আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন খলিলুর রহমান
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে খলিলুর রহমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল এই কূটনৈতিক সংস্থার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
খলিলুর রহমান এর আগেও জাতিসংঘে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। গত মঙ্গলবার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটাভুটিতে সাইপ্রাসের দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে হারিয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।
কে এই খলিলুর রহমান
পেশাদার কূটনীতিক খলিলুর রহমান ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা পদ অন্যতম।
খলিলুর রহমান ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর দেশে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করলে গত ফেব্রুয়ারিতে খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
এর আগে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন খলিলুর রহমান।
চলতি বছরের শেষ নাগাদ জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হতে চলছে। ফলে খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের সময়কালেই জাতিসংঘের ক্যালেন্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের কাজটি সম্পন্ন হবে।
নতুন এই দায়িত্ব গ্রহণকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সমবেত কূটনীতিকদের উদ্দেশে খলিলুর রহমান বলেন, ‘জাতিসংঘ এমন এক সময়ে তার নবম দশকে পদার্পণ করতে যাচ্ছে, যখন আমাদের এই সংস্থার ওপর আস্থা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো সংস্থার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের সক্ষমতার ওপর জনমনে থাকা বিশ্বাস ও আস্থাকে ক্ষুণ্ন করার প্রবণতা তৈরি করছে।’
খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আপনার অসাধারণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কেবল সাধারণ পরিষদের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে পুরো জাতিসংঘের সাফল্যের একটি নিশ্চয়তা।’
কীভাবে নির্বাচিত হন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি কার্যত আলংকারিক হলেও এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এটি জাতিসংঘের এমন একটি অঙ্গসংস্থা, যেখানে ছোট-বড় সব দেশ কথা বলতে পারে এবং এটিই বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক কূটনৈতিক সম্মিলনের মঞ্চ।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি সাধারণত সর্বসম্মতভাবে (অ্যাক্লামেশন) নির্বাচিত হন। অর্থাৎ সদস্যদেশগুলো বৃহত্তর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন প্রার্থীর বিষয়ে একমত হয়। যদি কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তখন গোপন ব্যালটে ভোটাভুটি হয়। এমন বিরল ক্ষেত্রে যে প্রার্থী সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান, তিনিই সভাপতি হন।
চলতি বছরের আগে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে সর্বশেষ ভোটাভুটি হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই সময় ফিজির কূটনীতিক পিটার টমসন গোপন ব্যালটে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে চার ভোটে হারিয়ে ৭১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১২ সালে আরেকটি গোপন ব্যালটে লিথুয়ানিয়ার প্রার্থীকে অল্প ব্যবধানে হারান সার্বিয়ার ভুক জেরেমিচ। আর ১৯৯১ সালে ইয়েমেন ও পাপুয়া নিউগিনির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভোটাভুটিতে জয়ী হয়েছিলেন সৌদি আরবের প্রার্থী সামির শিহাবি।
এবারের গোপন ব্যালটে খলিলুর রহমান ৯৯টি ভোট পান, যা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কাকোরিসের চেয়ে ৮টি বেশি। নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোট পড়েছিল। কোনো ভোট বাতিল হয়নি এবং কেউ ভোটদান থেকে বিরতও থাকেনি।
সভাপতির এই পদটি জাতিসংঘের পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়। ৮১তম অধিবেশনের দায়িত্বটি এসেছে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের কাছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া খলিলুর রহমানের এই মেয়াদের মেয়াদকাল হবে এক বছর।
সাধারণ পরিষদের বিদায়ী সভাপতি ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি কীভাবে আস্থা কমে যাচ্ছে তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘ ‘কেবল প্রতিকূল পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হচ্ছে না, বরং প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে’। যেখানে ঐকমত্যে পৌঁছানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে এবং জাতিসংঘের সনদ রক্ষা করা ‘একটি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিষয়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেয়ারবক আরও বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা এখন আর কেবল সভা পরিচালনার মতো সাধারণ বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বৈশ্বিক জটিল ভূরাজনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় একতরফা পদক্ষেপের আশ্রয় নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন জাতিসংঘের ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। ওয়াশিংটন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং মানবাধিকার কাউন্সিলের মতো জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং এই বৈশ্বিক সংস্থায় তাদের তহবিল কমিয়ে দিয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘকে একটি ‘আড্ডাখানা’ অভিহিত করে এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, ‘জাতিসংঘের অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে...কিন্তু এটি সেই সম্ভাবনার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারছে না।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাজ কী
সাধারণ পরিষদ হলো জাতিসংঘের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল অঙ্গ। জাতিসংঘের এই অঙ্গসংস্থায় ১৯৩টি সদস্যদেশ রয়েছে এবং প্রত্যেকের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। নিউইয়র্কে প্রতিবছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনটি জাতিসংঘের একমাত্র ফোরাম, যেখানে বিশ্বের সব দেশের নেতারা বক্তব্য দিতে পারেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের বাজেট নিয়ন্ত্রণ করে, বিভিন্ন চুক্তি গ্রহণ করে, দারিদ্র্য থেকে শুরু করে দুর্নীতি পর্যন্ত বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা করে এবং অসংখ্য প্রস্তাব পাস করে। এই প্রস্তাবগুলো আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতামূলক না হলেও এগুলো প্রায় সব সময়ই বৈশ্বিক মতামতের প্রতিফলন ঘটায়।
এ ছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে, যার মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) সুপারিশক্রমে মহাসচিব নিয়োগ এবং এই পরিষদের অস্থায়ী সদস্যদের নির্বাচিত করার বিষয়টিও রয়েছে।
সাধারণ পরিষদের আগামী অধিবেশন আগামী ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হবে।
গত বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই বছর মেয়াদের জন্য অস্ট্রিয়া, কিরগিজস্তান, পর্তুগাল, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো ও জিম্বাবুয়েকে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
নিরাপত্তা পরিষদের একটি আসনের জন্য জোর লবিং করা জার্মানি এতে জয়ী হতে ব্যর্থ হয়েছে, যা চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
নিরাপত্তা পরিষদ হলো জাতিসংঘের একমাত্র অঙ্গসংস্থা, যা আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতামূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যেমন—নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া। এই পরিষদের ভেটো-ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্যদেশ রয়েছে, দেশগুলো হলো চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।