প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১২০টি কারখানায় মোট ৩৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন অনুমোদন হয়েছে। এর মধ্যে এখন উৎপাদনে আছে ৩০৮ মেগাওয়াট। বছর শেষে উৎপাদন হতে পারে প্রায় ৩৫০ মেগাওয়াট। আর এর মধ্যে নতুন করে অনুমোদন হতে পারে আরও ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। আগামী ৫ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্থায়ন করা হবে। একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ২৫ থেকে ৩০ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়। বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই।

ছাদবিদ্যুৎ চালু করা কারখানা ও ইডকল সূত্র বলছে, ক্ষুদ্র শিল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এখন ১২ টাকা ৭৩ পয়সা। আর বড় কারখানায় মাঝারি চাপের সংযোগের ক্ষেত্রে গড় দাম ১২ টাকা ৮৫ পয়সা ও উচ্চ চাপে এটি ১২ টাকা ৭৫ পয়সা। যদিও রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে ১৬ টাকার কাছাকাছি। অথচ নিজেরা ঋণ নিয়ে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ৪ থেকে ৮ টাকার মতো। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখতে ব্যাটারি বসালে খরচ হয় ৭ থেকে ৮ টাকা। অবশ্য রাতে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় চালাতে চাইলে খরচ আরও বাড়তে পারে। তবে ব্যাটারি ছাড়া ৪ থেকে ৫ টাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ থেকে।

দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫৮টি, এর মধ্যে ৪০টির নিজস্ব ক্যাম্পাস আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১১৬টি, অন্তত ৫০টির বড় ক্যাম্পাস আছে। এসব ছাদ ব্যবহার করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারে।

পথ দেখাচ্ছে তিন বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয় যশোরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ইডকলের অর্থায়নে একটি বেসরকারি কোম্পানি এখানে ১ মেগাওয়াট সক্ষমতা বসিয়েছে। চুক্তি অনুসারে গ্রিডের চেয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ কম হারে বিল দেবে বিশ্ববিদ্যালয়। এতে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে তা আরইবিকে সরবরাহ করা হয়। প্রতি মাসে ২৪ থেকে ৩৮ হাজার ইউনিট গ্রিডে সরবরাহ করছে তারা। এটি বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। আবার মাসে প্রতি বর্গফুটে দুই টাকা করে ছাদ ভাড়া পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। সব মিলে এটি ব্যাপক লাভজনক বলছে বিশ্ববিদ্যালয়।

এরপর ২ দশমিক ৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার ছাদবিদ্যুৎ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিদ্যালয় (বুয়েট)। একইভাবে ছাদে ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বসিয়েছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ খরচ কমেছে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর আর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে না। এর বাইরে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে একটি বেসরকারি কোম্পানির সহায়তায় ৭২ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হয়েছে। এ থেকে দিনে গড়ে ২৫০ থেকে ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় তাদের।

দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫৮টি, এর মধ্যে ৪০টির নিজস্ব ক্যাম্পাস আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১১৬টি, অন্তত ৫০টির বড় ক্যাম্পাস আছে। এসব ছাদ ব্যবহার করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারে। ইডকল জরিপ করে দেখেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বসানো সম্ভব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা সাড়ে ৬ মেগাওয়াট, শুধু ছাদ ব্যবহার করেই সাড়ে ৫ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব। আর ক্যাম্পাসের পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার করলে এখানে আরও ৫ মেগাওয়াট যোগ করা সম্ভব। তার মানে গ্রিডের বিদ্যুৎ না নিয়ে উল্টো গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্রুত এটি শুরু করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ছাদে ব্যাপক সম্ভাবনা আছে, বিশেষ করে শিল্পের পাশাপাশি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি করা যেতে পরে। দেশের ৮৭ হাজার গ্রামেও এটি জনপ্রিয় হতে পারে। তবে বাজেটে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা গ্রামের মানুষ পাবে না। তাই এই সুবিধা সবাইকে দেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

তিন দেশের অভিজ্ঞতা

২০০৬ সালে মিনিস্ট্রি অব নিউ অ্যান্ড রিনিউবেল এনার্জি গঠন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ২০১৪ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে গুরুত্ব দেয় দেশটি। ওই সময় ভারতের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল মাত্র ২ দশমিক ৮২ গিগাওয়াট। এর পর থেকে প্রতিবছর প্রায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালে ৫৫ গিগাওয়াট এবং ২০২৩ সালে ৬৬ গিগাওয়াটে এসে দাঁড়ায়। ১ হাজার মেগাওয়াটে ১ গিগাওয়াট।

বাসাবাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎসাহিত করতে ভারত সরকার ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রকল্প নেয়। এতে এক থেকে তিন বা এর চেয়ে বেশি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সৌর প্যানেল বসাতে ৩০ হাজার থেকে ৭৮ হাজার রুপি প্রণোদনা দেয় সরকার। সৌরচালিত সেচযন্ত্র বসাতে আরও একটি প্রকল্প নিয়ে লক্ষাধিক পাম্প বসানো হয়। দুই মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ দেওয়া হয়। এতে সৌরবিদ্যুৎ বাড়তে থাকে। এ বছরের মার্চে ভারতের মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৫০ দশমিক ২৬ গিগাওয়াট। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই ভারতের জাতীয় গ্রিডে ৪৪ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে।

