এক নির্বাচনে ভয়, আরেক নির্বাচনে ভরসা

চলতি বছরের নির্বাচনী দায়িত্বের পরিচয়পত্রসহ সৈয়দ নাজমুস সাকিবছবি: নাজমুস সাকিবের সৌজন্যে

‘নিজের ছাত্রের বয়সী এক ছেলে কলার ধরে বলেছিল, সবাই ব্যালট বাক্সে দিয়ে দিয়েছে, তুই এখনো দেস নাই ক্যান?’ কথাটা বলতে গিয়ে কিছুক্ষণ থামলেন সৈয়দ নাজমুস সাকিব। অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন বলে হুমকি পেয়েছিলেন তিনি। ঘটনাটি ২০১৮ সালের। সেবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে হুমকি, ভয় আর অসহায়তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন নাজমুস সাকিব।

আট বছর পর, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তাঁর কণ্ঠে ভিন্ন সুর, ‘ন্যূনতম কোনো সমস্যা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।’

বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের ইংরেজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাজমুস সাকিব। নির্বাচনের পর পারিবারিক সময় কাটাতে ঢাকার বাইরে অবস্থানকালে শনিবার তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করে গেলেও নাজমুস সাকিব এ পর্যন্ত একবারও নিজের ভোট দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।

২০২৬: সকালের বিস্ময় দিয়ে শুরু

রাজধানীর লালবাগের জামিলা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে নাজমুস সাকিবের বুথ ছিল ভবনের তৃতীয় তলায়। ভোট শুরুর নির্ধারিত সময় সকাল সাড়ে সাতটার আগেই ভোটার উপস্থিত—এ দৃশ্য তাঁকে বিস্মিত করেছে।

২০১৮ সালের ভোটে অনিয়মের চূড়ান্ত রূপ দেখা নাজমুস সাকিব বলেন, ‘এবার ব্যালট পেপার হাতে আসার আগেই ভোটার হাজির। নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এত মানুষকে ভোট দিতে দেখা এবারই প্রথম।’

এবার ব্যালট পেপার হাতে আসার আগেই ভোটার হাজির। নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এত মানুষকে ভোট দিতে দেখা এবারই প্রথম।
—নাজমুস সাকিব, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা

নাজমুস সাকিব বলেন, ভোট শুরুর পর দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটু সময়ের জন্যও তিনি নড়তে পারেননি। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে দুই মিনিটের জন্য ওয়াশরুমে যেতে পেরেছিলেন। তারপর বেলা পৌনে তিনটা পর্যন্ত আবার একটানা কাজ করতে হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে ভোট নেওয়ার পর ভোট গণনা শেষে বাড়ি ফেরেন তিনি।

নাজমুস সাকিবের বুথে ভোট দিয়েছেন পুরুষ ভোটাররা। তিনি বলেন, ৯০ বছরের বেশি বয়সী এক ভোটার অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে এসেছেন। টিপসই দিতে বললে তিনি নিজেই সই করতে চাইলেন। ভোট দিয়ে বেরিয়ে বললেন, ‘জীবনে আর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাব কি না, জানি না, তবে এবার সুষ্ঠুভাবে দিতে পারলাম।’

গত বৃহস্পতিবারের ভোট নিয়ে নাজমুস সাকিবের ফেসবুক পোস্ট
ছবি: স্ক্রিনশট

একজন বয়স্ক ভোটার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে ক্ষুব্ধ হয়ে গালাগালি করেছিলেন। কিন্তু বুথে ঢুকে প্রক্রিয়া দেখে পরে ক্ষমা চান।

নাজমুস সাকিব তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভোটারদের বেশ বড় একটা অংশ ‘গণভোট’ বিষয়টি বুঝতেই পারেনি। কিসের ‘হ্যাঁ’, কেন ‘হ্যাঁ’, কিসের ‘না’, কেন ‘না’—এ নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না অনেকের। বারবার বুঝিয়ে দিলেও বুঝতে পারছিলেন না। কয়েকজন গণভোটে ভোট না দিয়ে ব্যালটটি ফেরত দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। ব্যালট কেমন করে ভাঁজ করবেন, তা–ও বেশির ভাগ ভোটারকে দেখিয়ে দিতে হয়েছে।

