এসব পদ্ধতি গ্রহণ করে ৩ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত গর্ভধারণে বিরতি নেওয়া যায়। গত পাঁচ বছরে সারা দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণে সব ধরনের সরকারি সেবা নেওয়ার হার প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। আর স্থায়ী পদ্ধতি নেওয়ার হার কমেছে ৩৩ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতির ৯০ শতাংশের বেশি সেবা দিয়ে থাকে সরকারি সেবাকেন্দ্র। বেসরকারি সংস্থা সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানিও (এসএমসি) কিছু সেবা দিয়ে থাকে।

ঢাকায় কমেছে যে কারণে

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার এক গৃহবধূ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সুবিধামতো কনডম, খাওয়ার বড়ি ও মাসিকের সময় হিসাব করে প্রচলিত পদ্ধতিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর সন্তানের বয়স মাত্র আট মাস। এখন আবার গর্ভবর্তী। কিন্তু তাঁরা এখনই দ্বিতীয় সন্তান চান না। তাই এমআর (মাসিক নিয়মিতকরণ) করাতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি, যৌন অক্ষমতা, ভবিষ্যতে সন্তান নিতে পারবেন না—অনেকের মধ্যে এমন কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। এসব ভুল ধারণা ভাঙাতে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ নেই।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের জন্মনিরোধ সেবা ও সরবরাহ কর্মসূচি (সিসিএসডিপি) ইউনিটের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সেবার ক্ষেত্রে সরকারি সুবিধা গ্রামপর্যায়ে বেশি। ঢাকাসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় এ সুবিধা কম। তবে প্রশিক্ষণ, বিলবোর্ড, বিজ্ঞাপন, টক শো ইত্যাদি উপায়ে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির বিষয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। এ কারণে মোট প্রজনন হার (টিএফআর ২.০৩) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সিলেটে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে পিছিয়ে থাকা সিলেট এখন দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি ব্যবহারে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। এই বিভাগে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি কমার হার অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কম। সিলেটে কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। এ ছাড়া বরিশালে প্রায় ৮ শতাংশ, রংপুরে ৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১০ শতাংশ, ময়মনসিংহে ১৩ শতাংশ, খুলনায় ২২ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ২৩ শতাংশ কমেছে।

বাংলাদেশ জনমিতি এবং স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০১৭-১৮ অনুসারে, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের ৬২ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। একটি পদ্ধতি ব্যবহার শুরুর প্রথম বছরেই ১০ জনের চারজন অনিয়মিত হয়ে পড়েন।

আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে খাবার বড়ি ব্যবহার করেন ২৫ শতাংশ, ইনজেকশন ১১ শতাংশ, কনডম ৯ শতাংশ, নারীর স্থায়ী পদ্ধতি ৫ শতাংশ, পুরুষের স্থায়ী পদ্ধতি ১ শতাংশের কম, আইইউডি শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং ইমপ্ল্যান্ট ২ শতাংশ। ১২ শতাংশ বিবাহিত নারী জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা থেকে বঞ্চিত।

সচেতনতা বাড়াতে হবে

খাওয়ার বড়ি ও কনডম ব্যবহারে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ রোধ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির প্রয়োজন কী—অনেকে এমন প্রশ্ন করে থাকেন। এর জবাব দিয়েছেন স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কনডমে ৮ শতাংশ অকার্যকারিতা আছে। খাওয়ার বড়িতে ৯৯ শতাংশ কার্যকারিতা থাকলেও বেশির ভাগ নারী নিয়ম মেনে সেবন করেন না।

ফেরদৌসী বেগম বলেন, অপরিকল্পিত গর্ভধারণে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে, শিশুটিরও যত্নের ঘাটতি হয়। অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্ম দেওয়া (সি সেকশন) নারী বারবার গর্ভধারণ করলে প্লাসেন্টা আক্রিটা সিনড্রোম বা পিএএস দেখা দেয়। এটা একধরনের অস্বাভাবিক গর্ভধারণ। এতে জরায়ুতে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে সচেতনতা বাড়াতে প্রচার দরকার।