২০১৮ সালে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট; ২০২৫ সালের শেষে তা ১৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি এসেছে ছাদ ব্যবহার করে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌরবিদ্যুৎ খাতে সাফল্য দেখিয়েছে পাকিস্তান। দেশটিতে বিদ্যুতের দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় সবাই ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে করছাড় দেয় দেশটির সরকার। একই সঙ্গে বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে কিনে নেওয়ার সুবিধা দেওয়া হয়। গ্রিডে যুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎদেশটিতে ৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। 

তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, দেশটিতে ছাদ বিদ্যুতের পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেশি। এসব বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয় না, গ্রাহক নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে। এতে গ্রিড থেকে প্রতিনিয়ত চাহিদা কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। পরিকল্পনা করে না এগোনোয় দেশটির বিদ্যুৎ খাতে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

ঘরে ঘরে বিদ্যুৎকেন্দ্র

বিদ্যুতের সুবিধা পৌঁছায়নি, এমন এলাকার মানুষকে বিদ্যুতের সুবিধা দিতে ২০০৩ সালে উদ্যোগ নেয় সরকার। প্রতি বাড়িতে ফ্যান ও বাতির সুবিধা নিশ্চিত করতে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয় বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে। ইডকলের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। দেশে প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম গড়ে ওঠে। তবে শতভাগ বিদ্যুতায়নের পর এটি কমে আসে। অনেকে ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। এখনো বড় একটি অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইডকল। এখন বাসাবাড়িতে নতুন করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগের কথা ভাবছে ইডকল।

মিরপুরে নিজের বাসার ছাদে তাঁর ফ্ল্যাটের জন্য দুই কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল বসিয়েছেন মুহাম্মদ আলামিন। ব্যাটারির সুবিধা আছে ৫ কিলোওয়াটের। তাই উৎপাদন সক্ষমতা আরও তিন কিলোওয়াট বাড়াবেন। এটি করা হলে তাঁর আর গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হবে না। এতে তাঁর খরচ হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, প্রতি মাসে গড়ে তাঁর বিদ্যুৎ বিল হতো ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। সৌর প্যানেল বসানোর পর মাসে আড়াই হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল কমে গেছে।

বিদ্যুতের বাড়তি দাম ও গরমের সময় লোডশেডিংয়ের কারণে অনেকেই বাসায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছেন। এসিআই মোটরসের সৌরবিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, ৫ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বসাতে তিন লাখ টাকা খরচ হতে পারে। শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা পেলে এটি আরও কমতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এবারের বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানিতে আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর তুলে দিয়েছে সরকার। এতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কমতে পারে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে এতে কিছু শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এতে ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির ব্যাপক সম্ভাবনা ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা আছে সংশ্লিষ্টদের।

আরও পড়ুন

অনুমোদন ও শুল্ক-করের বাধা

শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধা একটি গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউবেল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)। গত ১৪ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মোস্তফা মাহমুদ বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারিকৃত প্রজ্ঞাপন সংশোধন করা না হলে দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। এটি শিল্প গ্রাহকদের জন্য উপযোগী হলেও আবাসিক, কৃষি ও গ্রামীণ গ্রাহকদের জন্য কার্যকর নয়। প্রণোদনা কাঠামো সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত হতে হবে। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আমদানি পর্যায়ে এখনো ভ্যাট ও এআইটি মিলে ১৭ শতাংশ শুল্ক রয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে সুফল পাওয়া যাবে।

বিএসআরইএ বলছে, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারের বড় অংশ গড়ে উঠেছে আমদানিকারক, পরিবেশক, ডিলার, খুচরা ব্যবসায়ী এবং ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান প্রণোদনা কাঠামোয় তাদের জন্য সুবিধা রাখা হয়নি। দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ৬৩ শতাংশই আবাসিক, কৃষি ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক গ্রাহক। তারা এ সুবিধা পাবে না। তাই এনবিআরের প্রজ্ঞাপন বহাল থাকলে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। তবে সব আমদানিকারক, ইপিসি প্রতিষ্ঠান, ডিস্ট্রিবিউটর এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য শূন্য শতাংশ কাস্টমস ডিউটি ও কর সুবিধা উন্মুক্ত করা হলে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর মাত্র ২৫ শতাংশ ছাদ ব্যবহার করেই ৬ থেকে ৮ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় অর্ধেক মেটানো হচ্ছে নিজস্ব ছাদবিদ্যুৎ দিয়ে। একটি বেসরকারি কোম্পানি এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সম্প্রতি তোলা ছবি
ছবি: প্রথম আলো

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ছাদবিদ্যুৎ জনপ্রিয় করতে শুল্ক বাধা দূর করতে হবে। বাসায় যাঁরা সৌর প্যানেল বসাবেন, তাঁরা নিজেরা আমদানি করবেন না। বাজার থেকে কম দামে কিনতে চাইবেন। আর ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুতের বাড়তি অংশ গ্রিডে নেওয়ার অনুমোদন ১৫ দিনে হওয়ার কথা থাকলেও ৩ থেকে ৪ মাস লেগে যায়। এটি দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি করছাড়ের সুবিধা সবাইকে দিতে হবে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করতে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সরকার কৌশলপত্র তৈরি করছে। বাজেটে ঘোষিত প্রণোদনা সর্বজনীন হলে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ৪ টাকা ২৯ পয়সা হতো। এতে দেশের আনাচকানাচে ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ দেখা যেত। সরকার ওই রকম প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছিল। এর মধ্যে এনবিআরের প্রজ্ঞাপন একটি প্রহসন, যা বজ্রপাতের মতো আঘাত হেনেছে।