আমার মা জ্বর নিয়েও সকালের নাশতা শেষে ওষুধ খেয়ে পান চিবাতে চিবাতে ভোট দিতে গেছেন। অনেকক্ষণ সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও হাসিমুখে ফিরেছেন। আবার ছোট খালার সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন, কে জিততে পারে বা ভোটের পরিস্থিতি কেমন। অথচ তাঁরা পুরোপুরি সংসার নিয়ে থাকা মানুষ। তাঁদের মাঝে এই আমেজ আগে দেখিনি।
—শাহরিয়ার নীল শুভ্র, নাজমুস সাকিবের পোস্টে মন্তব্যকারী

বুথের ভেতরে নাজমুস সাকিবসহ অন্য যাঁরা দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁরা ভোটারদের বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তা করেছেন। একইভাবে বুথের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিরাপত্তা রক্ষায়, আনসার সদস্যরা ভোটারদের কক্ষ খুঁজে পেতে সহায়তা করাসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। নাজমুস সাকিব সুষ্ঠু ভোটের জন্য এই সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে নাজমুস সাকিব ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘...পুরো ২০২৫ সালে আমার যা পরিশ্রম হয়নি, আজ এক দিনে আমাকে তার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে।...মানুষের লাইন বেড়েই যাচ্ছে। লাঞ্চ করেছি বেলা পৌনে তিনটায়। ততক্ষণে ঘাড়ের পেছনে ব্যথা শুরু করেছে, প্রেশার বাড়ার লক্ষণ সম্ভবত।’

সৈয়দ নাজমুস সাকিব
ছবি: নাজমুস সাকিবের সৌজন্যে

নাজমুস সাকিবের ফেসবুক পোস্টের নিচে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা অন্যরাও মন্তব্য করেছেন। তাঁরাও প্রায় একই রকমের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। ভোটাররাও তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। সাদিয়া ফারহা লিজা নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘ভাই, আমি শাড়ি পরে ফাল্গুন লুকে ভোট দিতে গিয়েছি।’

শাহরিয়ার নীল শুভ্র নামের একজন লিখেছেন, ‘আমার মা জ্বর নিয়েও সকালের নাশতা শেষে ওষুধ খেয়ে পান চিবাতে চিবাতে ভোট দিতে গেছেন। অনেকক্ষণ সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও হাসিমুখে ফিরেছেন। আবার ছোট খালার সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছেন, কে জিততে পারে বা ভোটের পরিস্থিতি কেমন। অথচ তাঁরা পুরোপুরি সংসার নিয়ে থাকা মানুষ। তাঁদের মাঝে এই আমেজ আগে দেখিনি।’

নির্বাচনে কোনো একটি কেন্দ্রে ১৯ জন দায়িত্ব পালনকারীর একজন ছিলেন ফাহরিন আহমেদ আনন্দ। তিনি নাজমুস সাকিবের পোস্টে মন্তব্যে লিখেছেন—সব দলের এজেন্টদের উপস্থিতিতে গণনা করা হয়েছে, এমনকি বাতিল ভোটগুলো একটা একটা করে তাঁদের দেখানো হয়েছে কেন বাতিল করা হয়েছে। এই ১৯ জনের সামনেই ভোট গণনা এবং লেখা শেষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সই করার পর তাঁরা কেন্দ্র ত্যাগ করেছেন। তাঁর মতে, মিডিয়ার এই যুগে তথ্য গোপন করা সম্ভব নয়।

ভোটারদের লম্বা সারির ছবিটি খিলগাঁও মডেল কলেজ কেন্দ্রে সকাল ৭টার, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এমন দৃশ্য অনেক দেখা গেছে
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ফলাফল ঘোষিত ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে জয় পেয়েছে। ফল ঘোষণা স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। আর তাঁদের শরিকেরা পেয়েছে তিনটি আসন। অর্থাৎ বিএনপি ও তার মিত্ররা পেয়েছে ২১২ আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্য শরিকেরা পেয়েছে ৯টি আসন। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্ররা পেয়েছে ৭৭ আসন।

২০১৮: ‘রাতের ভোট’-এর স্মৃতি

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার আমলের সেই নির্বাচন দেশ-বিদেশে পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ হিসেবে। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘ফিরে দেখা নির্বাচন ২০১৮: ‘রাতের ভোট’: আপনাদের ভোট হয়ে গেছে, চলে যান’ শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে নাজমুস সাকিব পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে ধানমন্ডি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

নাজমুস সাকিব বলেন, সেদিন সকালে ভালোভাবেই ভোট শুরু হয়। কয়েকজন ভুয়া ভোটার এসে প্রথমে সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু দুপুরের মধ্যে পুরো চিত্র পাল্টে যায়। কয়েকজন এসে বুথ থেকে বের হয়ে না গেলে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিতে থাকে। এ সময় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে যাঁরা, তাঁরাও নিশ্চুপ ছিলেন। শুরুতে প্রতিবাদ করলেও পরে তাঁর মনে হয়, একলা প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই।

২০১৮ সালের ভোট নিয়ে সম্প্রতি দেওয়া নাজমুস সাকিবের ফেসবুক পোস্ট
ছবি: স্ক্রিনশট

বুথে অনুপ্রবেশকারীরা নিজেরাই ব্যালটে সিল মারতে থাকেন। এমনকি বুথের দায়িত্বে থাকা সবার জন্য দুপুরের খাবারও নিয়ে আসেন। নাজমুস সাকিব বলেন, ‘এর প্রতিবাদ হিসেবে বলেছিলাম, আপনাদের আনা খাবার খাব না।’

দায়িত্ব শেষে সেদিন রাতে বাসায় ফিরেও নিজের অভিজ্ঞতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফেসবুকে ওই পোস্টের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১২ মিনিট। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে মায়ের অনুরোধে তা মুছে ফেলেন। তিনি বলেন, তাঁর মায়ের ফোনে বিভিন্ন জায়গা থেকে কল আসা শুরু হয়েছিল। তাই মায়ের অনুরোধে তিনি পোস্টটি ফেসবুক থেকে ডিলিট করে দেন।

সম্প্রতি ২০১৮ সালের ভোট গ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আবারও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন নাজমুস সাকিব। ওই পোস্টে ইসমাইল হোসেন নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘আপনার ২০১৮ সালের পোস্টটা এখনো মনে পড়ে। পরিচিত অনেকের এমন সাহস ছিল না। পরে যে সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেটাও মনে আছে।’

আরও পড়ুন
ব্যাপক অনিয়মের মধ্যে ২০১৮ সালে হয়েছিল একাদশ সংসদ নির্বাচন। কুমিল্লার চান্দিনার পশ্চিম বেলাশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ভেঙে ফেলা হয়েছিল
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

গত বছরের ২৩ জুন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছিলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন বিতর্কিত হলেও সেই দায় নির্বাচন কমিশনের নয়, নির্বাচন সুষ্ঠু রাখতে অনেক স্টেকহোল্ডার জড়িত থাকেন। নির্বাচন আয়োজন শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের আর কিছুই করার থাকে না। বিষয়টি উচ্চ আদালতের ওপর ন্যস্ত থাকে।

এবারের ভোট গণনা এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট ও ‘না’ ভোট নিয়ে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাজমুস সাকিব বলেন, ‘আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতার কথা বলেছি। ঢাকায় পরিচিত অন্য যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরাও বড় কোনো অনিয়ম বা খারাপ পরিস্থিতির কথা বলেননি। তবে ঢাকার বাইরে অনেক জায়গাতেই অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে খবর হয়েছে। এক দিনে সব অনিয়ম দূর হয়ে যাবে, তা তো বলা যাবে না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় সহিংস ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা প্রতিহত করেছে।’